গায়ে পড়ে ভাব জমানো লোক থেকে সাবধান!

বিশেষ প্রতিবেদক ।

ওরা তিন জন। বাড়ি তিন জনের তিন জেলায়। বয়সের পার্থক্য তিন থেকে ১২ বছর। সম্পর্ক বন্ধুত্ব, আবার কখনো গুরু-শিষ্য। তিন জনকেই দেখতে পরিপাটি ভদ্রলোক। কারো পক্ষে বোঝার উপায় নেই, এরা কেড়ে নিতে পারে কারো জান ও মাল। তারা হলে, চাঁদপুরের রুবেল হোসেন, বরিশালের সোলাইমান ও নরসিংদীর মুনসুর আলম। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশ তাদের রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনে। প্রথম দিকে নিজেদের নির্দোষ এবং অতি সাধারণ মানুষ বলে জাহির করার চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে তাদের ভয়াবহ অপরাধের কথা। খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

তারা জানিয়েছে, প্রায় একদশক ধরে তারা যাত্রীবেশে বাসে উঠে টার্গেট যাত্রীর সঙ্গে ভাব জমিয়ে হাতিয়ে নেয় টাকা। তবে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে বেশ কয়েকবার। কয়েক মাস জেলবাস, তারপর জামিনে মুক্তি। আবার ফিরেছে নিজ পেশায়। তবে এ নিয়ে তাদের কোনো রকম অনুশোচনা নেই। পুলিশ, জেলবাস নিয়ে তাদের জীবনপ্রবাহ।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রাজধানীতে এ ধরনের বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে। তবে এরা একই স্থানে খুব বেশি সময় অবস্থান করে না। ফলে এদের ধরতে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। এরা ডাকাত-ছিনতাইকারীদের চেয়ে ভয়ংকর।

এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে যাত্রীকেই সচেতন হতে হবে। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা অজ্ঞান করেই যাত্রীর টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয় না, অনেক সময় যাত্রীর প্রাণটাও চলে যায় বিষাক্ত ওষুধের কারণে। এ ধরনের বহু নজির রয়েছে।

পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বাস ও রেল যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা কোনো অবস্থায় যাত্রাপথে কোনো যাত্রীর সঙ্গে অতিরিক্ত ভাব জমাবেন না। জমালেও কোনো অবস্থায় তাদের দেওয়া কোনো খাবার গ্রহণ করবেন না। মনে রাখবেন, এর ফলে হারাতে পারেন জান ও মাল দুটোই।

যেভাবে বন্ধুত্ব তিন জনের: গ্রেফতার অজ্ঞানপাটি চক্রের তিন জনের মধ্যে রুবেল হোসেন সবার ছোটো। বয়স তার ৩২। তার চেয়ে তিন বছরের বড়ো সৈয়দ সোলাইমান। আর তৃতীয় যিনি গুরু বলে পরিচিত তিনি মুনসুর আলম, বয়স ৪৮। রুবেল ও সোলাইমানের কথা, তারা ভিন্ন ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলবাসে যান। আর সেখানেই দেখা মেলে মুনসুর আলমের সঙ্গে। একসঙ্গে কয়েকবার জেলবাসে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মুনসুর আলমের পরিকল্পনা মোতাবেকই তারা গড়ে তোলে অজ্ঞান পাটি চক্র।

তারা যেভাবে ধরা পড়ে: অভিযান পরিচালনাকারী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, গত ৫ জানুয়ারি বাস যাত্রী নান্নু মিয়া (ব্যবসায়ী) কুড়িল বাস স্ট্যান্ড থেকে যাত্রাবাড়ী যাওয়ার পথে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েন। ঘুমের ওষুধ মেশানো চ্যাবন প্রাস খাইয়ে অজ্ঞান পাটির সদস্যরা তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেন তিন লাখ টাকা। পরবর্তীকালে নান্নু মিয়া মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দ্বারস্থ হন। এ অবস্থায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান শুরু করে। আর অভিযান শুরুর আগে নান্নু মিয়ার কাছ থেকে অজ্ঞান পার্টির এক জনের (রুবেল হোসেন) বর্ণনা জানতে পারেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এরপরই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সোর্স লাগিয়ে অজ্ঞান পাটির ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকা থেকে রুবেল, সোলাইমান ও মুনসুরকে গ্রেফতার করা হয়।

যেভাবে অজ্ঞান করে টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া হয়: এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতকরা জানিয়েছে, অজ্ঞান করার জন্য তারা হামদর্দ-এর চ্যাবন প্রাসে নেশা জাতীয় ঘুমের ওষুধ মেশায়। আর এই মেশানো ওষুধ নিয়ে দিনের দ্বিতীয় ভাগে নগরীর বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ডে অবস্থান নেয়। পরে লোকাল বাসে উঠে কোনো নির্দিষ্ট যাত্রীকে টাগের্ট করে তার পাশে বসে পড়ে কোনো একজন। অন্যরা বসে সামনে বা পেছনের সিটে। বসার পর টার্গেট যাত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে ভাব জমায়। অপরদিকে তাদের মধ্যে কোনো একজন হকার সেজে ক্যানভাস করতে থাকে। ক্যানভাসের সময় টার্গেট ব্যক্তিকে চ্যাবন প্রাস খেতে উত্সাহিত করে। একইভাবে টার্গেট যাত্রীর পাশে বসা অজ্ঞান পার্টির অন্যান্য সদস্য হকারের কাছ থেকে ভালো চ্যাবন প্রাস নিয়ে খায় এবং নেশা জাতীয় চ্যাবন প্রাস টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে খাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। টার্গেট ব্যক্তি চ্যাবন প্রাস খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেলে তার আশপাশে থাকা অজ্ঞান পাটির সদস্যরা টার্গেট ব্যক্তির সর্বস্ব হাতিয়ে নেয় এবং নিকটবর্তী স্ট্যান্ডে নেমে যায়।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, অজ্ঞান পাটির সদস্যরা এতটাই ধূর্ত যে তাদের ধরতে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। তারা ঘটনা ঘটানোর পরপরই অন্যত্র সরে পড়ে। ঢাকা এবং এর আশপাশ এলাকার বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ড, রেল স্টেশন, লঞ্চঘাট এলাকা তাদের বিচরণ ক্ষেত্র। ঢাকা থেকে দূূরদূরান্তে গমন করা এবং বাইরের জেলা থেকে ঢাকা অভিমুখী যাত্রীদের ওই চক্রের সক্রিয় সদস্যরা টার্গেট করে। তারা বাসের যাত্রীদের চেতনানাশক ট্যাবলেট মিশ্রিত খেজুর, হালুয়া, জুস, শরবত, ইত্যাদি অভিনব কায়দায় খাইয়ে অজ্ঞান করে তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়। তিনি বলেন, সাধারণ যাত্রীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তারা এই জঘন্য অপরাধ করে থাকে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *