শিরোনাম

মূকাভিনেতা মীর লোকমানের পথচলা…

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক ।

২০১৯ সাল! আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের নতুন ছাত্র। রীতি অনুযায়ী আমাদের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ নতুনদের বরণ করে নিতে মার্চ মাসে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি ও অভিনয়সহ বেশ কিছু চমত্কার ইভেন্টের অন্তর্ভুক্তি ছিল। এগুলো ছাড়া একটা ইভেন্ট ছিল, যেটি আমাদের বিভাগের দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহপরান ভাই কর্তৃক অভিনীত মাইম বা মূকাভিনয়। এটিই আমার জীবনে দেখা প্রথম মূকাভিনয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, যিনি অনুষ্ঠানে মাইম পরিবেশন করেছেন তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের সদস্য। এজন্য পরে আমি নিজেও এই সংগঠনের সদস্য হিসেবে যোগদান করি এবং সাপ্তাহিক কর্মশালাগুলিতে অংশগ্রহণ করতে থাকি। একটানা কিছুদিন রিহার্সেলে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে খুব কাছ থেকে দেখা, চেনা ও জানার সুযোগ আমার হয়েছিল।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

হ্যাঁ, বলছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ ও ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মীর লোকমানের কথা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে, মীর লোকমান ও মূকাভিনয় যেন একটি প্রতিশব্দ। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই বিনোদন মাধ্যমটি পশ্চিমা বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার দাবিদার। বাংলাদেশে মূকাভিনয় অনেক আগে থেকে শুরু হলেও, এর প্রচার-প্রকাশ ঘটিয়ে দেশের সর্বত্র পুরোপুরি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তারপরও বিশ্ব বিখ্যাত মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদার, কাজী মশহুরুল হুদা ও রঞ্জন চক্রবর্তীসহ অনেকেই মূকাভিনয়কে সর্বত্র মানুষের মাঝে পৌঁছাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন বা করে যাচ্ছেন। মীর লোকমান তাদের মধ্যকার অন্যতম। তার স্বপ্ন হলো প্রাচীন ও অন্যতম এই শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম, মূকাভিনয়কে পুরো দেশব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলা।

নরসিংদীর এক প্রত্যন্ত এলাকায় জন্ম এই দৃঢ়চেতা তরুণের। ২০০৩ সালে নরসিংদীতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় দেখে তার কাছে ভালো লাগে এবং তা শেখার আগ্রহ জন্মায়। তারপর একা একা প্র্যাকটিস করে ২০০৬ সালে এক কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূকাভিনয় করে দর্শকদের অবাক করে দেয়। ২০০৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মূকাভিনয়ের পরিবেশনা দেখে মূকাভিনয়কে মনেপ্রাণে ভালোবেসে ফেলেন এবং শেখার আগ্রহও অনেকটা বৃদ্ধি পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ১৫ দিনব্যাপী কর্মশালাতে অংশ নিয়ে মূকাভিনয় শিখতে শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে মূল অনুষ্ঠানে অভিনয় করে তিনি দর্শকের পঞ্চমুখী প্রশংসায় ব্যাপক উত্সাহ পান। এভাবেই শুরু হয়েছিল তার মূকাভিনয় জীবনের পথযাত্রা। তারপর ২০১১ সালে ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে কয়েকজন বন্ধু মিলে, ‘না বলা কথাগুলো না বলেই হোক বলা’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে, ঢাবির টিএসসিতে প্রতিষ্ঠা করেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন (ডুমা-DUMA)।

সময়ের প্রয়োজনে মীর লোকমান ধাপে ধাপে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির কাছে মূকাভিনয় শিখেছেন। মাইমে শ্যাডো ও ম্যাজিকের সংযোজন যেন তার এক অসাধারণ সৃষ্টি। তাছাড়াও তিনি মাইমের সঙ্গে আবৃত্তি ও ডিবেটের সম্পর্ক স্থাপনসহ নতুন নতুন ধারা যোগ করতে ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আন্তর্জাতিক ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, বিদেশি কালচারাল সেন্টার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা দিবস এবং বিভিন্ন চ্যানেলসহ দেশের সর্বত্র মাইমের প্রয়োজনীয় শিক্ষা, মাইমের মহত্ত্ব ও মেসেজ নিয়ে মীর লোকমানের পদচারণা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেও তিনি একাধিকবার দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ২০১৬ সালে ভারতে, তিনি মূকাভিনয়ে দলগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হন এবং ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়েস্টার্ন ড্যান্সে প্রথম রানারআপ হয়েছিলেন।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *