1
অধ্যাপক ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার ।
আমাদের দেশে অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ হলো কর্ণিয়াল আলসার বা কর্ণিয়াতে ঘা। সঠিক সময়ে চিকিত্সা হলে কর্ণিয়ার অধিকাংশ ঘা সেরে যায়। অবশ্য ঘা সেরে গেলেও কর্ণিয়াতে স্থায়ীভাবে দাগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সঠিক চিকিত্সা না হলে অন্ধত্ব অনিবার্য পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়।

কর্ণিয়াতে ঘা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবেও কর্ণিয়াতে ঘা হতে পারে। চোখে আঘাত পেলে অথবা নেত্রনালীতে রোগ থাকলে সহজেই কর্ণিয়াতে আলসার হয়। আমাদের দেশে ক্ষেতে খামারে কাজ করার সময় চোখে আঘাত বা চোখে পাতার রস ব্যবহার কর্ণিয়াতে ছত্রাক জাতীয় ঘায়ের অন্যতম কারণ।

কোন রোগীর প্রতিরোধের ক্ষমতা এবং রোগ জীবাণুর ক্ষমতার উপর নির্ভর করে কর্ণিয়ার ক্ষতের হেরফের। জীবাণু কর্ণিয়ার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে, কর্ণিয়ার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে কিংবা সমগ্র কর্ণিয়াতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গণোরিয়া জীবাণু ও ডিপথেয়াি জীবাণু ব্যতীত অন্য কোন জীবাণু স্বাভাবিক কর্ণিয়া ভেদ করতে পারে না। আঘাতজনিত কারণে বা কর্ণিয়ার কোন রোগের কারণে কোন ক্ষত হলে সেই ক্ষত জীবাণু দ্ব্বারা আক্রান্ত হয়।

লক্ষণ সমূহ

১. চোখ দিয়ে পানি পড়া

২. আলোতে অস্বস্তি হওয়া

৩. চোখ ও মাথা ব্যথা

৪. চোখ লাল হয়ে যাওয়া

৫. চোখে ময়লা পুঁজ জমা হওয়া

৬. কর্ণিয়াতে সাদা ক্ষত হওয়া

৭. অ্যান্টিরিয়র চেম্বারে পুঁজ (হাইপোপিয়ন) জমা হওয়া

৮. দৃষ্টির স্বল্পতা দেখা দেওয়া

চিকিত্সা

সংক্রামক জীবাণু নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিত্সা করতে হবে। তবে জীবাণু নির্ণয়ের জন্য চোখের ময়লা, পুঁজ পরীক্ষাগারে পাঠাবার পর পরই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা শুরু করতে হবে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী প্রয়োজনে চিকিত্সার পরিবর্তন করা যায়।

ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত কর্ণিয়ার ঘা এন্টিবায়োটিক ড্রপ ও মলম দ্বারা চিকিত্সা করা হয়। ছত্রাক দ্ব্বারা সংক্রমিত কর্ণিয়ার ঘা প্রচলিত এন্টিবায়োটিক দ্বারা নিরাময় হয় না।

এন্টিফাংগালয়াটিক ড্রপ ও মলম দ্বারা চিকিত্সা করা হয়। কালো চশমা পড়লে আলোতে অস্বস্তি হবে না। চোখে এট্রোপিন ড্রপ বা মলম ব্যবহার করলে চোখের ভিতরের মাংসপেশীর বিশ্রাম হয়। ব্যথা উপশমের জন্য প্যারাসিটামল বডি ব্যবহার করা যেতে পারে। চোখের কাছে বা শরীরের অন্য কোথাও সংক্রমণ থাকলে তার চিকিত্সা করতে হবে।

কর্ণিয়ার ক্ষতে স্টেরয়েড জাতীয় কোন ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। ভুলভাবে এ ওষুধ ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশে অনেক লোক কর্ণিয়ার ক্ষত থেকে অন্ধ হয়ে যায়।

কর্ণিয়াল আলসারের জটিলতা ডেসমেটোসিল

কর্ণিয়ার ক্ষত বিশেষত নিউমোকক্কাস বা অনুরূপ জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত ক্ষতসমূহ সহজেই গভীর হয়ে যায় এবং ডেসমেন্ট মেমব্রেনে পৌঁছে। পাতলা ডেসমেন্ট মেমব্রেন চোখের ভিতরের চাপ সহ্য করতে না পেরে ফুলে উঠে। একেই ডেসমেটোসিল বলে।

কর্ণিয়ার ছিদ্র হয়ে যাওয়া

কর্ণিয়ার আলসার ক্রমে ক্রমে বেড়ে গিয়ে গভীরতর হতে পারে এবং এর ফলে কর্ণিয়া ফুটো হয়ে যেতে পারে। কর্ণিয়া ছিদ্র হলে এস্থান দিয়ে অ্যাকুয়াস হিউমার বের হয়ে যায়। আইরিশ এর ছিদ্রের দিকে ধাবিত হয়। কর্ণিয়ার এ ধরনের ছিদ্রের গায়ে আইরিশ লেগে গিয়ে একে বন্ধ করে ফেলে। পরে ফাইব্রাস টিসু দ্বারা ঐ ছিদ্র বন্ধ হয়ে যায়। একে এন্টিরিয়র সাইনেকিয়া বলে।

অ্যান্টিরিয়র স্ট্যাফাইলোমা সংক্রামক জীবাণু বেশী শক্তিশালী হলে সমস্ত কর্ণিয়া পচে পড়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় সমস্ত আইরিশ এবং লেন্স সামনে এসে যায়। আইরিশ বাহিরের সংস্পর্শে আসার ফলে এর প্রদাহ হয় এবং এক প্রকার হলুদ স্তর এর উপর তৈরী হয়। এ হলুদ স্তর ফাইব্রাস টিসু দ্বারা নকল কর্ণিয়া তৈরী করে। এই নকল কর্ণিয় অত্যন্ত পাতলা বিধায় চোখের ভিতরের চাপ সহ্য করতে পারে না, ফলে সমস্ত চোখ সামনের দিকে ফুলে উঠে। একে অ্যান্টিরিয়র স্ট্যাফাইলোমা বলে।

কেরাটাইটিস

ভাইরাসজনিত কারণে কেরাটাইটিস হয়। সাধারণত হারপিস সিমপ্লেক্স ও এডিনোভাইরাস দ্বারা কেরাটাইটিস হয়ে থাকে।

লক্ষণসমূহ

কর্ণিয়ার সন্মুখভাগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা দাগ দেখা যায়। কর্ণিয়াতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষত দেখা যায়রোগীর চোখ দিয়ে পানি পড়ে আলোতে অস্বস্তি বোধ হয়।

চিকিত্সা

সাধারণত এন্টিভাইরাল ড্রপ বা মলম ও এন্টিবায়োটিক ড্রপ দ্বরা চিকিত্সা করা হয়।

ডেনড্রাইটিক আলসার হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস দ্বারা কর্ণিয়া আক্রান্ত হলে কর্ণিয়াতে এ ধরনের প্রদাহ হয়। কর্ণিয়ার উপরে শাখা প্রশাখাযুক্ত ক্ষত দেখা দেয়।

চিকিত্সা: সাধারণত এন্টিভাইরাল ড্রপ বা মলম ও এন্টিবায়োটিক ড্রপ দ্বারা চিকিত্সা করা হয়।

টেরিজিয়াম কনজাংটিভা থেকে কর্ণিয়া পর্যন্ত ত্রিভুজাকৃতির পর্দার মত আবরণকে টেরিজিয়াম বলে। সাধারণত: গরম ও শুক্ষ আবহাওয়াতে যারা বসবাস করে, তাদের এ রোগ বেশী হয়। টেরিজিয়াম কর্ণিয়ার কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হলে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। ওষুধ দিয়ে এর বৃদ্ধি বন্ধ করা যায় না। অপারেশনই হরো এরোগের একমাত্র চিকিত্সা। কর্ণিয়ার কেন্দ্র স্থলে আসার আগেই অপারেশনের মাধ্যমে চিকিত্সা করতে হবে। লিউকোমা কর্ণিয়াতে সাদা দাগ হলে তাকে লিউকোমা বলে।

লিউকোমা-এর কারণগুলো হলো-

১. কর্ণিয়াতে আলসারজনিত জটিলতা

২. কর্ণিয়াতে আঘাত

৩. জন্মগত

লিউকোমা কর্ণিয়ার কেন্দ্র স্থলে বা পিউপিলের ঠিক সামনে থাকলে চোখের দৃষ্টি কমে যায়।

চিকিত্সা: চোখের দৃষ্টিশক্তি বেশী কমে গেলে কর্ণিয়া সংযোজনের মাধ্যমে লিউকোমার চিকিত্সা করা হয়।

অধ্যাপক ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
চক্ষু বিভাগ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল
কলেজ, ঢাকা

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2016/09/165.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2016/09/165.jpgহাসন রাজাস্বাস্থ্য কথা
অধ্যাপক ডা. চন্দ্র শেখর মজুমদার । আমাদের দেশে অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ হলো কর্ণিয়াল আলসার বা কর্ণিয়াতে ঘা। সঠিক সময়ে চিকিত্সা হলে কর্ণিয়ার অধিকাংশ ঘা সেরে যায়। অবশ্য ঘা সেরে গেলেও কর্ণিয়াতে স্থায়ীভাবে দাগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সঠিক চিকিত্সা না হলে অন্ধত্ব অনিবার্য পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়। কর্ণিয়াতে ঘা...