Bidit
দেশে বিদ্যুতের উত্পাদন বাড়ছে-এটা যেমন সুখবর, পাশাপাশি এ খাতে দেশি-বিদেশি বেসরকারি ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে একটি উদ্বেগও বাড়ছে। তা হল-এই অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হবে কি না, বিদেশিদের কারণে খাতটি পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে কি না এবং ভোক্তা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সরকারের ভর্তুকি অসহনীয় হয়ে যাবে কি না। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিষয়গুলো আলোচিত হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুেকন্দ্রের ৫২ শতাংশ সরকারি এবং ৪৮ শতাংশ রয়েছে বেসরকারি খাতে। এক সময় পুরোটাই সরকারি খাতে ছিল। সম্প্রতি ভারতের রিলায়েন্স ও আদানি গ্রুপের সঙ্গে যে বিদ্যুেকন্দ্রগুলো স্থাপনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে সেগুলো যথাযথ বাস্তবায়িত হয়ে উত্পাদনে গেলে তিন বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অর্ধেকের বেশি হয়ে যাবে।

বেসরকারি খাতে উত্পাদন ও আন্তঃদেশ বিদ্যুত্ সঞ্চালন বিশ্বে নতুন কিছু নয়, তবে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের জাতীয় সক্ষমতা ও দুর্নীতির প্রাবল্য নিয়ে একটি সাধারণ দুশ্চিন্তা আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদনে এমনিতেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এর মধ্যে আবার বিদেশ থেকে বিদ্যুত্ আমদানিও হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে আরও বিদ্যুত্ আনার প্রক্রিয়াও চলছে। এসব বিদ্যুতের দাম ও শর্ত ঠিকমতো না করা হলে বিদ্যুত্ সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও পরবর্তী সময়ে ভোগান্তি বাড়বে।

বিদ্যুত্ খাতে পরনির্ভরশীলতার আশঙ্কা করে তারা বলছেন, বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর খাতে পরনির্ভরশীলতা বাড়লে তা ভবিষ্যতের জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর বিদ্যুত্ বিভাগের দাবি, দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে সাময়িক সময়ের জন্য এই পন্থা অবলম্বন করা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নিজস্ব বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে।

বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুেকন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা ১১ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৬ হাজার ২০ মেগাওয়াট সরকারি এবং বেসরকারি খাতে ৫ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র রয়েছে। স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রের মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি ও অন্যান্য কারণে ক্ষমতা কমে তা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬২০ মেগাওয়াটে। এখান থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছে ৭ হাজার ৮১৭ মেগাওয়াট।

পরিসংখ্যান বলছে, বিদ্যুত্ খাতে পরনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রের তুলনায় আনুপাতিক হারে মূল উত্পাদন কমেছে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশে মোট ২১০৫ মেগাওয়াট স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ উত্পাদন হয়েছে ২০৮৭ মেগাওয়াট। অর্থাত্ উত্পাদনের হার ৯৯.১৪ শতাংশ। পরের অর্থবছরে ২১৪৮ মেগাওয়াট থেকে ২১১৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছে। ২০০০-০১ অর্থবছরের স্থাপিত ৩০৩৩ মেগাওয়াট থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছে। এভাবে ২০০৭-০৮ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুতের উত্পাদন ক্ষমতা ৯০ শতাংশের উপরে ছিল। তবে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্র বাড়লেও উত্পাদন ক্ষমতা ৮০ শতাংশে নেমে এসেছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে।

কিন্তু বর্তমানে উত্পাদন ক্ষমতা ৭০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। পুরনো অনেক বিদ্যুেকন্দ্র মেরামত না করা এবং বেসরকারি খাতের বিদ্যুতের কেন্দ্রের উত্পাদন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু হয়। ওই মেয়াদে ১ হাজার ২৯০ মেগাওয়াট বেসরকারি বিদ্যুত্ যোগ হয় জাতীয় গ্রিডে। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিদ্যুতের বিশাল ঘাটতি মেটাতে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদন শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুতের উত্পাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। যেটাকে খাত সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিদ্যুত্ নিয়ে এক ধরনের ভালো মনোভাব তৈরি হয়েছে।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি খাতে ২২ এবং বেসরকারি খাতে ৪৬টি বিদ্যুেকন্দ্র হয়েছে। এর বাইরে ভারত থেকে ৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি শুরু হয়েছে।

গত ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতীয় দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৪ হাজার ৬শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করেছে পিডিবি। এর আগে ২ হাজার ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আরও কয়েকটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী কয়েক বছরে ভারত থেকে অন্তত সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আসবে।

এ ছাড়া আগামী কয়েক বছরে ৭৬টি ছোট-বড় বিদ্যুেকন্দ্র উত্পাদনে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৪১টিই বেসরকারি। ইতোমধ্যে ভাড়াভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।
এভাবে চললে খুব অল্প দিনে বেসরকারি খাতেই বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উত্পাদন খাতে বেসরকারি ও বিদেশি খাতের অংশীদারিত্ব থাকতেই পারে। তবে অবশ্যই এতে সরকারের প্রাধান্য থাকতে হবে।

এদিকে প্রতি বছরই মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান দিচ্ছে পিডিবি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ৬৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। পরের অর্থবছর লোকসান বেড়ে হয় ৬ হাজার ৩৫৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে লোকসান আগের অর্থবছরের চেয়ে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৬ কোটি ১১ লাখ টাকায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছর তা আবারও বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮০৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। আর চলতি অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।
লোকসান ঠেকাতে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন করে পিডিবি। তবে দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমানে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কিনতে ইউনিটপ্রতি গড়ে খরচ হয় ৮-১৫ টাকা। পিডিবি এই বিদ্যুত্ বিক্রি করছে ৪ টাকা ৭০ পয়সা দরে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছে, নির্ধারিত সময় পর ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলে লোকসান কমে যেত। কিন্তু ভাড়াভিত্তিক অনেক কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বহাল থাকায় উত্পাদন বন্ধ থাকলেও পিডিবিকে এজন্য অর্থ দিতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে।

জানতে চাইলে পিডিবি চেয়ারম্যান শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, রেন্টাল, কুইক রেন্টাল (ভাড়াভিত্তিক, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক) বিদ্যুেকন্দ্র চালুর সময় অনেকে নানাভাবে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সরকারের এমন পদক্ষেপের কারণেই দেশে আজ বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধান হয়েছে। চাহিদার সঙ্গে বিদ্যুতের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারি খাতের বেশ কিছু বিদ্যুেকন্দ্র তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। খুব শিগগির বিদ্যুতের উত্পাদন আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে উত্পাদন ব্যয় কমানোরও চেষ্টা চলছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে সাময়িক সময়ের জন্য বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুত্ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। এটা একটা উদ্বেগের বিষয়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। যদিও অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুত্ খাতে নানা পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবসম্মত না হওয়ায় পরিকল্পনা পরিকল্পনার জায়গাতেই রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, একটা বিদ্যুেকন্দ্র কোনো সময়ে কী অবস্থায় চালালে সাশ্রয়ী দামে উত্পাদন করা যায়, তার একটা প্রিন্সিপাল (মূলনীতি) রয়েছে। বেসরকারি খাতের কারণে সেটা প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি খাতকে অনেক বেশি ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তারা অনেক বেশি মুনাফা করছে। সেখানেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে। দেশি-বিদেশি কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য বিদ্যুত্ খাতে পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও এ খাতে লোকসান কমানো যাচ্ছে না। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কাজ করলে এটি অবশ্যই লাভজনক খাত হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, সরকার সাময়িক সময়ের জন্য ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র চালু করে উত্পাদন বাড়িয়েছে। কিন্তু এ খাতের ভিত মজবুত হয়নি। সঠিক পরিকল্পনামাফিক এগুলে এতদিনে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হতো। নতুন করে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানোর দরকার হতো না। বিদ্যুত্ আমদানিরও প্রয়োজন ছিল না।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, বিদ্যুত্ একটি স্পর্শকাতর খাত। প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন হতে পারে। কিন্তু সেটার মূল নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে সরকারের হাতে। তবে বেসরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ মোট বিদ্যুতের ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি হওয়া ঠিক নয়। এর জন্যও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। না হলে দেখা যাবে এ খাতের ব্যবসায়ীরা নানাভাবে জিম্মি করে সরকারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করার চেষ্টা চালাবে।

বেসরকারি খাতের বিদ্যুতের কুফলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের চুক্তি অনুযায়ী এ কেন্দ্রটি যৌথভাবে করার কথা বলা হলেও এখন দেখা যাচ্ছে, পুরো কর্তৃত্ব ভারতের হাতে চলে গেছে। তারা ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে রামপালে উত্পাদিত বিদ্যুতের দরও ভারত নির্ধারণ করবে। এ ছাড়া প্ল্যান্ট বসানো থকে শুরু করে, যন্ত্রপাতি ক্রয়, অপারেশনের পুরো কর্তৃত্ব থাকবে ভারতের হাতে।

শুভ সমরাটশেষের পাতা
দেশে বিদ্যুতের উত্পাদন বাড়ছে-এটা যেমন সুখবর, পাশাপাশি এ খাতে দেশি-বিদেশি বেসরকারি ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে একটি উদ্বেগও বাড়ছে। তা হল-এই অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হবে কি না, বিদেশিদের কারণে খাতটি পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে কি না এবং ভোক্তা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সরকারের ভর্তুকি অসহনীয় হয়ে যাবে কি...