শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:২১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
যশোর বোর্ডের এসএসসি বাংলা ২য় পত্রের এমসিকিউ পরীক্ষা স্থগিত জুমা’র দিনে গোসল ও সুগন্ধির ব্যবহার সম্পর্কে যা বলেছেন বিশ্বনবি ইলিশ মাছের গড় আয়ু কত? নবজাতক শিশুর যত্নে, জন্মের পর করনীয় চুল এবং ত্বকের যত্নে থাকুক টক দই লন্ডনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী বাবার লাশ উঠানে, রুমাল হাতে ছেলে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঘুমধুম সীমান্তে আবারও গোলাগুলির শব্দ পা দিয়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষা দিলেন মানিক সাবেক উপ প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত মোয়াজ্জেম হোসেনকে গার্ড অব অনার প্রদান গুয়েতেমালায় কনসার্টে পদদলিত হয়ে নিহত ৯, আহত ২০ কারাগারে বসে এসএসসি পরীক্ষা দিলেন ৩ আসামি পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ৫ শিক্ষককে অব্যাহতি করোনায় আক্রান্ত সিইসি হাবিবুল আউয়াল বেনাপোল সীমান্তে মাদকসহ আটক ১ সরকার সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিশ্বাসী : সেতুমন্ত্রী রাঙ্গাকে অব্যাহতির কারণ জানালেন জাপা মহাসচিব নড়াইলে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় দেয়া হলো দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন! সারাদেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু রানির শেষকৃত্যে অংশ নিতে লন্ডনের পথে প্রধানমন্ত্রী
Uncategorized

বিচার মাটিচাপা দিল পুলিশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০১৫
  • ২১ দেখা হয়েছে

Oporadher Dairy Theke
একদিকে ছিল মামলা না চালানোর জন্য চাপ, অন্যদিকে ছিল প্রলোভন। একই সঙ্গে চলছিল তদন্ত বিলম্বিত করার কৌশল। ৫২ বার আদালত থেকে সময় নিয়ে তদন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। চার বছরের মাথায় অসহায় বাদী শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে পুলিশের কাছে হার মেনেছেন। পাঁচ লাখ টাকায় রফা করে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলন হত্যা মামলাটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের নামে আপাতত মাটিচাপা দিতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

মিলনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দেয় পুলিশ২০১১ সালের ২৭ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নের নিরীহ কিশোর মিলনকে (১৬) ডাকাত সাজিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ গাড়িতে করে এনে উন্মত্ত জনতার হাতে ছোট্ট এই কিশোরকে ছেড়ে দেয়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পুলিশের গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়াসহ পুরো ঘটনাটির ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষ।
১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া, মিলনের ছোট ভাইকে পুলিশে চাকরি দেওয়া এবং বাবাকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের কিশোর শামছুদ্দিন মিলন হত্যা মামলা চালানো থেকে তাঁর পরিবারকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে স্থানীয় পুলিশ। তাদের পরামর্শে গত ২৪ ডিসেম্বর মিলনের মা মামলার বাদী কোহিনুর বেগম আদালতে ‘এজাহারনামীয় ও সন্দিগ্ধ ধৃত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাই; আসামিরা অভিযোগের দায় হইতে মুক্তি পাইতে ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে কোনো আপত্তি নাই ও থাকিবে না’ মর্মে আবেদন করেন। এরপর মিলনের বাবাকে দেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা। তারপর দ্রুতই মামলা ‘গুছিয়ে ফেলে’ পুলিশ।
কেন এমন আবেদন করলেন জানতে চাইলে মিলনের মা কোহিনুর বেগম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর ধরে বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরেছি। ডিবি পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলে কোর্ট থেকে ডিবি পুলিশ ৫২ বার সময় নিয়েও তা দেয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আদালত আর ডিবি পুলিশের কাছে যাতায়াত করতে করতে আরও নিঃস্ব হয়েছি। তাঁরা (পুলিশ) এবং অন্য লোকজনও মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য সব সময় চাপ দিয়ে আসছে।’
কোহিনুর বেগম বলেন, মিলনের বাবা বিদেশ থেকে চলে আসায় সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মিলনের ছোট ভাই সালাউদ্দিনকে পুলিশে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জ থানায় কর্মরত এসআই মো. রবিউল। এসব কারণে তিনি মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হন। তবে আদালতে দাখিল করা আবেদনটিও পুলিশের লোকজন ঠিক করে দিয়েছেন।
টেনে–হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যচূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে মামলটি নিষ্পত্তির আগে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে সন্দেহভাজন কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আকরাম উদ্দিন শেখ পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন মিলনের বাবাকে। প্রায় তিন মাস আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ওরফে বাদলের মাধ্যমে ওই টাকা দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার সময় কোম্পানীগঞ্জ থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে বাগেরহাটের ফকিরহাট থানায় কর্মরত এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ মামলা নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মিলনের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে কাছে। তিনি বলেন, ‘একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, এখন আর কী করা।’
মিলন হত্যার মতো একটি চাঞ্চল্যকর মামলা টাকার বিনিময়ে নিষ্পত্তি করা হলো কেন—জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মুঠোফোনে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘মিলনের বাবার পাগলামির জন্যই এটি হয়েছে। বাড়িতে ঘর করতে তিনি মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে টাকা নিয়ে দিতে বারবার আমার কাছে আসেন। একপর্যায়ে এসআই আকরামকে বললে তিনি রাজি হন।’
তবে মিলনের বাবা গিয়াস উদ্দিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, এসআই আকরাম শেখ তাঁকে দফায় দফায় ফোন করে ‘বেয়াই’ সম্বোধন করেন। তাঁকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং বৈধভাবে আবার বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। এসআই আকরামই তাঁকে প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে আনেন বলে জানান তিনি।
মিলনের বাবা এ-ও বলেন, দেশে আসার পর সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি বাড়িতে অন্যের জায়গায় যে বসতঘর ছিল, তারাও তা সরিয়ে নিতে চাপ দিতে থাকে। এ অবস্থায় তিনিও টাকা নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছিলেন না। তাই বাধ্য হয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি হন।

