Gold-01শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক সোনা আটক ও বিমান জব্দের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিমানের ৭৭ শীর্ষ কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে সংস্থাটির ১০ পাইলট ও ৫১ কেবিন ক্রুর নাম রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (উত্তর) বিভাগ এ তালিকা তৈরি করেছে। ২৫ মে তালিকাটি সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা দফতর থেকে বিমানের পরিচালক প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া রোববার অনুষ্ঠিত বিমানের পরিচালনা পর্যদ সভায়ও এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়। এর পরপরই গোটা বিমানে শুরু হয় মহাতোলপাড়। তালিকায় নাম থাকতে পারে- এমন আশংকায় বিদেশে ফ্লাইটের সঙ্গে গেলেও ফিরতি ফ্লাইটে দেশে ফেরেননি অনেকে। তবে এ তালিকার বিষয়ে বিমানের কোনো স্তরের কর্মকর্তারা মুখ খুলতে রাজি হননি।

বিমানের পরিচালক (প্রশাসন) রাজপতি সরকার তালিকা পাওয়ার কথা সোমবার যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে তালিকায় কাদের নাম আছে এবং কি কারণে তালিকা পাঠানো হয়েছে তা বলতে রাজি হননি। এদিকে সোনা চোরাচালানের ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, জড়িতেদের তালিকাটি নিয়ে তারা পরপর দুই দফায় বিমানের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের পর প্রাথমিক তালিকায় স্থান পাওয়া কয়েকজনের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে আরও কিছু নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জানতে চাইলে সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান যুগারন্তকে জানান, গত বছর ১২ নভেম্বর বিমানবন্দর থানায় দায়েরকৃত সোনা চোরাচালান (মামলা নং-২৮) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তিনি। ওই মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে বিমানের কতিপয় পাইলট কেবিন ক্রু ও শীর্ষ অফিসিয়ালের নাম পেয়েছেন বলে জানান তিনি। এসব ব্যক্তির নাম, স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা, অফিসিয়াল পদবি, টেলিফোন নম্বর জানতে বিমানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তালিকার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।

এদিকে বিমানের একটি সূত্রের অভিযোগ, সোনা চোরাচালান মামলার তালিকায় নাম থাকার কথা বলে আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের সোর্সরা বিমানের পাইলট ও কেবিন ক্রুদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হতিয়ে নিচ্ছে। এরা কেউ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন বলেও দাবি করে সূত্রটি।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে ২০১৩ সালে বিমানের কেবিন ক্রু বিভাগটি ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের হাতে (পাইলটদের হাতে) ন্যস্ত হওয়ার পর থেকে বিমানে সোনা চোরাচালানের ঘটনা বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, মূলত বিমানের কতিপয় পাইলটের নেতৃত্বেই একের পর এক সোনা পাচারের ঘটনা ঘটছে। এসব পাইলটের সঙ্গে সোনা চোরাচালান গডফাদারদের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। জানা গেছে, চোরাচালান চক্রের গডফাদার পলাশের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বিমানের কতিপয় পাইলটদের। সংশ্লিষ্ট পাইলটরা জোরপূর্বক কেবিন ক্রু ও বিমানের প্রকৌশল শাখার দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের সোনা চোরাচালানের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। কেবিন ক্রু শাখাটি ফ্লাইট অপারেশনের আন্ডারে আসার পর কতিপয় দুর্নীতিবাজ পাইলট সিডিউলিং বিভাগের কর্মকর্তা এমদাদ, তোজাম্মেল, মীরন, মতিন, সরোয়ার, নাসির ও লিটনের যোগসাজশে ফ্লাইট ক্রয় করে নিত। এরপর এসব ফ্লাইটে তাদের পছন্দের কেবিন ক্রুদের অন্তর্ভুক্ত করে বিভিন্ন দেশ থেকে বড় বড় সোনার চালান আনত। জানা গেছে, এসব সোনার চালান রাখার জন্য বিমানের নতুন ও মূল্যবান এয়ারক্রাফটগুলো কেটে তার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হতো।

তালিকায় যারা আছেন : পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (উত্তর) বিভাগ থেকে পাঠানো তালিকায় শীর্ষে আছে সোনা চোরাচালান ও ফ্লাইট বেচাকেনা মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া বিমানের শীর্ষ ঠিকাদার ও ভুয়া পাইলট মাহমুদুল হক পলাশ, তার স্ত্রী কবিন ক্রু নুরজাহানের নাম। পলাশ বর্তমানে জেলহাজতে অপরদিকে তার স্ত্রী ফ্লাইট স্টুয়ার্ড নূরজাহান বর্তমানে দেশের বাইরে পলাতক অবস্থায় আছেন। এছাড়া অন্যরা হলেন, ফ্লাইট স্টুয়ার্ড মাজহারুল আফসার রাসেল, ফ্লাইট সার্ভিস ডিজিএম এমদাদ হোসেন, সাবেক ম্যানেজার সিডিউলিং তোজাম্মেল, বিমানের প্রভাবশালী ম্যানেজার মীরন, সহকারী ম্যানেজার হাই সিদ্দিকী, চিফ অব সিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু আসলাম শহীদ, ক্যাপ্টেন আলী, ক্যাপ্টেন ইমরান, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েনের (ইফালপা) দ্বিতীয় দফায় নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক, সাবেক সিডিউলিং চিফ ক্যাপ্টেন রেজওয়ান, ক্যাপ্টেন রফিক, ক্যাপ্টেন হাসান ইমাম, জুনিয়র সিডিউলার আবদুল মতিন, সিডিউলার সরোয়ার, সিডিউলঅর নাসির ও রিটন। এছাড়া কেবিন ক্রুদের তালিকায় যারা আছেন তারা হলেন- ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ও জুনিয়র পার্সার মাসুদ, আখলাখ, আজম, সাপি, রিনি, নিশি, নিপা, হাসনা, শওকত, শারমিন, জাহিদ, ওয়াসিফ, জেনি, মুক্তা, হোসনে আরা, বিলকিস, বিথী, রাফসান, আবির, নাবিলা, মুফতি, হাসিব, আশিক, মুগনি, রাজ, আরাফাত, আমিন, ইকরাম, আরিয়ান, শওগাত, আলম, আদনান, শফিক, আদিবা, আশফিয়া, তাসফিয়া, দিয়া, কসমিক, শ্যামা, জুয়েল, শ্রাবণী/লাবণী, বুলবুলি, মোতাহার, মুফতি, মৌ, মেহজাবিন, শুভ্রা, মেনুকা, মাসুম, নোমানী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বিমান বন্দরকেন্দ্রিক একটি গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিমানের ৮ শীর্ষ কর্মকর্তার একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালিকাটি যাচাই-বাছাই করার জন্য বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর বিমান মন্ত্রণালয় থেকে তালিকাটি যাচাই-বাছাই করার জন্য বিমানে পাঠানো হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে তালিকাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। বিমানের পরিচালক (প্ল্যানিং) বেলায়েত হোসেনকে প্রধান করে এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই তালিকায় বিমানের দুজন প্রভাবশালী পাইলট ক্যাপ্টেন মাহবুব, ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক, ক্যাপ্টেন শোয়েব চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আবু আসলাম শহীদসহ ৮ জনের নাম রয়েছে। বিমানের তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে ওই তালিকায় স্থান পাওয়া একজন ফার্¯¡ অফিসার, দুজন জেনারেল ম্যানেজার ও একজন পরিচালকের নাম থাকলেও, সোনা চোরাচালানের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়নি। এ কারণে তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা প্রসঙ্গে বিমানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে বলেন, গত বছরের শেষ দিকে সোনা চোরাচালানের ঘটনায় ওই চক্রের গডফাদার পলাশ গ্রেফতার হওয়ার পর বিভিন্ন মিডিয়ায় যেসব নাম প্রকাশিত হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ওইসব নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরপর এসব নাম যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিমানে পাঠানো হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, তালিকায় থাকা অনেকে কোনো ধরনের সোনা চোরাচালানে জড়িত নন। তাদের মধ্যে অনেকেই নিরীহ। এ তালিকার কারণে কেউ কেউ হয়রানির শিকার হয়েছেন। ওই কর্মকর্তার আরও অভিযোগ- আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় সোর্স আছে যারা বিমানের প্রভাবশালী ও ধন-সম্পদের মালিকদের তালিকা তৈরি করে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য তালিকায় নাম দিয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ প্রিয়.কম

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/06/Gold-01.gifhttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/06/Gold-01-300x300.gifশুভ সমরাটচোরাচালানের খবর
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক সোনা আটক ও বিমান জব্দের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিমানের ৭৭ শীর্ষ কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে সংস্থাটির ১০ পাইলট ও ৫১ কেবিন ক্রুর নাম রয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (উত্তর) বিভাগ এ তালিকা তৈরি...