শিরোনাম

করোনায় সংকটে কুমিল্লার মৃৎশিল্প

কুমিল্লা অফিস । মহানগর প্রতিনিধি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াবহ থাবায় লকডাউনের কারণে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের সংকটময় পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা মৃৎশিল্পের এ কারিগরেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন দারুণ বিপাকে পড়েছেন। কঠিন অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন তারা।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

করোনার প্রভাবে বাংলা নববর্ষে বৈশাখী মেলা বন্ধ থাকায় লাখ লাখ টাকার রকমারি মৃৎপণ্য তৈরি করে সেগুলো রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতে না পেরে সীমাহীন ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। মৃৎশিল্পের মালিক, কারিগর (কুমার) ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে তাদের এমন দুরবস্থার কথা জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর এলাকায় ১৯৬১ সালের ২৭ এপ্রিল মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে গঠিত ‘বিজয়পুর রুদ্রপাল সমবায় সমিতি’ যাত্রা শুরু করে এবং সেই থেকে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুমিল্লার মৃৎশিল্পের সুনাম দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রতিষ্ঠানটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আর্থিক সহযোগিতায় বিজয়পুর মৃৎশিল্পটি ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে সদর দক্ষিণ উপজেলার দক্ষিণ বিজয়পুর, উত্তর বিজয়পুর, দুর্গাপুর গাংকুল, টেগুরিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, বারপাড়াসহ সাতটি গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের সদস্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এখানে উৎপাদিত মৃৎপণ্যগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের অন্তত ৪০টি জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কুমিল্লার মৃৎশিল্প পণ্যের চাহিদা বিদেশের বাজারেও বেশ সমাদৃত। এসব পণ্য আমেরিকা, লন্ডন, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কানাডা, জাপান, হল্যান্ড, ইতালিসহ বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

সমিতির লোকজন ও কারিগরেরা জানান, এখানে আধুনিক রুচিসম্মত ডিজাইনে চায়ের কাপ-পিরিচ, ডিনার সেট, জগ-গ্লাস, ফুলদানি, শোপিস, নানা ধরনের খেলনা, ধর্মীয় অনুশাসনের লিপি, কয়েলদানি, বিভিন্ন ধরনের ফুলদানি, মনীষীদের প্রতিকৃতি, ওয়াল প্লেটসহ প্রায় ৩ হাজার রকমের পণ্যাদি তৈরি করা হয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এসব মৃৎপণ্য করোনার প্রভাবে লকডাউনের কারণে সরবরাহ করতে না পারায় মজুদ করে রাখা হয়েছে। অমিত পাল, সুভাষ, বিনোদসহ অন্তত ছয় জন মৃৎশিল্পী আক্ষেপ করে বলেন, ‘এক সময় দেশের অধিকাংশ পরিবারেই সাংসারিক কাজে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল ও বাসন-কোসন ব্যবহার করতেন। দেশে প্লাস্টিক ও সিলভার শিল্পের বিকাশের পর ক্রমেই মৃৎশিল্পে ধস নামতে শুরু করে। করোনা মহামারি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো দেখা দিয়েছে। এ সময়ে লকডাউনের কারণে তৈরিকৃত মালামাল নিয়ে আমরা মহাসংকটে আছি।’

বিজয়পুর রুদ্রপাল সমবায় সমিতির সভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, ‘এমনিতেই গ্যাসের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে আছে এখানকার মৃৎশিল্প কারখানা। জ্বালানিসামগ্রী ও খড় দিয়ে পুড়িয়ে মৃৎপণ্য উৎপাদনের কারণে প্রতি মাসে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তা ও কারিগরদের অনেকে ক্রমেই ভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। এরমধ্যে গত বছর থেকে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে আরো ঝিমিয়ে পড়তে থাকে এই ব্যবসাটি। এবার বৈশাখী মেলা না হওয়ায় এবং অর্ডার করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ করতে না পাড়ায় লাখ লাখ টাকার মাটির পণ্য মজুদ পড়ে আছে। লকডাউনের কারণে মালামাল সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অনেকে অর্ডার বাতিল করেছেন। তৈরিকৃত পণ্যগুলো যথাসময়ে বিক্রি করতে না পাড়ার কারণে মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। শিল্পটিকে বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের ব্যবস্থা করাসহ করোনাকালে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।’খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *