শিরোনাম

চালক, শ্রমিকের শাস্তি কমিয়ে সড়ক আইন সংশোধন হচ্ছে

বিশেষ প্রতিবেদক ।

‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ বাস্তবায়নের দেড় বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আইনে চালক ও শ্রমিকদের শাস্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হচ্ছে। সংশোধিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। আগামী ১৩ মে পর্যন্ত মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, পরিবহন সেক্টরে যারা আছেন তারা সরকারি দলের নেতা। আইনটি পাশ হওয়ার পর তারা এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নই করতে দেননি। তারা সংশোধনের জন্য লেগে ছিলেন। তারা যেটা চাইছেন, সেটাই হচ্ছে। তিনি বলেন, আবার যদি সড়কে ছাত্র মারা যায়, বড় ধরনের আন্দোলন হয়, তবে হয়তো আবার নড়াচড়া হবে। আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল, তারপর অসুবিধাগুলো দেখে প্রয়োজনে সংশোধন করা যেত। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য চলছে, সেখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা কোনো আশা দেখছি না। কিন্তু আমরা দেখছি, পরিবহন সেক্টরের লোকজন যা চাচ্ছে তাই হচ্ছে। এখন করোনা মহামারি চলছে, লকডাউন চলছে। এর মধ্যে এরা এগুলো করছে। মানুষ রাস্তায় নামতে পারবে না, তারা মূলত এই সুযোগটা নিচ্ছে।

অনেক বাধা পেরিয়ে সংসদে পাশ হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হয়। এরপরও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারছিল না সরকার। পরে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে সরকার সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণা করে।

বর্তমান আইনের ১০৫ ধারায় বলা হয়েছে, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে তা ‘পেনাল কোড, ১৮৬০’ এর এ সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে। তবে শর্ত থাকে যে, ‘পেনাল কোড, ১৮৬০’ এর সেকশন ৩০৪বি-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে, ঐ ব্যক্তি (দায়ী) সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে সংশোধিত আইনে ‘গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত’ হওয়ার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জরিমানা ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে।

ট্রাফিক সংকেত না মেনে চলার শাস্তি বর্তমানে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। এক্ষেত্রে কারাদণ্ড উঠিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। সংশোধিত খসড়ায় জরিমানা কমিয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া বা জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহারের শাস্তিও কমছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া আইনে। বর্তমানে এই শাস্তি ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা। একই সঙ্গে বর্তমান আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে কমপক্ষে শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, তবে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত তিন চাকা বিশিষ্ট মোটরযান চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা আইনটি সংশোধন করতে যাচ্ছি, এজন্য নিয়ম অনুসারে মানুষের মতামত নিচ্ছি। আগামী ১৩ মে পর্যন্ত মতামত নেওয়া হবে। এরপর মতামতসহ খসড়া আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় মিটিংয়ে তুলব। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।’

সংশোধিত খসড়ায় কন্ডাক্টরের পাশাপাশি ‘সুপারভাইজার’ নামে একটি পদ যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ‘হেলপার কাম ক্লিনার’ ও ‘বন্দোবস্তকারী’ নামেও পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন ও নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা দাবি বা আদায় করলে শাস্তি সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। সংশোধিত আইনে জরিমানা কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করা ছাড়াও চালকের পয়েন্ট কাটার বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান আইনে অতিরিক্ত ওজন বহন করে মোটরযান চালানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ২ পয়েন্ট কাটা হবে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এখন এই জেল-জরিমানা মালিক, প্রতিষ্ঠান, বন্দোবস্তকারী সমিতি, মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ঠিকাদার ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে। চালকের ক্ষেত্রে এই বিধান লঙ্ঘনে শাস্তি তিন মাসের কারাদণ্ড, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে।

নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত উচ্চমাত্রার কোনো রূপ শব্দ সৃষ্টি বা হর্ন বাজানো বা যন্ত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে এখন শাস্তি সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হয়। এক্ষেত্রে কারাদণ্ড কমিয়ে এক মাস এবং জরিমানাও কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। পরিবেশ দূষণকারী, ঝুঁকিপূর্ণ ইত্যাদি মোটরযান চালালোর শাস্তিও কমছে। এখন এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড পেতে হয়। একই সঙ্গে চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। সংশোধিত আইনে কারাদণ্ড কমে এক মাস এবং জরিমানা কমে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা করা হচ্ছে।

বর্তমান আইনে অতিরিক্ত বা বেপরোয়া গতি বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালানোর ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয় এবং মোটরযানের নির্মাণ, সরঞ্জাম বিন্যাস ও রক্ষণাবেক্ষণের সংক্রান্ত অপরাধ জামিন অযোগ্য রাখা হয়েছিল। সংশোধিত আইনে তা তুলে দেওয়া হচ্ছে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *