সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন
Uncategorized

রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : বুধবার, ১০ জুন, ২০১৫
  • ৮ দেখা হয়েছে

দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কতো তা যেমন কেউ বলতে পারে না, তেমনি ক্ষুর্ধাত মানুষের সঠিক সংখ্যাও কারো জানা নেই। ১/১১- এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হিডেন হাঙ্গার কথাটি বেশ প্রচলিত ছিল। সে সময় ক্ষুর্ধাত মানুষ সনাক্ত বা তাদের কষ্ট ঘোচানোর কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। রাজনৈতিক দলীয় সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দ্রব্যমূল্যের খড়গ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান না করাসহ বিবিধ কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন কেবলই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না।

দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের পরিসংখ্যান দিন দিন বেড়েই চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের ক্ষুর্ধাত মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার ব্যাপারে নর্িিলপ্ত ভূমিকা পালন করা হলেও জাতিসংঘ বলেছে, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ প্রতিদিন পেট পুরে খেতেই পায় না দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাগলা ঘোড়ার কারণে। বিপুল এই জনগোষ্ঠী ক্ষুধা নিয়ের্ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। এদিকে সরকারের কোনো নজর নেই। ক্ষমতার মোহে গদি আঁকড়ে থাকার দিকেই মনোযোগ বেশি। শুধু সরকার নয়, গরিবদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। বিরোধীদলও এব্যাপারে কখনো কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেনি।

অথচ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাফিক সিগনালগুলোতে, বাসর্ টার্মিনালে, রেল স্টেশনে, ফেরি ঘাটে ও নৌ টার্মিনালগুলোতে ক্ষুধার্ত মানুষদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের খাবারের জন্যে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখা যায়। ভিক্ষুক ও অন্যান্য সাহায্য প্রার্থী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সামর্থ্যবানরা ভিক্ষা কিংবা সাহায্য প্রদানে এখন আর আগের মতো আগ্রহী নয়, বরং তারা এদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। আয় ও সম্পদ বৈষম্য বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

এমনকি উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের অনেকেই তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়ে কোনো রকমে দিন যাপন করছেন। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ ও বিপন্ন দশায় পতিত হওয়ার বিষয়টি ওঠে এসেছে।

প্রত্যেক মুসলমানের জন্যেই রমজান একটি মহান পুণ্যের মাস। কারণ এই রমজানের মাসেই পবিত্র কোরআন শরীফ নাজিল হয়েছিল। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিকট রমজানের গুরুত্ব অনেক। ২ জুন দিবাগত রাতে পবিত্র শবে বরাত পালিত হয়েছে। সেই হিসেবে ১৭ জুন থেকেই রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের দাম কমিয়ে কম মুনাফা কামিয়ে বেশি সোয়াব অর্জন করেন। কিন্তু বাংলাদেশেই এর উল্টোটা ঘটে। একমাত্র আমাদের বাংলাদেশেই বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় উৎসবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লাভ করেন দেশের ব্যবসায়ীরা।

রমজান শুরু হতে এখনো বেশ কিছু দিন বাকি। বাজারেও কোনো জিনিসের কমতি নেই। পাইকারের গুদাম ও কৃষকের ঘরেও মজুদ আছে প্রচুর। কিছু দিন পূর্বে রাজনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ হলেও বর্তমানে রাজনৈতিক অবস্থা একেবারেই শান্ত যাকে স্থিতিশীল বলা হয়। তারপরও প্রতিদিনই হু হু করে বাড়ছে তেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ছোলা ও চিনিসহ ইফতারিতে ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। সরকার নর্‌র্বিকার। এব্যাপারে কোনো কথাই বলছেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সরকারের কোনো তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বরাবরের মতোই কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে রমজানের বাজার আরো অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা দিয়েছিলেন রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী বাজার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারেনি। সরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য মতে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজ, ডাল, আদা, ছোলা, রসুন ও চিনির দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে আদার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। তার সাথে পাল্লা দিয়ে ধনিয়া পাতার দামও বেড়ে গেছে অনেক।

রমজান আসার আগ থেকেই এ দেশের ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য মজুদ করতে থাকেন। যা ইসলাম ধর্মে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরাও ধর্মের দোহাই শোনতে নারাজ। মজুদকৃত পণ্যদ্রব্য রমজানে বেশি দামে বিক্রি করে ক্রেতাদের ভোগান্তিতে ফেলেন। রমজান এলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, এই বদনাম ঘুচাতে এবার আগেভাগেই বেশ কিছু পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে পাইকার সিন্ডিকেটরা। রমজান শুরু হওয়ার আগে আরো দফা দাম বাড়তে পারে বলে ভুক্তভোগী জনগণের ধারণা। আর তাই কিছু অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও ছোটখাটো মজুদ গড়ে তুলছে। বেসামাল বাজারে ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। ফলে এর সাথে তাল মিলাতে গিয়ে গোটা পরিস্থিতিই বেতাল হয়ে পড়ছে।

রমজানের আগেই ধীরলয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুদ শুরু করায় বাজারে পণ্যের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগে ভোগ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। রমজানের আগেই পাইকারি বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তা পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। অস্থির বাজার, ভোক্তারা বেসামাল, অতিষ্ঠ জনসাধারণ। তবু নির্বিকার সরকার। ভাবতে অবাক লাগে আমরা এমন দেশেই বাস করছি। দুর্ভাগ্য আমাদের জন্ম এ দেশে।

বাণিজ্য মন্ত্রী বলেছিলেন, এবার রোজায় পণ্যের দাম বাড়বে না। নিত্যপণ্যেরও পর্যাপ্ত মজুদ নাকি রয়েছে দেশে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন রকমের। মন্ত্রী ঘোষণা দেয়ার তিন দিন পর থেকেই বাজারে পণ্যের মূল্য হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে কোনো পণ্যের চাহিদা কি পরিমাণ রয়েছে, সেই হিসাব নেই সরকারের কাছে। নেই আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থার হালনাগাদ তথ্যও। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয় রেখে সারা বছর বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও সরকারের নেই। জরাগ্রস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নখদন্তহীন।

প্রতিবছর রমজানের আগে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যে ক্ষণস্থায়ী উদ্যোগ নিয়ে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না উল্লেখ করে বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, দেশে পণ্যের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য সরকারের কাছে থাকতে হবে। আগাম ব্যবস্থা নিয়ে চাহিদা ও যোগানের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পর তৎপরতা চালালে হবে না। তাই বছরজুড়েই পণ্যমূল্যের ওপর নজরদারি রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের আগাম তথ্য থাকতে হবে। সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দক্ষ মার্কেট ইন্টেলিজেন্স থাকতে হবে। সিস্টেমেটিক উপায়ে বাজারের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

অপরদিকে বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চমূল্যের সাথে চলতে গিয়ে রীতিমতো হাঁপিয়ে ওঠছে। তারা এর প্রতিকার চেয়ে বিভিন্নভাবে সরকারের দৃষ্টি আর্কষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সরকার জনগণের দাবি পূরণে বারবার কেবলই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সম্প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল দুইজন মন্ত্রী দেশবাসীর কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিয়েছেন তাদের বক্তব্যে। অর্থমন্ত্রী আবুর মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, একদিন বাজারে না গেলে কি হয়? সাবেক আরেক মন্ত্রী বলেছেন, আপনারা কম খান। যে জিনিসের দাম বেড়ে যায় তা না খেলেই হয়। ধন্যবাদ মন্ত্রী মহোদয়কে, সমস্যার সমাধান না করে উল্টো ব্যবসায়ীদের এই বক্তব্যের মাধ্যমে আরো উসকে দেয়ার জন্যে। এই না হলে বাংলাদেশের মন্ত্রী।

মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমাদের অনুরোধ জনগণের জন্যে কিছু করেন। সাধারণ, অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষের সাথে আর ঠাট্টা মশকরা করবেন না। আজেবাজে কথা নয়, কাজের মাধ্যমে দক্ষতা দেখান। দ্রব্যমূল্যের নির্মম কষাঘাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে ক্ষমতার মসনদ থেকে জনগণ আপনাদের টেনে হিঁচড়ে নামাবে। তখন কেউ আপনাদের পতন ঠেকাতে পারবে না।

২০১১ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশের ৫ ধারা অনুযায়ী, উৎপাদক, পরিবেশক বা আমদানিকারক অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য যৌক্তিকভাবে হরাস, বৃদ্ধি বা পুনর্ঃিনর্ধারণ করতে ইচ্ছুক হলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে উক্ত হরাস, বৃদ্ধি বা পুর্নর্নিধারণ করবেন। পুনর্ঃিনর্ধারিত মূল্য কার্যকর হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে তা মনিটরিং সেল, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কিন্তু সরকার ব্যবসায়ীদের বাগে রাখতে না পারায় এ বিধান অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী

© All rights reserved by Crimereporter24.com
themesba-lates1749691102