শিরোনাম

দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক ।

পরনে লালপেড়ে শাড়ি, মাথার খোঁপায় গোঁজা একটি তাজা লাল গোলাপ, দুই কানে লালপাথরের দুল, কপালে বড়ো লালটিপ, হাতে একগাছা কাঁচের লাল চুড়ি, হাত নাড়ালেই ঝনাৎ ঝনাৎ করে বাজে, আয়তচোখে বিদ্যুতের দ্যুতি, লালে লালবরণ আঁটোসাটো চেহারার মেয়েটির শরীর যেন আগুনের তৈরি এবং এখনি আগুন থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছেলে-মেয়ের মাখামাখির মধ্যে সম্পূর্ণ আলাদা এই মেয়েটির নিরাপত্তা ওর নিজের শরীর।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

আগুন লেগে যাবার ভয়ে কেউ মেয়েটির শরীর ঘেষে দাঁড়ায় না। সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটে। তাকানো যায় না এতো তীব্র রূপ নিয়ে পাবলিক গেদারিং-এ আসা উচিৎ কিনা এই নিয়ে তুমুল মিষ্টি বিতর্কও চলে কারও কারও মধ্যে। মেয়েটি একটি জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। তৃতীয়বার চেষ্টার পরেও আগুনরূপা মেয়েটির শরীর ঘষে আগুন নিতে ব্যর্থ সম্রাটবিরক্তি নিয়ে বলে, শালী যে ফড়িং-এর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে, পাখাটা নেই এই যা। হঠাৎ মেয়েটির ছোটাছুটি বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ে গেল। ভয় পেয়ে গেল সম্রাট, মেয়েটির ভাবগতিক কেমন লাগছে, কাউকে খুঁজছে বোধ হয়। টের পেয়ে গেল কি না? এই কথা বলার সাথে সাথে মেয়েটি উড়াল দিয়ে সম্রাটের সামনে এসে পড়ল ডানাভাঙা ফড়িং-এর মতো। যে গাছের ছায়াটির নিচে সম্রাটদাঁড়িয়েছিল আপাত একা, সেখানে মেয়েটা এসেছে একটু ছায়ার জন্য। হাতে ছোট্ট একটি কাগজের রঙিন পাখা। ওটা দিয়ে শরীরের আগুন নেবানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। যে দূরত্বে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে মেয়েটির সমগ্রশরীর খুব ভালোভাবেই মনে আঁকিয়ে নিতে পারে সম্রাট। কিন্তু শরীরের ঘ্রাণ নেবার জন্য আরো নৈকট্য প্রয়োজন। এখনি ধাক্কা দিয়ে মেয়েটির কাঁধের উপরে হাত ফেলে সরি বলে চলে আসবে কি না, একথা ভাবছে, ঠিক তখনি হন্যে হয়ে ছুটে এসে মেয়েটির সামনে দাঁড়াল ওর বয়সী এক বলিষ্ঠদেহী তরুণ। ছেলেটি যেন বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এসেছে এমনভাবে ঘামছে, টি-শার্ট ভিজে জবজবে। মেয়েটির মতোই ছটফট করে ছেলেটি। এক মিনিটও দাঁড়ায়নি, ছেলেটির ঘর্মাক্ত হাত ধরে মেয়েটি চলে গেল। যেন জালে আটকা মাছ হাতে তুলে নেবার পরে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ল, ইস্ করে ওঠে সম্রাট!

চৌদ্দ’শ উনিশের নববর্ষের রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে টিএসসিতে প্রথম আবিষ্কার করেছিল আগুনরূপা মেয়েটিকে। সেদিন মেয়েটির শরীরের থেকে আগুন এসে ঝলসে দিয়েছিল সম্রাটের শরীর, মন। আগুনপোড়া মানুষের মতো শরীর-মনে সেই যে স্থায়ী দাগ ফেলেছিল, সেই দাগ আর কতোদিন বহন করবে সম্রাট? চৌদ্দ একুশের চৈত্রের শেষ দিবসে কাকডাকা দুপুরে একটি প্রবীণ কাকের গভীর তীব্র চিৎকারে অসহ্য ঠেকলে ভাতঘুমের পরিবর্তে মেয়েটির কথাই ভাবছে সম্রাট। প্রবীণ কাকের গভীর তীব্র চিৎকারের বিরক্তির মধ্যেও সম্রাটের চোখের দু-পাতায় ফর্সা কোমল তুলতুলে নরম দুটি পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে আগুনরূপা মেয়েটি। সারা বছর কোথায় যেন লা-পাত্তা হয়ে থাকে। নববর্ষের দিন সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে সূর্যোদয়ের মতোই লালবরণ সাজে মেয়েটির উদয় হয় ক্যাম্পাসে। প্রতিবারই মেয়েটিকে খুঁজে বের করে সম্রাট। সেই একই ছেলে মেয়েটিকে একাই দখলে নিয়ে ক্যাম্পাস দাবড়ে বেড়ায়। নববর্ষের রাতে বন্ধুরা যখন দামি মদ আর ছেরি নিয়ে মত্ত, সম্রাটের অন্তর্জগতে তখন আগুনরূপা মেয়েটি নগ্ন হয়ে নৃত্যু করে। মেয়েটিকে যক্ষ্মেরধনের মতো আগলে বেড়ায় যে ছেলেটি, ওর মাথায় একটা গুলি ঢুকিয়ে শুইয়ে দিয়ে কতবার যে মেয়েটিকে ছিনতাই করে! কিন্তু দুর্ভাগ্য, ছিনতাইয়ের পরেই স্বপ্নটা ভেঙে যায়!

