২২২
রোকসান আক্তার। ২০১১ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনা ওলটপালট করে দেয় তার জীবন। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে একা হয়ে যায় সে। ওই বছরই মামা তাকে দিয়ে যায় আজিমপুর স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায়। এখানেই অন্য অনেক অসহায়-নিঃস্ব শিশুর সঙ্গে বড় হচ্ছে সে। পাশের একটি স্কুলে পড়ছে পঞ্চম শ্রেণীতে।
রোকসানার কাছেই শোনা যাক তার জীবনের গল্প- ‘বাবা-মাকে হারানোর পর আমি চারদিকে অন্ধকার দেখছিলাম। বাবা একটি কারখানার অপারেটর ছিল। সম্পত্তি বলতে যা বোঝায় সেরকম কিছুই ছিল না। মামা আমাকে এখানে ভর্তি করানোর পর এখন পর্যন্ত ভালই আছি। সারা দিন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ক্লাসে পড়াশোনা ছাড়াও কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ইত্যাদি বিষয় এখানে পড়ানো হয়। বাবা-মার নামে আমি দুবার কোরআন শরিফ খতম দিয়েছি। একই সঙ্গে কোরআন শরিফের বাংলা তরজমা করে পড়তে পারি।’ তার মামা জালাল উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, ‘আমার ভাগ্নি এখানে ভাল আছে। কোরআন, হাদিস ছাড়াও এতিমখানা আধুনিক পড়াশোনা করার সুযোগ করে দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ আমার ভাগ্নির মাঝেমধ্যে খাবারের সমস্যা হয়। তখন আমি নিজে গিয়ে খাবার দিয়ে আসি। প্রচণ্ড গরমে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় ছেলেমেয়েরা খুব কষ্ট করছে। বিষয়টি এতিমখানা কর্তৃপক্ষকে বলে এসেছি।’
ছয় বছরের শিশু উজ্জ্বল এতিমখানায় এসেছে দুই মাস আগে সাভার থেকে। তার বাবা মারা গেছেন দেড় বছর হলো। উজ্জ্বল প্রথম শ্রেণীতে পড়ছে। আর ময়মনসিংহের নান্দাইল থেকে আসা আলী আজম পড়ছে সপ্তম শ্রেণীতে। এতিমখানার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আলী আজম জানায়, বাবা-মাকে হারানো পর জীবনটা একটা কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে থাকতে কষ্ট হয় কি না জানতে চাইলে আজম জানায়, কষ্টে যাদের জীবন তাদের আবার কষ্ট কিসের? পড়াশোনার শেষ করে কি করবে- জানতে চাইলে সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘কপালে যা লেখা আছে তাই হবে। যা ভাগ্যে আছে তাই করবো। তবে যে পেশায় জনসেবা করা যায় সেটি করার ইচ্ছে আছে।’
আর উজ্জ্বল বলে, ‘আমরা সাত ভাইবোন ছিলাম। বাবা-মা মারা যাওয়ার দুই মাস পর জন্ডিস আত্রুান্ত হয়ে বড় ভাই মারা যায়। পরের ভাই একটি গ্যারেজে কাজ করে। এখন ওই ভাইয়ের টাকায় অন্যান্য ভাইবোন চলছে। এই ভাইয়ের পর আমি। আমিও প্রথম ঢাকায় একটি ছাত্রাবাসে কাজ নিই। ওইখানে ছাত্ররা আমাকে শুধু মারধর করতো। কিছুদিন কাজ করার পর আমার এক আত্মীয় আমাকে আজিমপুর এতিমখানায় ভর্তি করিয়ে দেয়। পরের দুই ভাই ঢাকায় থাকে মেজো ভাইয়ের সঙ্গে। ভাইয়ের সঙ্গে নানি থাকেন। ওদের আমার নানিই দেখাশোনা করেন। দুই বোন থাকে এক মামার বাসায়। মামাও অভাবের কারণে তাদের রাখতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাদের এই এতিমখানায় আনার জন্য আমি যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু আমাকে না করে দিয়েছে। বলেছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্য একসঙ্গে এতিমখানায় রাখার নিয়ম নেই। মামাকে বলে দিয়েছি এলাকার কোন এতিমখানায় তাদের ভর্তি করিয়ে দিতে।’ পড়াশোনা শেষ করে কি করবে, জানতে চাইলে উজ্জ্বল বলে, ‘আমার ছোট ভাইদের মানুষ করাই এখন আমি ও আমার বড় ভাইয়ের মূল কাজ।’
আজিমপুর স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায় গিয়ে দেখা গেলো, পশ্চিম পাশের পুরনো একটি বিল্ডিংয়ের নিচতলা। ছোট্ট একটি রুমে ১১ জন মেয়ে গাদাগাদি করে থাকছে। প্রচণ্ড গরমে এই রুমের দুটি ফ্যান নষ্ট। এক সপ্তাহ ধরে নষ্ট এই ফ্যানগুলোর ঠিক করে দেয়ার কথা কয়েকবার বলা হলেও ঠিক হয়নি। রুমের বাসিন্দা সানজিদা মানবজমিনকে বলেন, ‘স্যার (এখানের দায়িত্বরত তত্ত্বাবধায়ক) এসে দেখে গেছেন। তিনি বলেছেন, দ্রুত এটি ঠিক করে দেবেন।’
এতিমখানার হিসাব সহকারী মো. সালেহ ইসলাম বলেন, ‘দিন দিন এখানে এতিম ছেলেমেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অনুদান বাড়ছে না।’ পশ্চিম পাশের নিচতলার ফ্যান নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত আছেন জানিয়ে বলেন, ‘এক সমাজহিতৈষী এসেছিলেন এই বিষয়টি তাকে দেখিয়েছি। তিনি দুটি ফ্যান কিনে দেবেন বলে জানিয়ে গেছেন। তার আশায় আমরা বসে আছি।’
পৌনে চারশ’ এতিমের পড়াশোনা: স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার বর্তমানে পৌনে চারশ’র মতো এতিম ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে ১১০ জন মেয়ে। এরা এতিমখানার ফরিদউদ্দিন সিদ্দিকী উচ্চ বিদ্যালয়, স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল ও গোর-ই-শহীদ মাদরাসায় পড়ে। এখানে ৬১ জন শিক্ষক আছেন। এ পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার এতিম ছেলেমেয়ে পড়াশোনা শেষ করে সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে পুনর্বাসিত হয়েছে বলে জানান এতিমখানার হোস্টেল সুপার সাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে গড়ে ৭-৮ জন এতিম ছেলেমেয়ে এখানে আসে ভর্তি হতে। সবাইকে আমরা নিতে পারি না।’
আর্থিক অনটন: নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এতিমখানায় আর্থিক অনটন প্রায়ই লেগে থাকে। অন্যদিকে দিনদিন বেড়েই চলছে এতিমদের সংখ্যা। এতিমখানার তত্ত্বাবধায়করা বলছেন, এটি সমাজ সেবামূলক কাজ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে এতিমখানায় বাজেট নেই বললেই চলে। মাঝেমধ্যে কিছু খাদ্যদ্রব্য আসে। বিশেষ করে রমজান মাসে। এছাড়া সারা বছর সমাজে অচেনা কিছু বিত্তবানদের সহায়তায় চলতে হয়। যে সহায়তা পাওয়া যায় তাতে পৌনে চারশ’ ছেলেমেয়ের খাবার, পড়াশোনাসহ অন্যান্য খরচ জোগানো খুব দুরূহ হয়ে পড়ে। এতিমখানার লোকজন বলছে, সমাজের অসহায়, বিপন্ন, এতিম ছেলেমেয়েদের যাবতীয় ভরণপোষণ করে পড়াশোনা শিখিয়ে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা। সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের সহানুভূতিনির্ভর এ প্রতিষ্ঠানর দিকে সরকারের নজর দেয়া উচিত। তাই পবিত্র এই রমজান মাসসহ বিভিন্ন সময়ে জাকাত, ফিতরা, সদকা, কাফফারা ও দান-অনুদানের টাকা দিয়ে সহযোগিতার দিয়ে তাদের ভরণপোষণ করানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
প্রতারক চক্র: এতিমখানাকে ঘিরে একটি প্রতারক চত্রু সত্রিুয় হয়েছে বলে জানান স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার হোস্টেল সুপার সাদাত হোসেন। তিনি জানান, গত বছর নভেম্বর মাসে আগে এই এতিমখানায় ভর্তি করাতে এসে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েন এক দরিদ্র বাবা। হারিয়েছিলেন তার চার বছরের মা হারা শিশুসন্তান ফাতেমাকে। অভিনব পন্থায় চুরি যাওয়ার ৩২ দিন পর উদ্ধার হলেও এখানে এতিম শিশু ও তার অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি আরও জানান, প্রতারকচত্রের মূল হোতা অবশ্য ধরা পড়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের প্রতারণা আর চুরির ঘটনার অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে এতিমখানার ভেতরেই। অর্থের অভাবে শিশু ফাতেমাকে তার বাবা গত ২রা নভেম্বর রাখতে গিয়েছিলেন আজিমপুর মুসলিম এতিমখানায়। সেখানে গিয়েই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে হারিয়ে ফেলেন মেয়েকে। কোর্টের মাধ্যমে দত্তক নেয়ার কথা বলে এতিমখানা থেকে বেরিয়ে পাশের এক মসজিদকে সাক্ষী মেনে ফাতেমাকে নিয়ে উধাও হয় প্রতারক সুলতানা আক্তার। এরপর থেকে প্রতিদিনই মেয়ের সন্ধানে এতিমখানায় এসে কেঁদেছেন ফাতেমার বাবা। কিন্তু এতিমখানার লোকজন সুলতানার কোন সন্ধান দেয়নি। তিনি অভিযোগ করেন থানাতেও। শেষ পর্যন্ত মামলার ২ দিন পর এতিমখানার ওই কর্মচারীদের তথ্য মতেই বারিধারার একটি বাসা থেকে সুলতানাকে গ্রেপ্তার করে ফাতেমাকে উদ্ধার করে পুলিশ। এতিমখানার আশপাশের মানুষের ভাষ্য, এর পেছনে এতিমখানার একটি অসাধু চক্র জড়িত। এ বিষয়ে হোস্টেল সুপার বলেন, এরপর থেকেই ছেলে-মেয়েদের প্রতি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভেতরে স্টাফদের প্রতি আলাদা নজর রাখা হচ্ছে। প্রত্যেক ছেলেমেয়েকে বলে দেয়া হয়েছে, বাইরে কোন লোকজনের সঙ্গে কোন অবস্থায় যেন বের না হয়।

অর্ণব ভট্টএক্সক্লুসিভ
রোকসান আক্তার। ২০১১ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনা ওলটপালট করে দেয় তার জীবন। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে একা হয়ে যায় সে। ওই বছরই মামা তাকে দিয়ে যায় আজিমপুর স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায়। এখানেই অন্য অনেক অসহায়-নিঃস্ব শিশুর সঙ্গে বড় হচ্ছে সে। পাশের একটি স্কুলে পড়ছে পঞ্চম শ্রেণীতে। রোকসানার কাছেই...