তবে গিয়াস উদ্দিন অভিযোগ করেন, এসআই আকরাম শেখ মামলা নিষ্পত্তির কথা বলে তাঁকে দেশে এনেও প্রতারণা করেছেন। ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে পরে আট লাখ, তারপর সাত লাখ; শেষে পাঁচ লাখ টাকার বেশি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। উপায় না দেখে তিনি পাঁচ লাখ টাকাতেই রাজি হন। তিন মাস আগে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী গিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসেন।
কোহিনুর বেগম ও গিয়াস উদ্দিন দুজনেরই একই আক্ষেপ, ‘বছরের পর বছর আদালতে ও ডিবি কার্যালয়ে ঘুরেও ছেলে হত্যার বিচার পাইনি। নিজে আরও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। দুনিয়ার আদালতে বিচার পাইনি, আল্লাহর কাছে এর বিচার চাই।’
মামলাটির সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-ডিবি) মো. আতাউর রহমান ভূঁইয়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের ২ নম্বর আমলি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
জানতে চাইলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা নিশ্চিত করেন আতাউর রহমান। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ রকম আলোচিত একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম আশরাফুজ্জামান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় এবং আদালতে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
আদালতে দাখিল করা ছয় পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ডিবির ওসি মো. আতাউর রহমান উল্লেখ করেন, ‘তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে এজাহারে বর্ণিত ঘটনা সত্য বলিয়া প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হইলেও কে বা কাহারা উক্ত ঘটনা করিয়াছে, উহা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় ভবিষ্যতে মামলা প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হইল। এবং প্রথম পৃষ্ঠায় বর্ণিত আসামি ও পুলিশ সদস্যদের অত্র মামলার দায় হইতে অব্যাহতির আবেদন করছি।’
অথচ চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই গ্রেপ্তার আসামি শাহ আলমের ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং চর কাঁকড়া ইউনিয়নের চারজন চৌকিদারসহ আরও তিনজন আসামি তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে ভিডিও চিত্র দেখে হত্যার ঘটনায় জড়িত হিসেবে যে চারজন পুলিশ সদস্যসহ ৩২ জনকে চিহ্নিত করেছেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করা আছে।
এ ছাড়া ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তসহ কিছু বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়। কিছুদিন পরে অবশ্য তাঁরা সবাই স্বীয় পদ ফিরে পান।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ইন্সপেক্টর রফিক উল্লা বর্তমানে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), এসআই আকরাম উদ্দিন শেখ বাগেরহাটের ফকিরহাট থানায়, হেমারঞ্জন নিঝুম দ্বীপ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে এবং আবদুর রহিম চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত আছেন।
জেলা জজ আদালতের সরকারি আইন কর্মকর্তা (পিপি) এ টি এম মহিব উল্যাহ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, গ্রেপ্তার আসামির ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ভিডিও চিত্রে আসামিরা চিহ্নিত হওয়া এবং তাঁদের নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরও সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না বলে যেসব কথা বলা হয়েছে, তা তদন্তকারী কর্মকর্তার ব্যর্থতা। তাঁরা ইচ্ছা করেই এটা করেছেন।
সব জেনেও কেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে পিপি মহিব উল্যাহ বলেন, ‘পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সবকিছু চূড়ান্ত করেই আমার কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। তখন আমি উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মিলনের বাবা-মাকে ডেকে আনি। তাঁদের মামলায় সব রকম আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দিই। কিন্তু তাঁদের আর মামলা চালাতে রাজি করাতে পারিনি। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পক্ষে মত দিয়েছি।’
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ফৌজদারি মামলা হয় রাষ্ট্র বনাম অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে। এখানে পরিবার সাক্ষী ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ পরিবারের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র লিখে নেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই, আইনে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তদন্তের নামে পুলিশ যা করেছে, সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পুলিশের কাজ দোষীকে চিহ্নিত করা। তারা সেটা না করে উল্টো দোষী ব্যক্তিদের রক্ষা করেছে। যারা এ কাজ করেছে, তাদের অদক্ষতা ও অসততার অভিযোগে অবিলম্বে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া উচিত।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী

© All rights reserved by Crimereporter24.com
রি-ডিজাইনঃ Cumilla IT Institute
themesba-lates1749691102