333
রংপুরের কাউনিয়ার ৮ অদম্য মেধাবী দরিদ্রতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ ৫ পেয়ে গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দরিদ্রতা ওদের দমাতে পারেনি। ওরা কেউ কৃষক, দিনমজুর, দর্জির সন্তান। অভাব ওদের নিত্যসঙ্গী। কখনও দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটেনি তাদের ভাগ্যে। চাহিদা মতো জোগাড় হয়নি পোশাক। তবুও দমে যায়নি ওরা। হার মানেনি দরিদ্রতার কাছে। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে হাসি ফুটিয়েছে দুঃখী মা-বাবার মুখে। শিক্ষাজীবনের প্রথম এ সাফল্যে তাদের দু’চোখে এখন এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। এরপরও অর্থাভাবে ভালো কলেজে ভর্তি ও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়েছে ওরা। এ অবস্থায় সমাজের বিত্তবানরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেই ওদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে।
মাসুমা আক্তার মিথু : কাউনিয়া উপজেলার বাংলা বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে মাসুমা আক্তার মিথু। কাউনিয়া উপজেলার ঠাকুর দাশ গ্রামের কৃষক মশিয়ার রহমানের কনিষ্ট মেয়ে সে। চরম অর্থ সংকটের মাঝেও মিথু এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছে মিথু। সে তার পড়াশুনার খরচ চালিয়েছে প্রাইভেট পড়িয়ে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে মিথু। মা জোসনা বেগম মেয়ের সাফল্যে খুশি হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
আরাফাত হোসেন : আরাফাত হোসেন এবার এসএসসি পরীক্ষায় ইমামগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে রংপুরের শ্রমিক অধ্যুষিত হারাগাছ এলাকার নাজিরদহ গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেনের ছেলে। কৃষি কাজ করে ১ ছেলে ও ১ মেয়ের পড়াশোনা করাচ্ছেন। সব প্রতিবন্ধকতাকে পদদলিত করে ভালো কলেজে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আরাফত। সংসারে একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ৫ জনের সংসার।
রাশেদুল ইসলাম : রংপুরের কাউনিয়ার উত্তর ঠাকুরদাস গ্রামের আ. মতিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম। সে বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। মা রোকসানা বেগম গৃহিণী ও ফেরিওয়ালা ২ ছেলে এবং ১ মেয়ের অতিকষ্টে লালন-পালন করছেন। তার ওপর অদম্য মেধাবী রাশেদুলের লেখাপড়া খরচ জোগাড় করতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। রাশেদুল জানান, একখণ্ড বসতভিটা ছাড়া আর কোনো জমি নেই। দরিদ্রতা আমাদের নিত্যসঙ্গী। বাবা ফেরির কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো মতে অর্ধাহারে-অনাহারে ৫ জনের সংসার চলে। ছেলের সাফল্যের কথা স্মরণ হলে মেহের নেছার চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরে।
খায়রুন নাহার রেশমী : দরিদ্রতা ও অর্থ সংকট দমিয়ে রাখতে পারেনি কাউনিয়া উপজেলার দরিদ্র কর্মচারীর সন্তান খায়রুন নাহার রেশমীকে। চরম অর্থ সংকটের মাঝেও রেশমী এবার এসএসসি পরীক্ষায় ইমামগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ দিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছে রেশমী। উপজেলার নাজির দহ (উদাসি) গ্রামের বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারী খয়বর হোসেনের মেয়ে রেশমী। সব প্রতিবন্ধকতাকে পদদলিত করে ভালো কলেজে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রেশমী।
রীতা রানী : রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তালুক শাহবাজ গ্রামের বিমল চক্রবর্তীর অদম্য মেধাবী মেয়ে রীতারানী। দরিদ্র পরিবারে অভাব-অনটনের মধ্যেও দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে সে গাজিরহাট দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। রীতা জানায়, ২ বোন মা-বাবাকে নিয়ে তাদের সংসার। বাবা বেকার, মায়ের উপার্জন দিয়ে কোনো মতে চলে তাদের সংসার। নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা সংসারে প্রাইভেট পড়ার মতো কোনো উপায় ছিল না।
চঞ্চলচন্দ্র বর্মণ : কাউনিয়া উপজেলার গাজীরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে চঞ্চলচন্দ্র বর্মণ। হরিশ্বর গ্রামের ফেরিওয়ালা হেমন্ত কুমার রায়ের ছেলে সে। চঞ্চল জানায়, বাবার কোনো জমি নেই। অন্যের জায়গায় বাড়ি করে আছে। ফেরিওয়ালার কাজ এবং মা কবিতা রানী দর্জির দোকানে সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো মতে চলে সংসার। চরম অর্থ সংকটের মাঝেও চঞ্চল এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসি পাস করলেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ নিয়ে এখন দুশ্চিন্তার শেষ নেই চঞ্চলের।
শুকলা রানী : কাউনিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এটা তার কঠোর পরিশ্রমের ফল। পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের দর্জি শ্রমিক শুভাষচন্দ্র রায়ের মেয়ে। মা সিন্দু রানী রায় জানান, মেয়ে প্রতিদিন ৩-৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যায়। শুকলা জানায়, বসতভিটা ছাড়া অর্থ সম্বল বলতে কিছুই নেই তাদের। বাবা দর্জি শ্রমিক, মা পাপোশ তৈরির কাজ করে কোনো মতে তাদের ৪ জনের সংসার চালান। সে জানায়, পিতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তার পড়াশুনার কোনো খরচ দিতে পারবেন না।
জাহিদুল ইসলাম : কাউনিয়া উপজেলার নিজপাড়া গ্রামের খলিলুর রহমানের পুত্র জহিদুল ইসলাম প্রমাণ করেছে ইচ্ছা আর অধ্যবসায় থাকলে সাফল্যের শীর্ষে ওঠা যায়। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মোফাজ্জল হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে। নিজস্ব বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নেই তাদের। জাহিদুল জানায়, বাবা দিনমজুর আর মা বাড়ি বাড়ি ডিম-কুড়া বিক্রয় করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনো মতো চলে তাদের সংসার । অভাবেব সংসারে অর্থ জোগান ও পড়াশুনার খরচ জোগাতে সে মাঝে মাঝে দিনমজুরের কাজ ও প্রাইভেট পড়াত।

তুনতুন হাসানস্বদেশের খবর
রংপুরের কাউনিয়ার ৮ অদম্য মেধাবী দরিদ্রতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে বিজ্ঞান শাখায় জিপিএ ৫ পেয়ে গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। দরিদ্রতা ওদের দমাতে পারেনি। ওরা কেউ কৃষক, দিনমজুর, দর্জির সন্তান। অভাব ওদের নিত্যসঙ্গী। কখনও দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটেনি তাদের ভাগ্যে। চাহিদা মতো জোগাড় হয়নি পোশাক। তবুও দমে...