এখন নিভন্ত দুপুর। ভুলেই গেছিল সম্রাট—মোবাইলের সাউন্ড অফ করে শুয়েছে। তড়িঘড়ি করে মোবাইল হাতে নিয়ে তাজ্জব—এই দুই ঘণ্টায় মিসকল ২৫টি। প্রিন্সেরই ২১টি। চারটায় বের হওয়ার কথা ছিল। পার্টির সভাপতি ক্যাম্পাসে নেই, সেক্রেটারির সঙ্গে একপাক দেখা করে বিকেলটা আজিজ মার্কেটের দিকে কাটিয়ে রাতে শান্ত নিরীহ ছেলের মতো রুমে ফেরার ইচ্ছা। কিন্তু ইচ্ছাটা শেষ পর্যন্ত টেকে কিনা কে জানে? প্রিন্স, ডন, বিপ্লব শালারা তো এই দিন আসলে পাগলা পারভার্ট কুকুরের মতো ক্ষ্যাপা হয়ে ওঠে। মদ-মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তির নাম দিয়েছে মিষ্টিমুখ। প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়—বছরের প্রথম দিন মিষ্টিমুখ না করলে নাকি বছরটাই মাটি। ধনুকভাঙা পণ করে বসে আছে সম্রাট, মিষ্টিমুখ যদি করতে হয় আগুনরূপা মেয়েটি দিয়েই করবে। কিছুতেই পথ পাচ্ছে না। এই অপ্রাপ্তি জন্য যে পরিমাণ হিংস্রতা আর উন্মত্ততা তৈরি হবার কথা, তা হয়নি বলে চরম বিরক্তি নিজের ওপরে। ফের প্রিন্সের কল, শালা, তুই মরেছিস নাকি, এতোবার কল দিয়ে যাচ্ছি লা-জবাব। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা আসছি তোর রুমে।

ভেড়ানো দরজা ঠেলে রুমে ঢুকেই প্রিন্স চেঁচিয়ে ওঠে, ও শালা! তুই এই বেলা ঘুমাচ্ছিস? তোর বিরহের দিন বে! তোর আগুনপরী তো কাল আসবে—হুলো বিড়ালের মতো জিভ চাটবি আর পেছনে পেছনে ঘুরবি। ওদিকে আর একজন ঠিকই টার্গেট করে ফেলেছে। সম্রাটহুড়মুড়িয়ে উঠে বসে, টার্গেট করে ফেলেছে? আমার মিষ্টিমুখ হলো না…। বগলের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি বোতল টেবিলে উপরে রাখল ডন। রিভলবারটা পকেট ভারী করে রেখেছে সকাল থেকে, পকেট থেকে বিরক্তির জিনিসটি বের করে বিছানার নিচে রেখে বসতে বসতে বিপ্লব বলে, এখনো সময় আছে। বাজেট দে। কালই মুরগি জবাই করি। তোর মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা করি। এরপরের বছর দেখবি তোর আগুনপরী কোলে বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে টিএসসিতে। এতোটা ধৈর্য ডনের নেই, সোজাসাপ্টা কথা বলে—এবারের মিষ্টিমুখ তোর আগুনপরীকে দিয়েই হবে। শালী ফড়িং-এর মতো উড়ে বেড়ায়। আমাদের পাত্তাই দেয় না। প্রতিবছর ফাঁদ পাতি, শালীর ঘুঘু ফাঁদে পা দেয় না। ঠিকই ফসকে যায়। প্রিন্স সম্রাটের নিবুর্দ্ধিতাকে দায়ী করে বলে, তোর নেকামী আর নিবুর্দ্ধিতার কারণে… । গতবার তোর আগুনপরীর আশায় থেকে মিষ্টিমুখ বানচাল হবার দশা, ভাগ্যিস একটা জুটেছিল ডনের কল্যাণে। ডন বলে, এবার আমার হাতখালি। এবার আর তোর বাঁধা মানছি না। তুই মাল খেয়ে শুয়ে থাকবি রুমে। মুরগি জবাই হয়ে গেলে, আমাদের মিষ্টিমুখ হয়ে গেলে, তারপর ডাক পড়বে তোর।

সম্রাটহঠাৎ ভাবিত। আগুনরূপা মেয়েটির শরীরে ওদের নখরাঘাত পড়বে, একথা ভাবতেই শরীর কেমন কেঁপে ওঠে। ওরা তো শকুন—মেয়েটির শরীর ছিঁড়ে মাংস চিবাবে নির্ঘাত। সম্রাটকে চিন্তিত দেখে বিপ্লব বলে, মেয়েটার জন্য তোর এতো কিসের টান! প্রতিবার টার্গেট করি, প্রতিবার হাত-পা ধরিস। বস্তুত, সম্রাটের এই প্রবল বাঁধার কারণেই মেয়েটির প্রতি ডন-বিপ্লবের এতো তীব্র আকর্ষণ। ওদের ভাষ্যে, এই মেয়ের মতো সুন্দরী মেয়ে হাপিস করেছে। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নেবার জন্যে সম্রাট বলে, মাস্টার্স পরীক্ষা নাকি আগামী মাসেই? প্রিন্স লাফিয়ে ওঠে, প্রসঙ্গ পাল্টানোর কৌশল ধরে ফেলে, ওসব বাদ দে। মাস্টার্স পরীক্ষা তাতে আমাদের কী? আমি তো এবার ইয়ার ড্রপ দিচ্ছি। সম্রাট চমকে ওঠে, ইয়ারড্রপ দিচ্ছিস! ওদের মধ্যে ডন এক ইয়ার ড্রপ দেবার অভিজ্ঞতা থেকে বলে, চমকে উঠলি যে! আমি আবারও ইয়ার ড্রপ দেবো। পলিটিক্স করবি, এমপি, মন্ত্রী হবি, মাল কামাবি, বাছা বাছা মেয়েমানুষ নিয়ে শুবি, আর ইয়ার ড্রপ দিবি না, তাই কি হয়? একটা মেয়েমানুষের কথা ভেবে মাস্টারবেট করবা আর হা-পিত্যেশ করবা, এসব ন্যাকামো ছাড়ো পাগলু। এখনো সময় আছে লাইনে আসো। সম্রাট অসহায়ভাবে বলে, তোরা জানিস না। বাবা শুনলে হার্ট ফেইল করবে। প্রিন্স মহাবিরক্তি নিয়ে বলে, ঐ ঘটনাটা ঘটলেই তোর মুক্তি। সারাজীবন স্কুলে মাস্টারি করে স্কুলের বাচ্চাদের মতোই হার্ট তোর বাবার। ছেলেকে নিয়ে বড়ো কিছু ভাবতে পারে না। আরে, তোর ছেলে এমপি-মন্ত্রী হবে, তুই ব্যাটা বাহাদুরি করে বেড়াবি, তা না, চাকরি চাকরি করে হেদিয়ে মরল। সম্রাট বলে, কিন্তু আমরা কি সে রকম লিডার হতে পেরেছি। সভাপতি, সেক্রেটারি এসব হতে পারলে না…। ডন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছিল, সম্রাটের কথার প্রত্যুত্তর দেবার জন্যে ওঠে বসতে চেষ্টা করে, আঁটোসাটো জিন্সের প্যান্টের কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারে না, কোমরের বেল্ট খুলে ফেলেছে, ভুড়িটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ায় গর্ভবর্তী শূকরীর পেটের মতো দেখাচ্ছে। এমনিতে যথেষ্ট কালো, এর উপরে কালো রঙের চাপা টি-শার্ট পড়ার কারণে বিকট কালো লাগছে। দু-হাতে ভুঁড়ি নাচিয়ে কথা বলে, তুই দেখছি, পলিটিক্সের প-ও শিখিস নি! ছাত্রজীবনে দ্বিতীয়-তৃতীয় সারির নেতারাই এলাকায় গিয়ে সাইন করে। এখানে তো খালি শিখবি। ডনের কথার সমর্থন দিয়ে বিপ্লব বলে, আমাদের এলাকার এমপি সরকারি কলেজের পাতি নেতা ছিল, এখন ওর কাছে কেউ পাত্তা পায় না। সাহসটাই আসল ব্যাপার। প্রিন্স এতোক্ষণ একাগ্রমনে সিগারেট ফুঁকছিল, আর ধোঁয়া উড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। তীব্র বিদ্রƒপের সুরে বলে, কালকেই সম্রাটের সাহসের পরীক্ষা হবে। ডন-বিপ্লব চেঁচিয়ে ওঠে একসঙ্গে, শালা কালই তোর পরীক্ষা…

সম্রাটের জন্য এ এক কঠিন পরীক্ষাই বটে। ওদের সর্বগ্রাসী রাক্ষসমূর্তি দেখেছে—আগুনরূপা মেয়েটিকে যে কোনমূল্যে…। মেয়েটির প্রেমিক আছে—গুলি চালানো থেকে খুন-খারাবি ওদের জন্য ডালভাত। ওরা গুলি চালিয়ে অভ্যস্ত, ডনের কাছে গুলি চালানো ঝালমুড়ি মাখানোর মতো সহজ একটি কাজ। স্কুলশিক্ষক বাবার ছেলে হবার কারণেই কি না, মেয়েমানুষ আর গুলি এই দুটি জিনিসেই সম্রাটের হাত-বুক কাঁপে। পার্টির দেওয়া রিভলবার জংধরে মরিচা পড়ার জো—কোন কাজেই লাগাতে পারে না। পার্টির দ্বি-বাষিক সম্মেলনে সময় বৃষ্টির মতো তুমুল গুলি ছোঁড়াছুড়ি দিনেও সম্রাটের রিভলবার থেকে একটি গুলি বের হয়নি! ভয় একটিই, যদি নিরীহ কোন ছাত্র-ছাত্রীর শরীরে বিঁধে। ঐদিনই ডনের পিস্তলের গুলিতে এক নিরীহ রিক্সাচালকের প্রাণ গেল। ডনের কোন অনুশোচনা নেই—বলে, গ-গোলের মধ্যে মরার জন্য এসেছিল কেন? প্রতি মাসে একবার, কোন মাসে দু-বার তিনবার স¤্রাটকে সামনে বসিয়ে মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করে, সম্রাটতাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, কিন্তু মেয়েমানুষের শরীরের হাত দেবার সাহস হয় না। ওদের জোরাজুরিতে দু-একবার চেষ্টা করেছিল বটে, ভয়ে তখন শরীরে ম্যালেরিয়ার কাঁপুনি শুরু হয়, লিঙ্গের উত্থান তো দূরের কথা শুকনো খড়ের মতো শুকিয়ে চিমটে লেগে থাকে। রুমে ফিরে মাস্টারবেট করলে তবে মুক্তি।

