শিরোনাম

আকর্ষণীয় অফারে প্রতারণা, সর্বস্বান্ত চাকরি প্রত্যাশীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ।

বিদেশে চাকরি বা দেশেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘আকর্ষণীয় অফারে’ নানা ধরনের চাকরির প্রলোভনে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমনকি পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল বা বিমানবন্দরের বর্ধিতাংশের কাজের নামেও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। চাকরির নামে এসব প্রতিষ্ঠানকে টাকাপয়সা দিয়ে পথে বসছেন চাকরি প্রত্যাশীরা।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

এছাড়া বিদেশে মোটা অঙ্কের বেতন কিংবা দেশেই আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি বা বিনিয়োগ করলে দ্বিগুণ লাভের মতো নানা অফারেও প্রতারণা চলছে প্রতিনিয়ত। এতে শুধু সাধারণ কিংবা সহজ-সরল জনগণই যে প্রতারিত হচ্ছেন তা নয়, এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও প্রতারিত হয়ে হারিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি যেভাবে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও প্রতারকদের অধিকাংশ গ্রেফতারও হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এসব প্রতারক গ্রেফতারের কিছুদিন পর জামিনে ছাড়া পেয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে বসছে।

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকার রিকশাচালক জহির উদ্দিন গত ১০ বছর ধরে রিকশা চালিয়ে তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু করোনাকালে তার আয় প্রায় বন্ধ হয়ে পড়লে ভীষণ বিপাকে পড়েন। তার এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ায় এলাকার পরিচিত এক পোশাক কারখানার কর্মী মনির উদ্দিন। মনির করোনাকালে জহিরের দুর্দিন দেখে বিভিন্ন জায়গা থেকে খাদ্যসামগ্রী এনে দেন। এভাবে মনিরের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে জহিরের।

একদিন মনির তাকে পরামর্শ দেন টাকাপয়সা যা আছে সব এক করে ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যেতে। সেখানে রেস্টুরেন্টে চাকরি করলে মাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতন পাবেন। সঙ্গে বকশিশও মিলবে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা। মনিরের এমন প্রলোভনে জমানো কিছু টাকা এবং জমি বিক্রি করে আড়াই লাখ টাকা তুলে দেন জহির।

মনিরও যাদের মাধ্যমে জহিরকে মালয়েশিয়ায় পাঠাবেন, তাদের কাছে টাকা জমা দেন। এর মধ্যে ভিসা-পাসপোর্ট সব প্রস্তুত হয়ে যায়। একদিন জহির তার স্বপ্নের পথে পা দেওয়ার তারিখ পান। তারিখ অনুযায়ী জহির বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে রাজধানীর মালিবাগে যাদের মাধ্যমে বিদেশ যাবেন তাদের কাছে আসেন। এসে দেখে জহিরের মতো আরো ১৭ জন মালেশিয়ায় যাবেন। যথারীতি সবাই মিলে রওনা হন। কিন্তু জহিরেরা দেখলেন তারা যে বাসে উঠেছেন, তা বিমানবন্দরে যাচ্ছে না। তখনই তাদের সন্দেহ হয়। পরে জানতে পারেন তারা সবাই অবৈধভাবে যাচ্ছেন।

তাদের মধ্যে কাউকে মালয়েশিয়ায়, কাউকে ইউরোপের আয়ারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে নেওয়া হচ্ছে। তবে বিমানে নয়, বাসযোগেই যেতে হবে। এজন্য তাদের প্রথমে নেওয়া হয় ভারতের হায়দ্রাবাদে। সেখানে গিয়ে দেখা মিলল আরো ১০ জনের, যারা জহিরদের মতোই বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের সেখানে ১৫-২০ দিন আটকে রেখে সবার বাড়ি থেকে আরো কয়েক লাখ টাকা নেয় প্রতারকেরা। পরে তাদের নৌকাযোগে শ্রীলঙ্কার জঙ্গলে নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার করে দেওয়ার খবর পেয়ে তারা স্থানীয় শ্রীলঙ্কানদের সহায়তায় দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর বিষয়টি সিআইডিকে অবহিত করেন। সিআইডি অভিযোগ পেয়ে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে।

এভাবে শুধু যে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, সরকারি সচিব কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এমন প্রতারণার তথ্য আমরা পাচ্ছি, যা শুনলে রাগ হয়, আবার হাসিও পায়। আমারই এক বন্ধু বিশেষ পুলিশ সুপার একবার ৪৮ লাখ টাকা প্রতারণার শিকার হয়েছিল। কেউ তাকে প্রলোভন দেখিয়েছিল যে যমুনা ফিউচার পার্কের একটা ফুড কোর্ডের দোকানে বিনিয়োগ করলে তিন মাস পর দ্বিগুণ টাকা পাবে। কিন্তু ৪৮ লাখ টাকা দেওয়ার সপ্তাহখানেক পরেই লাভ তো দূরের কথা, মূল টাকা নিয়েই ভেগেছিল প্রতারক। শুধু সে নয়, এমন একাধিক ব্যক্তি আছে যাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিবও রয়েছেন, যারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

সূত্র জানায়, গত দুই মাসে রাজধানী এবং এর আশপাশের বিশেষ করে সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে শতাধিক প্রতারককে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় তিন শতাধিক ভুক্তভোগী চাকরি প্রত্যাশীকে। কিন্তু যেসব প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা কিছুদিন জেলে থাকার পর নানা উপায়ে জামিন পেয়ে ফের একই কাজ করে, যার কারণে চরম বিপাকে পড়তে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘গত কয়েক মাসে যত আসামি ধরেছি, তার মধ্যে অধিকাংশই প্রতারক। তারা বিভিন্ন নামে-বেনামে অবৈধ কোম্পানি খুলে তাতে নিয়োগ দেওয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। এতে চাকরি প্রত্যাশীরা যোগাযোগ করলে টাকার বিনিময়ে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির নিয়োগপত্র হাতে ধরিয়ে দেয়। কিন্তু মাস পার হওয়ার আগেই তারা টাকাপয়সা নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। এরপর অন্য এলাকায় এক মাসের জন্য ফের একটা রুম ভাড়া নিয়ে আবারও চাকরির বিজ্ঞাপন নিয়ে প্রতারণা শুরু করে।’ তিনি বলেন, এদের প্রতিহত করতে হলে জনগণকে সচেতন হতে হবে। কোথাও প্রতারণার শিকার হলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি যেমন অবহিত করতে হবে, তেমনি এসব কাজে প্রলোভিত হওয়া যাবে না, সেদিকেও নিজেদের লক্ষ রাখতে হবে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *