শিরোনাম

জীবনকে তিনি নিষ্ঠার কাছে খরচ করেছেন

বিনোদন প্রতিবেদক ।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মঞ্চনাটক দেখতে গিয়ে প্রথম দেখা তার সঙ্গে। আমার কাছে আলী যাকের নামটির প্রতি বাড়তি মোহ ছিল একটা বিশেষ কারণে। তা হলো উনি কী অসাধারণ ইংরেজি খবর পড়তেন! ইংরেজি বলেন। আবার সেই মানুষটিই মঞ্চে কী দুর্দান্ত বাংলা সংলাপ আওড়াচ্ছেন! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই ব্যাপারটিতে অবাক হয়ে সেই থেকে আলী যাকেরকে দেখতাম।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

এরপর কাজের সূত্রে পরিচয়। সম্পর্কের বয়স বাড়ে আমাদের। লাক্স চ্যানেল আই ফটোসুন্দরী আয়োজন শুরুর উদ্যোগে তার ভূমিকার কথা না বললে নয়। প্রথম পর্বে তিনি গুছিয়ে দিয়েছিলেন সেই ইভেন্ট। এর বাইরে চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে এক দারুণ পারিবারিক সম্পর্ক। নাটক, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, কিংবা টকশো। যাকের ভাইকে আমরা খুব আপন করে পেয়েছি। একটা লেট নাইট শো তিনি গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা করেছেন। তো সেই অনুষ্ঠান শেষ করে সবাইকে নিয়ে দারুণ এক আড্ডা দিতেন। একসঙ্গে ২/৩টা করে পর্ব শুটিং করতেন। যেদিন তার শুটিং থাকতো সেদিন ঐ অনুষ্ঠানের সব প্রযোজককে হাজির রাখতেন। পরে একসঙ্গে আড্ডা দিতেন। একসঙ্গে খেতেন।

আলী যাকেরের ভীষণ ফটোগ্রাফির নেশা। কোন লেন্স নতুন বাজারে এলো, কোন ক্যামেরাটা আপগ্রেড—এসব খবর তার মাথায় থাকতো সবসময়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যখন তিনি আসতেন শিল্পী সম্মানী নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি মজা করে বলতেন, সাগর তোমার এই টাকা দিয়ে আমি সিঙ্গাপুর থেকে নতুন একটি লেন্স আনাবো। এ জন্যই প্রোগ্রামটা করছি। তুমি আমাকে ৫০০ টাকা বাড়ায়ে দিবা। এ রকম মজা ঠিকই করতেন, অথচ আজও যদি আমার ড্রয়ার খুলি সেখানে আলী যাকের ভাইয়ের কোনো অনুষ্ঠানের শিল্পী সম্মানীর খাম পাওয়া যাবে, যা তিনি নিতে ভুলে গেছেন। যেকোনো উপলক্ষে কনা তাদের বাসায় খাবার পাঠাতো। সেখান থেকেও আসতো।

অনুষ্ঠান শেষে আমাদের বানানো কিছু মিষ্টি প্যাক করে উপহার হিসেবে আমরা দিতাম তাকে। হঠাত্ একদিন বললেন, সাগর এগুলো আর দিও না। নিয়ে গেলেই খেতে ইচ্ছে করবে। কিন্তু এখন তো আর খেতে পারবো না। ডাক্তার আমাকে মিষ্টি খেতে বারণ করেছেন। আমি বললাম, যাকের ভাই, তাহলে আপনার জন্য আমরা সুগার ফ্রি মিষ্টি বানাবো। এরপর আমরা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলাপ করে সুগার ফ্রি মিষ্টি তৈরি করি। সেই মিস্টি খেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। চ্যানেল আইতে একটি মুক্তিযুদ্ধের নাটকে প্রথম বাবা-ছেলে কাজ করেছিলেন। সেটাই একমাত্র কাজ করা পিতা-পুত্রের। নাটকটির নাম ছিল ‘তিনি একজন’।

বিষয় যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাই আলী যাকের নিজেই বললেন, আমি ছেলেকেই রাখতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের প্লট যেহেতু ইরেশই থাকুক। সেই নাটকের শুটিংয়ের দিনই রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আমার উপস্থাপনায় একটি তৃতীয় মাত্রা করি। সেখানে বাপ-ছেলে একই পোশাকে ছিলেন। দুই প্রজন্মের কথোপকথনে কী দারুণভাবে রবীন্দ্রনাথকে বোঝালেন আলী যাকের। আবুল হায়াতের পরিচালনায় অধিকাংশ নাটকের গল্প ভাবা হতো আলী যাকেরকে ঘিরে। একটি নাটকের সংলাপ তো আবুল হায়াত ও আলী যাকের একসঙ্গে বসে ঠিক করেছিলেন।

অসাধারণ ইংরেজিতে ক্রিকেট ধারাভাষ্য দিতেন মানুষটি। এক জীবনে একজন আলী যাকেরের যে ব্যাপ্তি সত্যিই ভাবলে অবাক লাগে, জীবনকে তিনি নিষ্ঠার কাছে খরচ করেছেন। একজন আলী যাকেরের প্রতি আমার এটাই উপলব্দি। আমাদের পূর্ণ করেছেন তার কর্ম, লেখা, অভিনয়, দর্শন দিয়ে। তিনি যা দিয়ে গেছেন তাতে সমৃদ্ধ হয়েছে গোটা বাংলা সংস্কৃতি। মঞ্চের কথা তো বলাই বাহুল্য। সেখানে তিনি এক মহাকাব্যের মতো উপস্থিত ছিলেন, আছেন, থাকবেন চির স্মরণীয় হয়ে।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *