111
ভুয়া সরকারি কর্মকর্তা সাজিয়ে গত দেড় বছরে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে বেসরকারি পাসপোর্টকে সরকারি (অফিসিয়াল) পাসপোর্টে রূপান্তর করা হয়। প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য ৩ লাখ টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে পাসপোর্ট অধিদফতরের একটি চক্র। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অধিদফতরের সাবেক ও বর্তমান ডিজি এবং বিভাগীয় পাসপোর্ট পরিচালক মুন্সি মুয়ীদ ইকরামসহ আটজন জড়িত রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করারও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২৭টি দেশের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক রয়েছে। ফলে এই ২৭টি দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিনা ভিসায় এসব দেশে যাতায়াত করতে পারেন। এই সমঝোতা স্মারকের অপব্যবহার করে তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপসহ কয়েকটি দেশে অফিসিয়াল পাসপোর্টের মাধ্যমে কয়েক হাজার ব্যক্তিকে পাচার করা হয়। এসব সাজানো কর্মকর্তার বেশির ভাগই প্রথমে তুরস্ক গেছেন। তুরস্ক থেকে ইউরোপের ভিসা নিয়ে তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন অবস্থান করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে এ ধরনের ঘটতে থাকলে তুরস্ক সরকার এ সংক্রান্ত বিষয়টি তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানায়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জড়িত আটজনের মধ্যে ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট পরিচালক মুন্সি মুয়ীদ ইকরাম, সহকারী পরিচালক এসএম শাহজামান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম-১ ও মো. শাহজাহান মিয়াকে ইতিমধ্যেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা সাজিয়ে মানব পাচারের ঘটনা তদন্ত করতে ১৭ মে পরিচালক সেলিনা বানুকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ জুন এই কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার এক সপ্তাহ আগে রহস্যজনক কারণে সরিয়ে দেয়া হয় সেলিনা বানুকে। যুগ্ম সচিব ও পাসপোর্ট অধিদফতরের প্রকল্প (ভবন নির্মাণ) পরিচালক আতিকুল হকের নেতৃত্বে গঠন করা হয় তিন সদস্যের নতুন কমিটি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অফিসিয়াল পাসপোর্ট জালিয়াতির ঘটনার রহস্য উদঘাটনে চার দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলো হচ্ছে- ১. একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করা এবং সব পাসপোর্ট প্রদানকারী অফিসকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা। ২. তদন্তের স্বার্থে তদন্তকালীন পাসপোর্ট অধিদফতরের বর্তমান ডিজি (অতিরিক্ত সচিব) এনএম জিয়াউল আলম, পরিচালক মুন্সি মুয়ীদ ইকরাম ও নজরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক এসএম শাহজামান ও উম্মে কুলসুমকে সাময়িক বরখাস্ত করা। পাশাপাশি সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজি মো. আবদুল মাবুদকেও তদন্তের আওতায় আনতে বলা হয়।
এছাড়া সুপারিশের ৩ নম্বরে বলা হয়, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে যেসব ব্যক্তি সরকারি পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা লাগে না এমন দেশ ভ্রমণ করেছেন, তাদের মধ্যে যারা অদ্যাবধি দেশে ফেরেনি তাদের শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত করা। এবং ৪. বাংলাদেশের সব ইমিগ্রেশন পয়েন্ট (জল, স্থল ও আকাশ পথ) সতর্ক করে সরকারি ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণ করার বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা।
বর্তমান ডিজি এনএম জিয়াউল আলম অফিসিয়াল পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রকে সহযোগিতা করছেন উল্লেখ করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ এপ্রিল তুরস্ক থেকে এ বিষয়ে পত্র পাওয়ার পরও বর্তমান ডিজি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে গোপন রাখেন। পরে ১৩ মে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন। জিয়াউল আলমের বিষয়ে আরও বলা হয়, পাসপোর্ট অধিদফতরের আগারগাঁও কার্যালয়ে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা সরাসরি বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যাদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা করছেন বর্তমান ডিজি।
নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে পাসপোর্ট অধিদফতরের ডিজি এনএম জিয়াউল আলম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব কাজে জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অফিসিয়াল পাসপোর্টের মাধ্যমে তুরস্কে যাওয়া ব্যক্তিদের পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট এমআরপি প্রকল্পের আর্কাইভে সংরক্ষিত সব নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিষয়টি একটি সুসংগঠিত চক্র দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। উল্লিখিত পাসপোর্টগুলো বেসরকারি থেকে সরকারি পাসপোর্টে রূপান্তর করতে অত্যন্ত সুচারু ও দক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে নকল জন্মনিবন্ধন সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে। নকল সিল, স্বাক্ষর ও অফিসিয়াল পরিচয় ব্যবহার করে এনওসি প্রস্তুত করা হয়। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীর অনুকূলে নকল ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটির সনদ’ উপস্থাপন করা হয়।
পাসপোর্ট রূপান্তরের বিষয়টি পাসপোর্ট অধিদফতরের নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার আওতাভুক্ত। যাদের সার্বিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোনো এমআরপি বেসরকারি পাসপোর্ট সরকারি পাসপোর্টে রূপান্তর করা নয় বলেও প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক এসএম শাহজামান যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টির সঙ্গে আমি মোটেও জড়িত নই। ঘটনার পর অফিসের অনেককে ঢালাওভাবে দায়ী করা হচ্ছে।’ এ সময় তিনি প্রতিবেদককে অফিসে গিয়ে কথা বলার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
আরেক সহকারী পরিচালক উম্মে কুলসুম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি ভাই এসবের সঙ্গে নেই। আমাকে ইতিমধ্যে হেড অফিসে বদলি করা হয়েছে। কোনো কথা থাকলে আমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বলেন।’
সাবেক ডিজি আবদুল মাবুদ ও সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে প্রতিবেদকের পরিচয় জানিয়ে এসএমএস করলেও তারা সাড়া দেননি। অন্যদিকে মুন্সি মুয়ীদ ইকরামের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

তুনতুন হাসানপ্রথম পাতা
ভুয়া সরকারি কর্মকর্তা সাজিয়ে গত দেড় বছরে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে বেসরকারি পাসপোর্টকে সরকারি (অফিসিয়াল) পাসপোর্টে রূপান্তর করা হয়। প্রতিটি পাসপোর্টের জন্য ৩ লাখ টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে পাসপোর্ট অধিদফতরের একটি চক্র। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অধিদফতরের...