শিরোনাম

কৌশল পালটে দেদার ঢুকছে সোনা

বিশেষ প্রতিবেদক ।

অবৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি ঠেকানোসহ এই খাতে শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যে সরকার ২০১৮ সালে নীতিমালা তৈরি করে, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে আমদানির সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে ব্যাগেজ রুলসেও কর পরিশোধ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ আনার সুযোগ রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সহজে ও স্বল্প খরচে আমদানির সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও বৈধ পথে খুব বেশি স্বর্ণ আমদানি হচ্ছে না। বরং ব্যাগেজ রুলসের সুবিধা নিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করছে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

বিস্মিত শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারাও :হঠাত্ করেই এত বেশি পরিমাণে স্বর্ণ প্রবেশ নিয়ে বিস্মিত শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারাও। তারা মনে করছেন, সরকারকে শুল্ককর দিলেও এই স্বর্ণের একটি বড় অংশ চোরাচালানকারীদের হাতেই যাচ্ছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক আমদানির চাইতে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে স্বর্ণ আনায় খরচ সাশ্রয় ও হয়রানিমুক্ত হওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের অনেকেই কৌশলে এ পথে স্বর্ণ আনছেন।

আইনগতভাবে এ ব্যবস্থা অবৈধ না হওয়ায় এসব স্বর্ণ আটকানোও যাচ্ছে না। বিমানবন্দরের বাইরে এসে বাহক পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ইস্যুটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অবহিত করেছে ঢাকা কাস্টম হাউজ। এসব কারণে বহুল আলোচিত স্বর্ণ নীতিমালার আওতায় বাজারে শৃঙ্খলা আনার সরকারি উদ্যোগও ভেস্তে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাগেজ রুলসে পরিবর্তন আনার পরামর্শ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে ১ হাজার ৩৫৮ কেজি স্বর্ণ, যার দাম প্রায় ৮১৫ কোটি টাকা। কেবল ডিসেম্বরেই ঐ বিমানবন্দর দিয়ে এসেছে আগের তিন মাসের প্রায় সমান (১ হাজার ৩১৩ কেজি) স্বর্ণ। অথচ এর আগের বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী তিন মাসে ব্যাগেজ রুলসের সুবিধায় আনা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ কেজি।

ঢাকা কাস্টম হাউজ সূত্র জানিয়েছে, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমেও গত নভেম্বর থেকে চলতি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ব্যাগেজ রুলসের আওতায় দেশে প্রবেশ করেছে ১ হাজার ৮৫০ কেজি স্বর্ণ। এসব স্বর্ণের মধ্যে স্বর্ণালংকার তেমন ছিল না। প্রায় সবই স্বর্ণের বার। এনবিআরের শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যেও ইস্যুটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ব্যাগেজ রুলস :ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী, বর্তমানে যাত্রীরা বৈধ পথে ২৩৪ গ্রাম স্বর্ণ বা দুটি বার (প্রায় ২০ ভরি) সঙ্গে আনতে পারেন। এর শুল্ককর ৪০ হাজার টাকা। আর নারী যাত্রীরা ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার করমুক্ত উপায়ে আনতে পারেন। একজন যাত্রী কতবার এই সুযোগ নিতে পারবেন, আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা নেই।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে আমদানি হওয়া পণ্যের শুল্ককর আদায়ের দায়িত্ব ঢাকা কাস্টম হাউজের। ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আইনের বিধানের কারণে এসব স্বর্ণ আটকানো যাচ্ছে না। কেননা, এটি বৈধ। তবে বিষয়টি আমরা এনবিআরকে অবহিত করেছি।’

কৌশল অবলম্বন : বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী শুল্ক বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, এসব স্বর্ণ সংশ্লিষ্ট যাত্রী কিংবা বৈধ ব্যবহারকারীদের জন্য আসছে না। শুল্ক পরিশোধ করা যাত্রীরা কেবল বাহক হিসেবে কাজ করছেন। প্রত্যেক যাত্রী দুটি স্বর্ণের বার এনে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে ৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স দিচ্ছেন।

এর বাইরে হয়তো বহন করার জন্য তিনিও কিছুটা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। মূলত অবৈধ উপায়ে স্বর্ণ ধরার ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ির কারণে চোরাচালানকারীরা এ পথটি বেছে নিচ্ছেন। কেউ হয়তো ৬০টি স্বর্ণের বার বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে চাইছেন। তিনি এজন্য ৩০ জন যাত্রীকে দুটি করে বার দিয়ে দেবেন। এসব কাজে বিশ্বস্ত যাত্রীদের ব্যবহার করা হয়। পুরো কার্যক্রমে প্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হয়। তারা বিমানবন্দরে এসে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে প্রয়োজনীয় কর পরিশোধ করবে।

কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসার পর নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় এসব স্বর্ণ হাতবদল হয়ে যায়। এ সময় যিনি বহন করে আনছেন, তাকে চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক ‘পুরস্কার’ দিয়ে দিচ্ছেন। ঐ কর্মকর্তা বলেন, দেখা গেছে অনেক যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে, যারা ঘন ঘন বিদেশে যাওয়া-আসা করছেন। আসার সময় দুটি করে বার নিয়ে এসে ঘোষণা দিয়ে সরকারকে কর পরিশোধ করছেন, যা অস্বাভাবিক।

শুরুতে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই এসব স্বর্ণ হাতবদল হতো। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ধরার পর সতর্ক হয়ে যায় চোরাকারবারীরা।

বিমানবন্দরে এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন্স) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, গত কয়েক মাসে বিমানবন্দরে এ ধরনের প্রায় ১৫টি আটকের ঘটনা আছে। দেখা গেল, যার কাছে স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে, তিনি বিদেশ থেকে আসা যাত্রী নন কিংবা ঐ স্বর্ণ কর দিয়ে বৈধ করার রিসিটও তার নামে নয়। আবার এক ব্যক্তির হাতে অনেকগুলো স্বর্ণের বার।

এসব ঘটনায় আটক করে মামলা করার পর তারা এখন আর বিমানবন্দরে তেমন ধরা পড়ছে না। এসব স্বর্ণ চোরাকারবারীদের হাতে চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে ব্যাগেজ রুলসে পরিবর্তন আনা উচিত বলে মত দেন তিনি।

এদিকে এসব স্বর্ণ কোথায় যায়, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও পুরো খাতে আইনি কাঠামো কিংবা নজরদারির মধ্যে না থাকায় এ খাতে এখনো শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে সরকার স্বর্ণ নীতিমালা পাশ করে। এই নীতিমালার আওতায় বাণিজ্যিকভাবে স্বর্ণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯ জন ডিলার স্বর্ণ আমদানির অনুমোদন নিয়েছেন। তারাও প্রতি ভরিতে ২ হাজার টাকা শুল্ক পরিশোধ করে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবেন।

কিন্তু বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস) জানিয়েছে, গত প্রায় দুই বছরে বাণিজ্যিকভাবে মাত্র দুই চালানে স্বর্ণ এসেছে ১৮ কেজি। বাজুস সূত্র জানায়, বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানিতে ভরি প্রতি ২ হাজার টাকা শুল্ককর ছাড়াও ব্যাংক চার্জ, বিমা খরচ, বিএসটিআই কর্তৃক মান পরীক্ষার চার্জসহ সব মিলিয়ে আরো দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ ব্যাগেজ রুলসের সুবিধা নিয়ে আনা স্বর্ণে ভরি প্রতি ২ হাজার টাকার বাইরে আর কোনো খরচ হচ্ছে না। অন্যদিকে আমদানির ক্ষেত্রে ভরি প্রতি খরচ পড়ছে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

সরকারের ব্যাগেজ রুলস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০১৯ সালে এটি সংশোধন হয়েছে। ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে আনা স্বর্ণের বিষয়ে ‘নট ফর সেল অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ কথাটি লেখা থাকে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক্ষেত্রে তদারকির শক্ত কোনো আইনি কাঠামো নেই। ফলে শুল্ককর পরিশোধের কাগজপত্র কিংবা যাত্রীর পাসপোর্টের কপি রেখে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের হাতে যাচ্ছে একটি ভালো অংশ। বাজুসের সংশ্লিষ্ট সূত্রও জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা এসব স্বর্ণ কিনছেন বলে জানিয়েছে।

অবশ্য বাজুসের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা ব্যাগেজ রুলসের আওতায় আনা স্বর্ণ জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা কিনছে না বলে দাবি করেছেন। যদিও তিনি বলেন, স্বর্ণ আমদানি নীতিমালার কিছু দুর্বলতার কারণে আমদানিকারকেরা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। আমদানি করলে সব মিলিয়ে খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা আর ব্যাগেজ রুলসের আওতায় এলে মাত্র ২ হাজার টাকা। আবার আমদানির ক্ষেত্রে স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য বিএসটিআর রিপোর্ট পাওয়ার আগে স্বর্ণ পাওয়া যায় না। এসব কারণে বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি হচ্ছে না বললেই চলে।

কিন্তু হঠাত্ করে ব্যাগেজ রুলসের আওতায় এত বেশি পরিমাণ স্বর্ণ আসার কারণ কী? শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে বিভিন্ন পক্ষের ব্যাপক তত্পরতার কারণে ঐ পথকে এখন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন চোরাকারবারিরা। ধরা খেলে সব স্বর্ণই চলে যাচ্ছে। আবার নিজেরাও থাকেন ঝুঁকির মধ্যে। এ কারণে ভরিপ্রতি ২ হাজার টাকা আর যাত্রীর খরচসহ কিছু বাড়তি টাকা গেলেও এই পথ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *