12

বিশ্বব্যাপী ১৬ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৫ বছরের নিচে এ শিশুরা শিশুশ্রমের ফাঁদে আটকে রয়েছে। এর কারণ হিসাবে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যেখানে বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম সাড়ে ৭ কোটি তরুণ বেকার, সেখানে সাড়ে ১৬ কোটি শিশু রয়েছে শ্রমিক হিসাবে। শুধু তাই নয়, শিশু শ্রমিকদের একটি বড় অংশ রয়েছে যারা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে না, কর্মক্ষেত্রে অনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষাসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আইএলও এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি আরো উল্লেখ করেছে, শিশু শ্রমিক এবং উপযুক্ত কর্মে নিয়োজিত না হওয়া শ্রমিকদের এ চিত্রের মাধ্যমে টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০০২ সালে সর্বশেষ শিশুশ্রমের ওপর জরিপ পরিচালনা করে। ২০০৩ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। সে সময়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ৩২ লাখ। এই পরিসংখ্যানের আওতায় গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা অন্তর্ভুক্ত নয়। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১৩ লাখ। শ্রমে নিয়োজিত শিশুর মধ্যে শতকরা ৭৭ ভাগ ছেলে এবং ২৩ ভাগ মেয়ে শিশু। তবে এ তথ্যের সমালোচনাও রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাব মতে দেশে ৭০ লাখেরও বেশি শিশু শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে।

আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর শ্রমিকদের মধ্যে ১৬ দশমিক ৭ ভাগ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। কম্বোডিয়ায় এ হার ৩০ শতাংশ, নিকারাগুয়াতে ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে প্রায় ৩০ শতাংশ, নেপালে ১৯.৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৭.৭ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত (৩.৮%), ভুটান (১.৫%) ও পকিস্তান (১৩.৫%)।

২০১০ সালের এই দিবসে এক ঘোষণায় ২০১৬ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে সকল প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করার অঙ্গীকার করা হয়। এর জন্য নেয়া হয় অ্যাকশন প্লানও। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমিকদের এ চিত্রই বলে দেয় এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের কারণে পাচার, সন্ত্রাস ও নির্যাতনে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে।

আইএলও বলছে, শিশুরা বয়সে ছোট হলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুরা শারীরিক-মানসিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোতে তারা খুব দ্রুত বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তারা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে আইএলও উল্লেখ করেছে, শিশু হওয়ার কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুরা দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়কে আরো বেগবান করার তাগিদ দিয়েছে আইএলও। সেই সাথে শিশুশ্রমের সাথে জড়িত মানবাধিকার, আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির বিষয়গুলো উন্নয়ন করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের সাথে জড়িত বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন করা প্রয়োজন।

চাঁদপুরের কচুয়ার ফরহাদ সিকদার ছয় বছর ধরে কাজ করে বুয়েট ক্যাফেটেরিয়াতে। এখন ওর বয়স ১৫ বছর। ফরহাদ জানায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার পড়া বন্ধ করে এখানে এসে কাজ নিতে হয়েছে।

মোহাম্মদ শাওন কাজ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিনে। শাওনের বয়স তের বছর বললেও তাকে আরও ছোট মনে হয়। অভাবের জন্যই দুই বছর আগে গুলিস্তানের এক হোটেলে কাজ নেয় সে। সেখান থেকে ২ মাস আগে এখানে আসে। শাওন জানায়, ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছিল তার। শাওনকে প্রশ্ন করি হবু ডাক্তারদের খাওয়ানোর সময় তারও কি কখনো মনে হয় যে সেও যদি ডাক্তার হতে পারতো! চোখের হাসি আর মনের আবেগ মিশিয়ে তার উত্তর:‘অনেক সময় মনে মনে কই যদি পড়ালেখা করতাম তাইলে আমরাও এমন হইতে পারতাম।’

শুধু বুয়েট কিংবা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ বিদ্যাপিঠের ক্যাফেটেরিয়াতেও কাজ করে ১১ থেকে ১৬ বছরের শিশুরা। তারা সবাই দারিদ্র্যের কারণেই স্কুল ছেড়ে জড়িয়ে পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁর কাজের মতো নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস।

এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য: ‘শিশু শ্রমকে না বলুন, মানসম্মত শিক্ষাকে হ্যাঁ বলুন।’ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষাকল্পে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে একজোটে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতেই এই দিবসটি পালিত হয়।

দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ ও সবার জন্য শিক্ষা সরকারের অঙ্গীকার হলেও দরিদ্র পরিবারের হাজারো শিশু আজ হোটেলে-রেস্তোরাঁয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ভোর রাতে উঠে মধ্য রাত অবধি তাদের কাজ করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা যা বলেন: মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গোলাম কিবরিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, এসব শিশুকে পুনর্বাসনের জন্য স্কুল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে লালবাগ এলাকায়ও একটি স্কুল রয়েছে। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল-ইসলাম বলেন, ১৪ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ২ হাজার টাকা করে বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব (উন্নয়ন) মো. মহিবুর রহমান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং ঋণের ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে এটি বন্ধ রয়েছে। তবে জুলাই থেকে প্রকল্পটি ফের চালুর চিন্তা রয়েছে। গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শুধু প্রকল্প থাকলে হবে না। যাদের প্রকল্প প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছতে হবে।

শুভ সমরাটআন্তর্জাতিক
বিশ্বব্যাপী ১৬ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৫ বছরের নিচে এ শিশুরা শিশুশ্রমের ফাঁদে আটকে রয়েছে। এর কারণ হিসাবে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যেখানে বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম সাড়ে ৭ কোটি তরুণ বেকার, সেখানে সাড়ে ১৬ কোটি...