চিকিৎসা নিয়ে স্বস্তি, মশা নিধনে অস্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক ।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই সুচিকিৎসা পাচ্ছেন। এ কারণে তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। রাজধানীর ৫টি হাসপাতালে সরেজমিনে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসক-নার্সরা তাদের বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। হাসপাতালে সেবা নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ নেই। এদিকে মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নগরবাসী রয়েছেন চরম অস্বস্তিতে। তাদের অভিযোগ, এখনো কার্যকর ওষুধ ছিটানো হয়নি। যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাতে মশা মরছে না, বরং মশার বংশবিস্তার বাড়ছে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

গত প্রায় দুই মাস ধরে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ছড়াছড়ি। সরকারি-বেসরকারি কোন হাসপাতালে বেড খালি নেই। সরকারি হাসপাতালে বারান্দায় অতিরিক্ত বেড দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও মুগদা হাসপাতাল ঘুরে সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ভিড়, চলছে সেবা।

উপস্থিত ছিলেন চিকিত্সক, নার্সসহ অন্যান্য বিভাগের লোকজনও। চিকিত্সক ও নার্সদের তত্পরতায় সন্তুষ্ট এসব হাসপাতালের রোগীরা। হাসপাতালগুলোর চিকিত্সক ও নার্সরা বলেন, অতিরিক্ত কাজের চাপে এখন আমরা ক্লান্ত। শেষ কবে বিশ্রাম নিয়েছিল মনে নেই। অন্যদিকে রোগী ও তাদের স্বজনদের ভাষ্য, যথেষ্ট সেবা প্রদান করছেন চিকিত্সক ও নার্সরা। ঢামেক হাসপাতালে সব সময়ই রোগীর বাড়তি চাপ থাকে। ডেঙ্গুর মৌসুমে এই চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। হাসপাতালে মেঝেতেও জায়গা হচ্ছে না রোগীদের। মেডিসিন বিভাগের মেঝে ছাড়িয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছেছে রোগীর বিছানা। তবে হাসিমুখে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর স্বজন জানান, এতো রোগীর চাপেও চিকিত্সকরা যে সেবা দিচ্ছেন তাতে তারা খুঁশি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ১নং ওয়ার্ডের বারান্দার ভর্তি মো. সোহেল বলেন, সরকারি হাসপাতাল হলেও ডেঙ্গু রোগীদের বেলায় এখানে সবাই খুব আন্তরিক। ছুটির দিনেও চিকিত্সক এসে খোঁজখবর নিয়ে গেছেন।

বিএসএমএমইউর ডেঙ্গু চিকিত্সা সেবা সেলে চিকিত্সাধীনরা হাসপাতালের চিকিত্সক ও নার্সদের সেবায় অনেক সন্তুষ্ট। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। তারপরও এ হাসপাতালের চিকিত্সক-নার্সদের সেবায় রোগী খুঁশি। এদিকে অনেক চিকিত্সক নার্স ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনদের বাসায় রেখে কর্মস্থলে আসছেন রোগীদের সেবা দিতে। আবার কোন কোন ডাক্তার-নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে এসে সেবা দিচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের বিশ্রাম নিতে বললেও তারা নিচ্ছেন না। বলছেন, রোগীদের সেবা দিয়ে তারা আত্মতৃপ্তি পান। বাসায় থাকতে তাদের ভাল লাগে না। বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীদের সঠিক সেবা প্রদানে চিকিত্সকদের ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেছেন সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরাও। তারা বলেন, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের শেখার আছে। বাংলাদেশের চিকিত্সকরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা প্রদানে নজির স্থাপন করেছেন। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুরেও এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে ৯ জন মারা গেছেন। পুরো সিঙ্গাপুরে চিকিত্সা ব্যবস্থার টনক নড়ে যায়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা সুচিকিত্সা পাচ্ছেন। আগামীতেও পাবেন। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হবে না। ২৪ ঘণ্টাই সারাদেশে চিকিত্সা সেবার মনিটরিং চলছে মন্ত্রণালয় থেকে। রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীদের চিকিত্সা সেবা মনিটরিং করা হচ্ছে ২৪ ঘণ্টা। কোথাও কোন ব্যত্যয় ঘটলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা। সমন্বয় করে চলছে রোগীদের চিকিত্সা ব্যবস্থা। এ কারণে রোগী হাসপাতালে প্রবেশ করা মাত্রই চিকিত্সা সেবা শুরু হয়ে যায়। ২৪ ঘণ্টা ডেঙ্গু রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে রোগীদের চিকিত্সা সেবায় কোন ধরনের সমস্যা হয়নি বলে মন্ত্রী জানান।

প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিত্সা নিয়ে দেশে কোন সমস্যা নেই। তবে ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে এডিস মশা নিধন করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে আমরা নিজেরাও অস্বস্তিতে আছি। এখনো মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, উত্তরা, গুলশান, বারিধারা, খিলক্ষেত, হাতিরপুল. কাঠালবাগান, লালবাগ, আজিমপুর, পুরান ঢাকা, তেজগাঁওসহ রাজধানীর অনেক এলাকা থেকে ডেঙ্গু রোগীরা তার কাছে সেবা নিতে আসছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে, মশা নিধনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, তাদের ব্যবহূত ওষুধে মশা মরছে না। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকায় ব্যবহূত ওষুধে মশা না মরার প্রমাণ মিলেছে। এমন পরিস্তিতিতে নগরবাসী আছে চরম অস্বস্তিতে। ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের সঙ্গে আলাপকালে সচেতন নগরবাসীরা জানান, জনস্বার্থে দ্রুত কার্যকর ওষুধ ছিটানোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত দুই সিটি কর্পোরেশনের। কেন বিলম্ব হচ্ছে? নগরবাসী আতঙ্কিত এটা কী তারা বুঝছে না?

এদিকে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল আরো দুই জন মারা গেছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার ভোর পৌনে ৬টার দিকে জারিফ হোসেন নামে এই শিশু মারা যায়। পাঁচ মাস বয়সী জারিফ ময়মনসিংহ শহরের শিকারিকান্দা এলাকার আরিফ হোসেনের ছেলে। কয়েক দিন আগে জ্বর হলে তাকে গাজীপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষায় তার ডেঙ্গুর জীবাণু ধরা পড়ে। তাকে সেখানেই চিকিসা দেওয়া হচ্ছিল। অবস্থার অবনতি হলে শনিবার ভোর ৫টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। পিরোজপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মমতাজ বেগম (৪৫) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। শুক্রবার ঢাকায় নেয়ার পথে রাত ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মমতাজ বেগম পিরোজপুর সদর উপজেলার তেজদাশকাঠী গ্রামের বাবুল হাওলাদারের স্ত্রী। গত বুধবার মমতাজ বেগম জ্বর নিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে দেখা যায় তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মমতাজের শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে গত সোমবার তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে চিকিত্সার পরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হলে তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। এদিকে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ২১৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৯৩৮ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে চিকিত্সাধীন ৬ হাজার ২৭৯ জন রোগী। শুক্রবার এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৩৫ জন। ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *