2_279500
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে, যোগাযোগ জোরদার করে ও ভৌগোলিক গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা আমাদের লক্ষ্য। এ জন্যই বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার মিলে ‘বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর’ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
রোববার সেন্ট্রাল লন্ডনে পার্ক লেইন হোটেলে তার সম্মানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এ কথা বলেন। স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানের জন্য যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ এ সংবর্ধনা দেয়। অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ এমপি, ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, জ্বালাও-পোড়াও করে বাংলাদেশের অগ্রগতি স্তব্ধ করা যাবে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমরা বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে চাই।
শেখ হাসিনা বলেন, এই লন্ডন থেকে প্রথম আমি রাজনীতি শুরু করি। এখান থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি ওঠে। এর আগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে খালাস করতে লন্ডন প্রবাসীরা চাঁদা তুলে শ্বেতাঙ্গ আইন জারি করে টমাস উইলিয়ামকে নিয়োগ দেন। কিন্তু তাকে তৎকালীন সামরিক সরকার বাংলাদেশে যেতে দেয়নি। ’৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিরুদ্ধে প্রথম লন্ডনেই শেখ রেহানা প্রতিবাদ ও বিচার চেয়ে সভা-সমাবেশ করেন।
তিনি বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আবদুর রাজ্জাক ’৭৫-পরবর্তী সরকারকে সমর্থন না জানিয়ে প্রবাসে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আমরা দুটি বোন তখন অসহায়ের মতো হয়ে পড়ি। এমন একটি জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার মতো পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে ছিল না। ’৮১ সালে লন্ডন ইয়র্ক হলে বিশাল সমাবেশে আমার রাজনীতিতে আগমন ঘটে। আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি প্রকৃতপক্ষে এখান থেকে শুরু করা হয়। অল পার্টি পার্লামেন্টারিয়ান গ্রুপ তৈরি করি। তিনি বলেন, তাই লন্ডন এলে আমার অনেক আপন মনে হয়। এখানকার প্রবাসীরা আমাকে এবং দেশকে অনেক দিয়েছে, শেখ রেহানার এখানে বিয়ে হয়। সংসার চালানোর জন্য তাকে অনেক কষ্ট করে এখানে চাকরি করতে হয়। তিনটি বাচ্চাকে দেখাশোনা, মানুষের মতো মানুষ করা- সবকিছুই এখান থেকে করতে হয়েছে। তাই যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অনেক কষ্টের পর আজ কেষ্ট পেয়েছি। টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমপি নির্বাচিত হওয়ায় আমি গর্বিত, অত্যন্ত আনন্দিত। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তিন কন্যা এমপি নির্বাচিত হওয়ায় আমি অত্যন্ত খুশি, দেশবাসীও সুখী।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের পরিচালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের সদস্য মাইক গ্রেইফ এমপি, জয় স্টিফেন এমপি, পল স্কাল এমপি, টিউলিপ সিদ্দিক এমপি, ওয়েজ টিটি এমপি, প্রধানমন্ত্রীকে মানপত্র পাঠ করে শোনান বিশিষ্ট কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে আরও বলেন, ইন্দিরা-মুজিব স্থলসীমা চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের তৎকালীন কোনো সরকার যেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখেনি তদরূপ বাংলাদেশে ’৭৫-পরবর্তী সরকারগুলো এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলাপের সাহস করেনি। দীর্ঘ ৪৩ বছর ছিটমহলবাসী নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করেছিল। এখন থেকে তাদের উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাবে। সীমান্তে আর যেসব এলাকা নিয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরোধ রয়েছে তাও অচিরে সমাধান হবে।
বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী কেন দলের অফিসে বসে এ ধরনের হিংসাত্মক কর্মসূচি দিয়ে দেশের সম্পদ নষ্ট করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন আমাকে ক্ষমতাচ্যুত না করে তিনি ঘরে ফিরে যাবেন না। ৬৫ জন নেতাকর্মী লোকবল নিয়ে ৯২ দিন তিনি যে অবরোধ দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও করেছেন কেন, কিসের আশায় করেছেন আজও আমি তার ‘মাজেজা’ বুঝতে পারিনি। মানুষ হত্যা, গাড়ি পোড়ানো, রেললাইন উল্টে ফেলা, গাড়িতে পেট্রলবোমা, জ্বালাও-পোড়াও এমন ধ্বংসাত্মক আন্দোলন আমার জীবনে দেখিনি।
তিনি বলেন, তাদের আমলে দেশের উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের উন্নয়ন করেছেন, এতিমের হক মেরে খেয়েছেন, হাওয়া ভবন ছিল দুর্নীতির আখড়া। তারা ক্ষমতায় থাকলে ভারতের তোষামোদি করে, ক্ষমতার বাইরে থাকলে ভারতবিরোধিতা করে। এবার তো দেখলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করে তার দু’হাত ধরে বসে আছেন।
তিনি বিএনপিকে জ্বালাও-পোড়া আন্দোলন থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা এমন ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত ছিল তাদের বিচার আমরা করব।
শেখ হাসিনা তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ৩০ প্রকারের ওষুধ এখন আমরা বিনামূল্যে সরবরাহ করছি। ২৫ হাজার ওয়েব পোর্টাল উন্নয়ন করা হয়েছে। ২০০ প্রকারের সেবা ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। দেশ ধান-চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চার দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু হচ্ছে। এটি হলে পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বৃদ্ধি পাবে। ভারত এবং আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্য যা সেভেন সিস্টার রেল বলে খ্যাত তাদের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হবে, তারা আমাদের চট্টগ্রাম, মংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। নেপাল-ভুটান আমাদের সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারবে।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলের কমন শত্রু হচ্ছে দরিদ্রতা। এটা সবাই মিলে লড়াই করে দূর করতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, দেশে এখন কুঁড়েঘর খুঁজে পাবেন না, গৃহহারা কাউকে পাবেন না, সব জেলার ডিসিদের নির্দেশ দেয়া আছে- এমনটি দেখলে আমরা আর্থিক সহায়তা দিয়ে তাদের গৃহনির্মাণ করে দেব।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি জাতির জনকের কন্যা এর চেয়ে বড় আর কিছু আমার পাওনা নেই।
সভায় টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, আমি ১ হাজার ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছি। ১ হাজার জন বাংলাদেশী আমার নির্বাচনী এলাকায় বসবাস করেন। তাদের সাহায্যে এবং দোয়ায় এমপি হয়েছি। দেশে গেলে প্রথমে সিলেটে যাব। তিনি সব এমপির সিলেট সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশী অধিবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে টিউলিপ বলেন, ‘আমি কখনও এটা স্বপ্নে দেখিনি যে, মঞ্চ এসে আমি আমার খালার কাছ থেকে ফুলের তোড়া নিচ্ছি।’
সভার শুরুতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠন ফুল দিয়ে তাদের নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। শেখ হাসিনা উপস্থিত ব্রিটিশ এমপিদের ফুল এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী উপহার দেন। সভায় বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের বজলুর রশীদ বুলু, অস্ট্রিয়া মানবাধিকার কর্মী ও লেখক এম নজরুল ইসলাম, ইতালি আওয়ামী লীগের হাসান ইকবাল, আমেরিকা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, স্পেন আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান, ফ্রান্সের মুজিবুর রহমান এবং জার্মানি ও সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাসগুপ্ত এবং আইন ও সংসদবিষয়ক কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন।

বাহাদুর বেপারীশেষের পাতা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে, যোগাযোগ জোরদার করে ও ভৌগোলিক গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা আমাদের লক্ষ্য। এ জন্যই বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার মিলে ‘বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর’ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। রোববার সেন্ট্রাল লন্ডনে পার্ক লেইন হোটেলে তার সম্মানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি...