শিরোনাম

বন্যা-ভাঙনে দিশাহারা হাজারো পরিবার

1440875385
দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যা ও ভয়াবহ নদী ভাঙনে হাজার হাজার পরিবারের অসংখ্য মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ব্যাপক ভাঙনে দীর্ঘদিনের স্থায়ী ঠিকানা হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ ও অন্যান্য স্থাপনা।ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তাসহ সবকটি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ভাঙন কবলিত এলাকার সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর এখন একটাই আর্তি “হামাক বাঁচান বাহে। সউগ তো গিলি খাইলে ব্রহ্মপুত্র। এ্যলা হামরা যাই কটাই”।

প্রতিনিয়ত বিভিন্ন নদ-নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, হাট বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। গত ৭ দিনের ব্যবধানে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নয়ারহাট বাজারের শতাধিক দোকান, নয়ারচর ফাজিল মাদ্রাসা, ৫টি মসজিদ, ৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আড়াই শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি। এছাড়া উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নে বিলীন হয়ে গেছে দেড় শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটিসহ শেষ সম্বলটুকুও। গৃহহারা পরিবারগুলো সবকিছু হারিয়ে বাঁধের রাস্তায়, স্কুলগৃহসহ নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

সরেজমিনে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নয়াডারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের করালগ্রাসী ভাঙন। ভাঙনের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘরবাড়ি সরিয়েও শেষ রক্ষা করতে পাচ্ছে না পরিবারগুলো। গত ৭ দিনে নয়াডারা, হাতিয়া বকসীর ৮৪টি পরিবার, পশ্চিম গুজিমারীর ৬৫ পরিবার এবং হাতিয়া গ্রামের ২৭টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। পরিবারগুলোর কোন আশ্রয়স্থল না থাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্কুল ঘরসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এমনি অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে নয়াডারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘরে। সেখানে অনেকটা গাদাগাদি করেই থাকছে পরিবারের সদস্যরা। স্কুল ঘরে আশ্রয় নেয়া নয়াডারা গ্রামের হায়দার আলী (৬০) ও তার স্ত্রী মালেকা বেগম (৪২) ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানালেন, ছেলে-মেয়েসহ ৬ জনের পরিবার তাদের। দুই বিঘা জমি ছিলো তাদের। পুরোটাই চলে গেছে ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে। এখন কোথায় যাবেন, কি খাবেন জানেন না তারা। রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আনু ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, তার ইউনিয়নের তিন ভাগের দুই ভাগ নদীগর্ভে চলে গেছে। বারবার উপজেলা পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি। কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একাধিক আবেদন করেছি। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি যেন ভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হয়।

আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর ছোট যমুনা নদীর বেড়িবাঁধ ও আত্রাই-নওগাঁ সড়ক ভেঙে নদীর পানি বগুড়ার আদমদীঘির রক্তদহ বিল এলাকায় প্রবেশ করায় উপজেলার কদমা, করজবাড়ি দমদমা সান্দিড়াসহ প্রায় ১৫টি মাঠ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে প্রায় ১১ শত হেক্টর জমির আমন ধান গাছ তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানায়, বর্তমানে বন্যার পানি আর বাড়ছে না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গত তিন দিনের বন্যার পানিতে আদমদীঘি সদর, সান্তাহার ইউনিয়ন এলাকার প্রায় ১৫টি মাঠ প্লাবিত হয়েছে। আদমদীঘির কদমা, করজবাড়ি, গনিপুর, রামপুরা, কাশিমিলা, জোড় পুকুরিয়া, মন্ডবপুরা, দমদমা, কাশিমিলা, প্রসাদখালি, সান্দিড়া, ছাতনী, ঢেকড়া, ডাঙ্গাপাড়া, তারাপুর, কাজিপুর মাঠের আমন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁয় বন্যার পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উপজেলার নারকেলবাড়িয়া, চরনাছিরপুর, চরমানাঈড়, আকটেরচর ও ঢেউখালী ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা জুড়ে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি নদী ভাঙন প্রবল আকার ধারণ করেছে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে স্কুল ভবনে ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় আমন ধানসহ প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এলাকায় কোন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি।

আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আত্রাই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল শনিবার উপজেলার সাহাগোলা গ্রাম এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামটি বন্যা কবলিত হওয়ায় প্রায় দুই শতাধিক ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। এসব অসহায় পরিবার সাহাগোলা রেলস্টেশন ও সাহাগোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়াও বন্যা কবলিত হয়েছে সাহাগোলা কচিকাঁচা কিন্ডার গার্টেন এন্ড স্কুল, সাহাগোলা দারুস সুন্নাহ মাদ্রাসা ও এতিমখানা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সাহাগোলা তরুণ সংসদ। সাহাগোলা গ্রামের কিছু মহতী মানুষ ব্যক্তিগত খরচে সাহাগোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১৫০ জন বন্যা কবলিত মানুষকে গত বুধবার থেকে প্রতিদিন রান্না করে একবেলা ভাত খাওয়াচ্ছে।

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, খুলনার কয়রা উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৪/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ ভেঙে হরিহরপুর, পদ্মপুকুর, গাতিরঘেরি, চরামুখা ও পাতাখালি গ্রাম লোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পাউবো সূত্রে জানা গেছে ২৯ আগস্ট বিকাল ৫টার সময় হঠাত্ হরিহরপুর সাইক্লোন শেল্টারের পিছনের বেড়িবাঁধের ১শ ফুট ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পাউবোর সেকশন অফিসার মো. আব্দুল মতিন খবর পেয়ে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। উপজেলা চেয়ারম্যান আখম তমিজ উদ্দিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।