কাল আগুনরূপা মেয়েটিকে নিয়ে যা কিছু ঘটবে, তার সম্পূর্ণ দায় আমার, সম্রাটের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ভাবে—মেয়েটিকে আবিষ্কার করেছি আমি, তিন বৈশাখ ধরে তাড়া করে ফিরছি, যথেষ্ট উত্যক্তও করেছি, গতবছর টিএসসির ভিড়ের মধ্যে হাত ধরে ফেলেছিল বিপ্লব। সম্রাটপেছনে ছিল বলেই রক্ষা। মেয়েটা আগুনচোখে তাকিয়েছিল, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কে ওর হাত ধরেছে ঠাহর করতে পারেনি।

কী পরিকল্পনা এঁটেছিস তোরা? তোরা কি আর মেয়েমানুষ দেখিছ না চোখে? সম্রাটের কণ্ঠস্বর বিপন্ন মানুষের মতো শোনায়। ওরা তিনজন একসঙ্গে অট্টহাসি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে। অট্টহাসির বিকট ভয়াবহ শব্দ সম্রাটের করোটিতে প্রবেশ করে, অসহ্য মাথাব্যাথা রোগীর মতো দুই হাতে মাথা চেপে ধরে প্রচ- জোরে চিৎকার করে, চুপ কর তোরা, তোদের এই শয়তানি হাসি আমার ভালো লাগছে না। তোরা যা ইচ্ছা তাই কর গিয়ে, আমি নেই তোদের সাথে। স¤্রাটকে দুইদিক থেকে জাপটে ধরে ডন-বিপ্লব, মুখ চেপে ধরে প্রিন্স, শালা খাসি! এভাবে চিৎকার করছিস কেন? হলের ছাত্ররা যদি ছুটে আসে। সম্পূর্ণ অজান্তে ভেতর থেকে বেরিয়া পড়া চিৎকারটি যে এতো বিকট হবে, ভাবতে পারে নি সম্রাট। বাইরে থেকে কেউ ছুটে এলে বিপত্তি তো বটেই। চারজনই এখন নীরব। নীরবতারও নিজস্ব শব্দ আছে। সেই শব্দটিই উপভোগ করে তারা। ছোট্ট একটি বিছানায় চারটি শরীর পড়ে আছে চতুর্ভুজ আকৃতি হয়ে। নীরবতা উপভোগ অসহ্য হয়ে ওঠে ডনের, বিপ্লবের শরীরে লাথি মারে জাগিয়ে তোলার জন্য, ও শালা খাসির সঙ্গে তোরাও খাসি হলি নাকি? সেক্রেটারির সাথে দেখা করার কথা ছিল মনে আছে?

ওরা ভাবতে পারেনি, রাত ১২টা পর্যন্ত বন্দি থাকবে সেক্রেটারীর রুমে। উঠার জন্য পর্যাপ্ত বিরক্তি প্রকাশ করেও লাভ হয়নি। সেক্রেটারির নজর এড়ায়নি। পার্টির তরফে বিশেষ কোন প্রোগ্রাম নেই। নিজের ইচ্ছেমতো বর্ষবরণের দিনটা উপভোগ করবে কর্মীরা। প্রত্যেকের নামে বাজেট আছে, একটি পাঞ্জাবি অথবা টি-শার্ট বরাদ্দ আর্মসধারী কর্মীদের জন্য। এই পাঞ্জাবি-টি-শার্ট কিনে আনতে দেরি হওয়ায় এতো রাত হয়ে গেল। রুমে ফেরার পথে দু-বোতল ব্রান্ডি কিনে নিল, কিন্তু মশকিল হলো—পোড়ামাংস কোথায় পাবে এতো রাতে? মাংস ছাড়া জমবে না। সম্রাটবলে, মাল খেয়েই থাকতে হবে, রাতের খাবার-টাবার খেতে হবে না। ডন রাগে ফুঁসছে, সামান্য একটা টি-শার্ট আর মাত্র দুই হাজার টাকার জন্য এতো হুজ্জুতি! স¤্রাটকে পারলে এখানেই শুইয়ে ফেলে, শালা, তুই আছিস রাতের খাবার নিয়ে, এদিকে পরিকল্পনা যে সব মাটি হয়ে গেল। রাতে মাল খেয়ে থাকবি, না পারলে আমার ইয়েটা চিবোবি।

ওরা ফিরে এলো সম্রাটের রুমে। আর্মসধারী কর্মীর রুম—রুমের জানালা কখনোই খোলা হয় না বিশেষ সতর্কতার অংশ হিসেবে। দরজা কখনো হাট করে খোলা থাকে না। এইসব রুমে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত—পার্টির নির্দিষ্ট কিছু কর্মী ছাড়া সাধারণের ঢোকার জো নেই। সপ্তাহে একদিন ঝাড়–দার ডেকে এনে নিজে উপস্থিত থেকে রুম পরিস্কার করিয়ে নেয় সম্রাট।প্রিন্স-ডনরা ওদের রুম ছেড়ে এই রুমটাকে নিরাপদ মনে করে। পার্টির রুম—পার্টির ছেলেদের আড্ডা দেবার জন্যেই। উপদ্রƒব ছাড়া একটি রাতও নিরিবিলি কাটিয়েছে বলে মনে পড়ে না সম্রাটের। কিছুটা নিরীহটাইপের চেহারা আর ভদ্রছেলের মতো চলাফেরা করে বলে সম্রাটের উপরে উৎপাতটা একটু বেশি। এই রুমের একটা চাবি জয়েন সেক্রেটারি জাহিদের কাছে। মাঝেমধ্যেই বোতল বোগলদাবা করে চলে আসে, নিজের ইচ্ছেমতো সময় কাটিয়ে যখন চলে যায়, তখন রুমের চেহারা হয় বোতলবাজ জাহিদের মুখের মতোই এবড়োথেবড়ো। ওরা চলে গেলে এই ফাঁকে জাহিদ এসেছিল এর প্রমাণ বিছানার উপরে পড়ে থাকা বোতলটি। অন্যদিন সম্রাটবিষয়টিকে আমলে না নিলেও আজ কেন জানি অসহ্য ঠেকে, গালি দিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু গালি দেবার জন্য যে উদ্যম থাকা দরকার এই মুহূর্তে শরীরে নেই, শরীর ভেঙে পড়েছে। বোতল দু-টা টেবিলে রাখতে রাখতে বিপ্লব বলে, সম্রাটের রুমে আসাটাই ভুল হয়ে গেল। ও শালার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ, ইঁদুরের চোখের মতো হয়ে গেছে। প্রিন্স শার্ট-প্যান্ট খুলতে খুলতে বলে, এতো ঘুম তোর চোখে আসে কোথা থেকে? আমার চোখে তো ঘুম-ই নেই। একে একে চারজনই টি-শার্ট, প্যান্ট খুলে ফেলে—পরণে শুধু একটি শর্ট টাইপ আন্ডারওয়ার।

রাতের আড্ডা জমেনি। পোড়ামাংস নেই, নেশা হয়নি। বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে রাত ২টা পর্যন্ত কাটিয়ে প্রথমে প্রিন্স, তারপর ওরা দু-জন ঘুমিয়ে পড়ে। ছোট্ট একটা চৌকিতে তিনটা শরীরই জুলুম, ফ্লোরে পেপার বিছিয়ে শুয়ে পড়ে স¤্রাট। মহিষের মতো শরীর ডনের। ভয়ঙ্কর শব্দ করে নাক ডাকে। এই নাকডাকার অত্যাচারে বরাবরই ঘুম হয় না সম্রাটের, শালার নাকের ভিতরে যেন মেশিনগান সেট করা! বিকেলের পর থেকে একবারও আগুনরূপা মেয়েটির প্রসঙ্গ ওঠেনি। এই স্বস্তি নিয়ে ঘুমানোর কথা ভাবতেই পারে। কিন্তু ঘুম নেই চোখে এখন। চোখ জুড়ে আগুনরূপা মেয়েটি—পরনে সেই লালপেড়ে শাড়ি, খোঁপায় লাল গোলাপ, হাতে একগাছা কাঁচের লালচুড়ি, কপালে লাল টিপ। পাখা নেই, তবু ফড়িং-এর মতো ওড়ে। ওদের প্রবল আকর্ষণই সম্রাটের মনে মেয়েটির আসন পাকাপোক্ত করে দিল। মেয়েটির মধ্যে আশ্চর্য জাদু লুকিয়ে আছে। নিজেকে রক্ষা করে এই জাদুর জোরেই। কিন্তু প্রিন্স-ডন-বিপ্লবরা তো পাষ- পামর, হিংস্র হায়েনারও অধম, ওরা জাল ফেললে, সেই জাল ছিঁড়ে বের হওয়া কঠিনসাধ্য। শালাদের চোখে হিজড়া পর্যন্ত ধরে। থার্টিফাস্ট নাইটে টিএসসিতে এক হিজড়াকে নিয়ে সে কি টানাহেঁচড়া। সম্রাটবাঁধা দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ওরা কি তাই শোনে। সিসিটিভির ফুটেজে সেই দৃশ্য ধরা পড়লে সে কী মহা-কেলেংকারী। কপাল ভালো, ছবিগুলো খুব বেশি স্পষ্ট ছিল না। অস্বীকার করে পার পাওয়া গেছে। কাল যদি মেয়েটি টিএসসিতে আসে, এবং প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় আসাটাই স্বাভাবিক—ওরা যদি ফাঁদ পাতে, সেই ফাঁদে যেন মেয়েটা না পড়ে সেই চেষ্টা করবে সম্রাট। মেয়েটিকে অথবা তার প্রেমিককে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যদি বশে আনার চেষ্টা করে, ব্যর্থ হয়ে হিজড়াটার মতো ভিড়ের মধ্যে টানাহেঁচড়া করে, সম্রাটবাধা দেবে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে, একান্তই না পারলে যে রিভলবার এতোদিন কোন কাজেই লাগাতে পারেনি, কাল লাগাবে। এসব ভাবনার কোন ফাঁকে মা, বাবা, ছোটবোন রুনা এসে ভিড় জমালো এবং হঠাৎ করেই মনে হলো, পহেলা বৈশাখ বাবা-মার বিবাহবার্ষিকী। এবার কততম বিবাহবার্ষিকী মনে করার চেষ্টা করে। এই দিনটা পালন করে ঘরোয়া আয়োজনে। বাহির থেকে কিছুই কিনতে দেয় না। মা নিজের হাতে পিঠা বানায়। সেই পিঠা তুলে রাখে ছেলের জন্য। ছেলে ফিরলে পিঠাগুলোই খেতে দেবে প্রথমে। এই বছরেই রুনা এইচএসসি দেবে, ডাক্তারি পড়ার টার্গেট নিয়ে বেচারির এখন কঠিন তপস্যা। ওর স্বপ্ন, বাবার স্বপ্ন, মার স্বপ্ন একটাই—আমি চাকরি করব, মাসে মাসে বোনকে ডাক্তারি পড়ার খরচ জোগাবো। বাবার স্কুলের চাকরিটা আর বেশিদিন নেই, বছর দেড়েক। সংসারের হালটা কে ধরবে? আর এদিকে দেখো, ওরা আমার মধ্যে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আবিষ্কার করে সেই পথে টানার জন্যে মরিয়া। স্কুল মাস্টারে ছেলে মন্ত্রী-এমপি! হতেই তো পারি। বারাক ওবামা যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারে, আমি তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই হতে পারি। বিদ্রুপের হাসি ফোটে সম্রাটের ঠোঁটে। নিজের সঙ্গে বিদ্রƒপে মেতে ওঠে।

মোবাইল বেজে উঠলে লাফিয়ে ওঠে সম্রাট, শুভ নববর্ষ, ভাইয়া।

ঘুমকাতুরে কণ্ঠে সম্রাট শুভ নববর্ষ জানিয়ে বলে, রুনা, তুই এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছিস? নাকি রাতে ঘুমাসনি, সারারাত পড়েছিস?

আমি অনেক সকালে উঠেছি, তুই ঘুমাচ্ছিস বলে ডাকিনি। এই যে মার সাথে কথা বল।

শুভ নববর্ষ, বাবা।

শুভ নববর্ষ, মা। তুমি নিশ্চয় সকালেই পিঠা বানাতে লেগে গেছো?

মা হেসে ওঠে। দিন পনেরোর মধ্যে অবশ্যই বাড়ি আসবি।

মার হাত থেকে প্রায় ছিনতাই করে মোবাইল নিয়ে রুনা বলে, ভাইয়া, তুই কী রে! আজ পহেলা বৈশাখ, মা-বাবার…

ওদের ঘুমের ডিস্টার্ব হবে বলে এতোক্ষণ চাপাকণ্ঠে কথা বলছিল সম্রাট, এবার লাফিয়ে ওঠে, সরি বোন, সরি, মা-কে দে মোবাইলটা।

সম্রাটের বুক কেঁপে ওঠে এবং যেন মাছের কাঁটা আটকে আছে কণ্ঠনালীতে এমনভাবে উচ্চারণ করে, মা, হ্যাপি ম্যারেজ ডে।

মা কিছুটা লাজুক কণ্ঠে বলে, ধন্যবাদ।

বাবা উঠেছে কি?

রুনার হাতে মোবাইল দিয়ে মা বলে, তোর বাবার কাছে দে।

বাবা, শুভ নববর্ষ।

ছেলেকেই প্রথম নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাবে, মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, কিন্তু এতো সকালে রুনা শুভেচ্ছা বিনিময় করল যে, ছেলেই আগে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। বাবাকে ছেলে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, এই বছরটা দারুণ কাটবে, এই আনন্দে উদ্বেলিত বাবার মন। শুভ নববর্ষ বাবা।

বাবা, হ্যাপি ম্যারেজ ডে। সম্রাটের নিশ্বাস প্রায় রুদ্ধ হবার উপক্রম।

বাবার মন ভীষণ উচ্ছ্বসিত। সেই উচ্ছ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে ছোট্ট করে বলে, ধন্যবাদ। প্রতিবছর এই রুটিন কথাগুলো বলে বাবা : বেশি ভিড়ের মধ্যে যেও না। রোদের মধ্যে সারাদিন ঘুরে বেড়িও না।

ঘুম ভেঙে যাওয়ার ক্রোধে প্রথমে ডন, অতঃপর বিপ্লব, প্রিন্স তিনজনেই এমনভাবে হাত-পা ছোড়ে যেন ওদের গলায় ছুরি ধরেছে জবাই করার জন্যে। ঘুমের ঘোরেই প্রিন্স বলে, তোর মা-বাপ-বোনরা কি এখনই মরে যাবে নাকি রে! কথা বলার আর টাইম পাইলি না?

বাবা রাখছি, মোবাইল কেটে দিল সম্রাট। রেগে আগুন, তোরা তো বন-বাঁদাড়ে জন্মেছিস! কোনদিন দেখলাম না মা-বাবার সাথে কথা বলেছিস। একদিনও দেখলাম না, ওরা তোদের দেখতে ঢাকায় এসেছে। শিয়াল-কুকুরের বাচ্চার মতো জন্ম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

সম্রাটভেবেছিল, ওরা এখন ওকে খুন করবে। মা-বাবা তুলে এভাবে কথা বললে কোন ছেলে সহ্য করে, কিন্তু ওদের কোন প্রতিক্রিয়াই নেই। ডন নাক ডাকছে পূর্ববৎ। প্রিন্সের শরীরের অর্ধেকটা বিছানায়, অর্ধেকটা বাইরে। পা নড়ছে, অর্থাৎ জেগেই আছে। বিপ্লব লাফ পারছে পুঁটিমাছের মতো।

ঘুম থেকে উঠতে সকাল ৯টা বাজে। হল খাঁ খাঁ করছে। নববর্ষের এই দিনে কে আর থাকবে। তাই, ওদের ইচ্ছেমতো গোসল করে। বুকে দোতারা আঁকানো নতুন টি-শার্ট, প্যান্ট পরে, নিজ নিজ রিভলবার নিরাপদে সেট করে, যখন রুম থেকে বের হবে, ঠিক তখনি সম্রাটবেঁকে বসে, পাংশু মুখে জিজ্ঞেস করে, তোরা এখর কোথায় যাচ্ছিস? প্রিন্স ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে, কোথাও যাচ্ছি চান্দু। তারপর গান ধরে, আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম…। তোরা কি ঐ মেয়েটার…? বিপ্লব ভীষণ বিরক্ত, ঐ তুই কি শুরু করেছিস? একটা খেলার জিনিস নিয়ে মাতামাতি! প্রেমে পড়েছিস নাকি? বল মুখ ফুটে, তুলে এনে বিয়ে দেবো আজি। ডন তেড়ে ওঠে, কিসের প্রেম? ভেজা বেড়াল সেজে থাকলে কি হবে, ও শালার মতলব খারাপ, একাই মিষ্টিমুখ করার ধান্ধা। তিনজনের আক্রমণের মুখে অসহায় সম্রাট যে মেয়েটিকে চেনে না, চোখের নেশায় ধরেছে কেবল, সেই মেয়েটির জন্য বন্ধুত্ব, পার্টিতে নিজের অবস্থান খোয়াবে কেন? ওদের হাতে অস্ত্র আছে, এতো অনুরোধ, তোষামদ, অপেক্ষা কি ওদের মানায়? ওরা তিনজনই সেক্রেটারির স্পেশাল ব্রাে র কর্মী, ওদের জন্যই সম্রাটের হাতে অস্ত্র, পার্টির অবস্থান, হলে আলাদা একটা রুম, খরচ চালানোর টাকা, এতোটা অকৃতজ্ঞ হয় কী করে? এছাড়া সম্রাটের মতো বন্ধুকে খরচ করে ফেলতে ওদের জন্য কঠিন কিছু নয়। ওর চোখের সামনে পার্টির এক ছেলেকে হলের ছাদ থেকে ফুটবলের মতো লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিল বিপ্লব। সেই ছেলে তো আর বাঁচলই না।

এই মুহূর্তে সম্রাটের আর কিছুই করণীয় নেই। এখন একটিই প্রার্থনা—মেয়েটি যদি আজ ক্যাম্পাসেই না আসতো, তাহলে বেঁচে যেতো। এ পর্যন্ত যে কয়বার দেখেছে, প্রতিবার টিএসসিতেই দেখেছে। তাই টিএসসিতে পা ফেলেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সম্রাট। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। মেয়েটিকে আবিষ্কার করে ফেলে বিপ্লব। ভিড়ের মধ্যে একা একখ- জায়গা দখল করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেই ফড়িং-স্বভাব, চাঞ্চল্য কিছুই নেই। গম্ভীর মুখ, উদাসভাবে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছে। পরনে শুধু সেই লাল পেড়ে শাড়িটাই আছে। এছাড়া কপালে লাল টিপ নেই, মাথার খোপায় নেই লাল গোলাপ, হাত খালি। তবু মেয়েটির আগুনরূপ ঠিকরে পড়ছে।

ডন, বিপ্লব, প্রিন্স দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজনের মাথা এক হয়ে গেল। কিছু একটা শলাপরামর্শ চলছে। সামান্য দূরে কিছু পুলিশ বুকটান করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সামনে দিয়ে গমণরত বাদাম বিক্রেতা ছেলেটির ডালা থেকে একমুঠ বাদাম তুলে নিল একজন। ছেলেটি আগুনরূপা মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে বাদাম কেনার অজুহাত হাত ছাড়া করা যায় না বলে ছুটে গেল স¤্রাট। এই বাদাম দে ১০ টাকার, অর্ডার করেই মেয়েটির মুখের দিকে নয়, চোখ পড়ে পেটের দিকে—জয়ঢাকের মতো পেট কোনমতে লালপেড়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে। সম্রাটঅ্যা করে পেছনে হঠলে ছেলেটির হাত কেঁপে ওঠে, পাল্লা থেকে বাদাম ছিটকে পড়ে। মেয়েটি অবশ্য খেয়াল করেনি। বিশেষ একটা ঘোরের মধ্যে আছে। নিজের শরীরের ভার যে এই মুহূর্তে তার কাছে হিমালয় বহন করার মতো কষ্টের। সম্রাট পিঠ ফেরাতেই বিপ্লব গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটির সামনে। সিগারেট ধরিয়ে ভিড়ের মধ্যে টানতে শুরু করলে একজন মধ্যবয়সী লোক বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, এই ভিড়ের মধ্যে সিগারেট ধরালেন? কিন্তু বিপ্লবের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে দাঁড়ায়নি এমন একটি অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে বিপ্লব। সম্রাটফিরে এসে দেখে, ডন একাই দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিমূর্তি নিয়ে। প্রিন্স পুলিশের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে ফিরছে। প্রিন্স-ডন চোখ লাল করে তাকাল সম্রাটের দিকে। মুরগির কাছে তুই আগে গিয়েছিলি কেন? তোর কোন বিশ্বাস নেই। সাবধান করে দিতে পারিস। মেয়েটি গর্ভবর্তী, তোরা এতোটা পাষ- হতে পারিস না। স¤্র্টা বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনি পেছন থেকে বিপ্লব আসে, মুরগির পেটে বাচ্চা রে! টু ইন ওয়ান। কামদ উষ্ণতায় টনটনে ডন ছটফট করে ওঠে, শালার বেল্টুটা গাড়ি নিয়ে এখনো এলো না। ওর কোন কা-জ্ঞান আছে? মুরগি এখন হাতের কাছে, কোন ফাঁকে উড়াল দেয় কে জানে? ওর হাজব্যান্ডকেও দেখছি না আশেপাশে। এই ফাঁকে তুলে নিলে কেউ হৈচৈ করবে না। কেউ এগিয়ে আসতে চাইলে দু-একটা গুলি খরচ করলেই চলবে। গাড়ির কথা শুনে সম্রাটআঁতকে ওঠে, ওরা ভিতরে ভিতরে এতোটা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে! বেল্টু এসে দাঁড়াতেই ডন বলে, গাড়ি কোথায় রেখেছিস? ওসব এনেছিস? হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল কালো গ্লাসের গাড়িটা। বেল্টু গাড়ির দিকে চলে গেল।

ডানে ডন, বায়ে বিপ্লব, মধ্যে প্রিন্স, তিনজন হাত ধরাধরি করে এগোয় মেয়েটির দিকে। বিপ্লব সম্রাটের হাত ধরতে গেলে, ও ধরতে দেয় নি। ওরা তিনজন মেয়েটির কাছে পৌঁছবে, ঠিক তখনি মেয়েটির স্বামী এসে দাঁড়াল সামনে। মেয়েটির ক্লান্ত অবসাদগ্রস্ত শরীর টেনে পা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে রাস্তার দিকে সেই কালো গাড়িটার দিকে এগোতে থাকলে, প্রিন্সরা শুধু পিছু নিল। যেই না মেয়েটি গাড়িটিকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, ঠিক তখনি প্রিন্স মেয়েটির খোঁপায় ধরে ফেলে খপ করে। মেয়েটির স্বামী হাত ধরে টান দিতে গেলে বিপ্লব তলপেট বরাবর লাথি মেরে ফেলে দিল। সাপ খেলা দেখার মতো লোকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়িটিকে ঘিরে। বিষাক্ত তিনটি সাপ যেন ফণা তুলে ছোবল মারছে ক্রমাগত মেয়েটির শরীরে, আর একটি বিষহীন সাপ নিকটে দাঁড়িয়ে মাতালের মতো মাথা দুলছে। উদ্ধারের জন্য কেউ এগিয়ে গেল না। একে একে সমস্ত কাপড় ছিঁড়েখুঁড়ে মেয়েটির শরীর উদোম করেও গাড়িতে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ডন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, শালির শরীরে এতো রস! দাঁড়া, আগে কায়দামতো নিয়ে নেই, শালির রস মেরে গুড় বানাবো। এরমধ্যে তিনটা ককটেল ফুটানো হয়েছে। নপুংস পুরুষের দিকে যে রূপ করুণা চোখে তাকায় যুবতী, মেয়েটি তার নিজের সম্ভ্রম রক্ষার লড়াইয়ের এক ফাঁকে সেই দৃষ্টিতে তাকাল গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে এবং মুখ থেকে একদলা থুথু ফেলল শব্দ করে।

রিভলবার হাত নিয়ে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *