পূর্ণ রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা

1438102152

মিসাইলম্যান খ্যাত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ, প্রভাবশালী ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষ। জনগণের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত আবদুল কালামের মৃত্যুতে গতকাল প্রথমদিনের মতো শোক পালন করেছে ভারতের সর্বস্তরের জনগণও। আবদুল কালামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে একটি শোক প্রস্তাব পাস করেছে ভারতের পার্লামেন্ট। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। খবর: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজারের।

সোমবার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন আবদুল কালাম। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে তার মরদেহ নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে আনা হয়। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার মরদেহ বিমান থেকে নামানো হয়। পালাম বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পালামে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরীকর, দিল্লির উপরাজ্যপাল নজিব জং, মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল প্রমুখ। এর আগে এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইট করে সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি লেখেন, ‘কালাম প্রথমে রাষ্ট্ররত্ন, তার পর রাষ্ট্রপতি।’ বেলা পৌনে একটা নাগাদ বিমানবন্দরে পৌঁছান মোদী। শ্রদ্ধা জানান কালামকে। এর কিছু পরেই পৌঁছান রাষ্ট্রপতি। একে একে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা জানান তাঁরা।

বিমানবন্দর চত্বরে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জানানো হয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে। বিমানবন্দর থেকে কালামের দেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর ১০ রাজাজি মার্গের বাড়িতে। গত সাত বছর ধরে সেখানেই থাকতেন তিনি। সেখানে ভারতের প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ কালামের বাসভবনে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পাঠানো এক বার্তায় কালামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক জ্ঞাপন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পালাম বিমানবন্দর থেকে রাজাজি মার্গ পথের ধারে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির ছিল স্কুল-কলেজের কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী। ছিলেন প্রচুর সাধারণ মানুষও। ভিআইপিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকেলে জনসাধারণ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে যেন মানুষের ঢল নামে সেখানে।

আজ বুধবার সকালে কালামের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তামিলনাড়ু। সেখানকার রামেশ্বরমে তাঁর জন্ম। ৯৯ বছরের ভাই ছাড়া এখন আর কাছের তেমন কেউই আর বেঁচে নেই কালামের। সেখানেই বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আনন্দবাজার। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে তাকে রামেশ্বরমে দাফন করা হচ্ছে।

সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে সোমবারই সরকারিভাবে সাত দিনের জাতীয় শোকের ঘোষণা করা হয়। গতকাল শোক প্রস্তাবের পর মুলতবি হয়ে যায় সংসদের দুই কক্ষের অধিবেশন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভারত ‘একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞানী, একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও এক মহান সন্তানকে হারিয়েছে। লোকসভার অধিবেশন আগামী ৩০ জুলাই ফের বসবে।

সোমবার সন্ধ্যায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে বি-স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘লিভেবেল প্ল্যানেট আর্থ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার সময় হঠাত্ পড়ে যান কালাম। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেয়া হয় শিলং শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। যেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন।

বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী আবদুল কালাম ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন ভারতের তৃতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি। দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ ছাড়াও ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ খেতাবেও ভূষিত হন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। খুব সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন তিনি।

বিমান প্রকৌশলে পড়াশোনা করে ভারতের প্রথম মহাকাশযান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন আবদুল কালাম। ওই মহাকাশযান দিয়েই ১৯৮০ সালে দেশটি প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র রোহিনী উেক্ষপণ করে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পোখরান-২ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার পেছনেও প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালে মূল পরীক্ষা চালানোর পর দীর্ঘ ২৪ বছরে ভারতের এটাই ছিল প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা।

আবদুল কালামের মৃত্যু শোক জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগে কেউ কেউ করেছেন স্মৃতিচারণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ‘মহান বিজ্ঞানী, অনবদ্য রাষ্ট্রপতি, সর্বোপরি একজন অনুপ্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে ভারত শোকস্তব্ধ। তার আত্মা শান্তি পাক! ডক্টর কালাম… আমার মন জুড়ে এখনও শুধুই তারই কথা… কত স্মৃতি… কত সাক্ষাত্… যখনই দেখা হয়েছে, তার পাণ্ডিত্যে বিস্মিত হয়েছি… অনেক কিছু শিখেছি তার কাছ থেকে। ডক্টর কালাম সব সময়েই মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালবাসতেন… বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম খুবই পছন্দ করতেন… ছাত্রদের উনি খুবই ভালবাসতেন, আর তাদের চারপাশে রেখেই তিনি চলে গেলেন!

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ডক্টর কালামের মৃত্যু নিঃসন্দেহে ভারতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হল, তা কোনও দিনই পূর্ণ হবে না। ডক্টর কালামের জন্য গভীর শোক প্রকাশ করি! তার আত্মা শান্তি পাক!

কিংবদন্তী ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার বলেছেন, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি, একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী তো বটেই, তার সঙ্গেই উনি ছিলেন সবার অনুপ্রেরণা। এমন অসাধারণ মানুষ আর হয় না। ডক্টর আবদুল কালামের আত্মা শান্তি পাক! দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল বলেছেন, ডক্টর এপিজে আবদুল কালাম আর নেই জেনে থেকে শোকস্তব্ধ হয়ে আছি। ভারত তার রত্নকে হারাল!

কংগ্রেস নেতা পি চিদাম্বরম বলেছেন, সামপ্রতিক ইতিহাসে ডক্টর কালামের মতো মানুষ দুর্লভ, যিনি একই সঙ্গে নবীন এবং বৃদ্ধ, ধনী এবং গরিব, সর্বোপরি যে কোনও বিশ্বাসের মানুষ সবার কাছেই সমাদৃত ছিলেন।

রাহুল গান্ধী ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের প্রয়াণে গভীর ভাবে শোকাহত। তার মতে, এমন বহুমুখী প্রতিভা আর হয় না। চারিত্রিক উষ্ণতা আর পাণ্ডিত্য দিয়ে তিনি দেশের মন কেড়েছিলেন! প্রখ্যাত অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন বলেছেন, ডাকসাইটে মেধা আর শিশুর সারল্য এই ছিলেন ডক্টর কালাম। এমন কেউই নেই যে ওকে ভালবাসতেন না! ওর আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করি! আরেক অভিনেতা শাহরুখ খান বলেছেন, গুরুদাসপুরের খবরটা পেয়ে মন খারাপ হয়েছিল! আরও খারাপ হয়ে গেল ডক্টর কালামের প্রয়াণের খবরটা পেয়ে! আল্লাহ সবাইকে শান্তি দিন!