উন্নতির সংসার

বিশেষ প্রতিবেদক ।

কী ভেবে মা-বাবা তাঁর নাম রেখেছিলেন উন্নতি? ২২ বছরে অসংখ্যবার এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। এখন অবশ্য উন্নতি ভালো আছেন। মাগুরা সদরের জগদল মাধবপুরের গোলাপি গ্রামে গিয়ে উন্নতির সংসার দেখে এসেছেন শামীম খান ।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

১০ বছর আগে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে দিন গুনেছেন কবে নিজের একটা ঘর হবে। শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দুই কামরার একটি গোলাপি ঘর পেয়েছেন। উন্নতির মতো আরো ১৫টি পরিবার ঘর পেয়েছেন ওই পিংক তথা গোলাপি গ্রামে। ঘরের বন্দোবস্তও উন্নতির নামেই। এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই আছেন।

রবিবার দুপুর
টেলিভিশনে তখন বাংলা সিনেমা চলছিল। উন্নতি বারান্দায় বসে বুনছিলেন বাঁশের পণ্য। কাছেই ঘুরছে টেবিল ফ্যান।  উন্নতি ও তাঁর স্বামী কার্তিক ঋষি বাড়িতে বাঁশের বিভিন্ন উপকরণ, যেমন—ডালা, কুলা, চালন, ঝুড়ি তৈরি করেন।  কার্তিক সেগুলো হাট-বাজারে বিক্রি করেন। এ থেকে মাসে তাঁদের হাজার দশেক টাকা আয় হয়। সংসার তা দিয়ে মন্দ চলে না।

উন্নতির আগের দিনগুলো
২২ বছর আগে মাগুরার শালিখা উপজেলার গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরা গ্রামের কার্তিক ঋষির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তখন উন্নতির বয়স মাত্র ১৪ বছর। কার্তিকের বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই আর মা বিয়ের চার বছর পরে। কার্তিকের আরো তিন ভাই আছে। কিন্তু বসতভিটা মাত্রই চার শতকের। সেখানে একটা খুপরি ঘর করে ১০ বছর কোনো রকমে টিকে ছিলেন। তারপর যখন জমি ভাগাভাগির কথা উঠল অন্য ভাইদের নিজের অংশ ছেড়ে দিয়ে উন্নতির বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন কার্তিক। সেখানে টেনেটুনে কাটল আরো এক যুগ। শেষে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন করে চার মাস আগে পান পিংক ভিলেজের তিন নম্বর ঘর।

পিংক ভিলেজে উন্নতি

পিংক ভিলেজ যেমন
দুই কামরার ওপরে গোলাপি রঙের টিন। সঙ্গে বাথরুম। মেঝে ও দেয়াল পাকা। ঘরের বারান্দায় পরিবেশবান্ধব একটি উন্নত চুলা। নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আরো দেওয়া হয়েছে চারটি ফলদ গাছ। এগুলো চার মাসে অনেকটাই বেড়ে উঠেছে। উন্নতির ছেলে সৌরভ জগদল সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে সাথি রানির বিয়ে হয়ে গেছে।

কার্তিক বলছিলেন, ‘জমিসহ এমন ঘর পাওয়া স্বপ্নের মতো ব্যাপার। পিংক ভিলেজে আসার পর আমাদের কাজের গতি বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। আগে আমরা শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে ভাবতাম। এখন আরো ভালো থাকার কথা ভাবতে পারছি।’ উন্নতির মা দুলালী এসেছেন মেয়ের সংসার দেখতে। চোখে-মুখে তাঁর স্বস্তির ছাপ। এখানে আশ্রয় পাওয়া সব কয়টি পরিবারই ভূমিহীন। সব ঘরেরই বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে স্ত্রীদের নামে। সৌরবিদ্যুতের তিনটি স্ট্রিট ল্যাম্পপোস্ট আছে পিংক ভিলেজে।

রিনা বেগমও আছেন
রিনা বেগমের স্বামী গনি মোল্লা ভ্যান চালাতেন। সড়ক দুর্ঘটনায় গনি মোল্লা গুরুতর আহত হলে চিকিৎসার জন্য বসতবাড়ির তিন শতক জমিই বিক্রি করে দিতে হয়। জীবিকার সন্ধানে বিধবা মেয়ে, স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে রিনা বেগম জগদল ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। সেখানে রিনা বেগম নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন আর স্বামী বিক্রি করতেন ঝালমুড়ি। থাকতেন এক বস্তিতে। চার মাস আগে পিংক ভিলেজের কথা জানতে পেরে আবেদন করেন। ঠাঁইও মেলে। এখন তাঁরা ভালো আছেন। মেয়েকে আবার বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সামিউল মাছের ব্যবসা করছেন।সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান পিংক ভিলেজ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি অন্য গুচ্ছগ্রামের তুলনায় ভিন্ন। নির্মাণ কৌশল ও নকশায় ভিন্নতা আছে। গোলাপি রং নারীদের পছন্দ বলে এটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের কথা মাথায় রেখে তাদের নামেই কাগজপত্র করা হয়েছে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *