1436724971

বিএনপিতে ভাঙনের আশঙ্কায় ভুগছেন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া! গত কয়েকবছর ধরেই এই শঙ্কা কম-বেশি থাকলেও কিছু ঘটনায় সম্প্রতি এই ভীতি বহুগুণে বেড়েছে বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি। এই শঙ্কার জন্য সরকারের পাশাপাশি নিজ দল-জোটের বেশ ক’জন শীর্ষ এবং মাঝারি নেতাদেরও সন্দেহের চোখে দেখছেন ২০ দল প্রধান। এরসঙ্গে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের সময় পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে এবং আগুন ধরিয়ে মানুষ হত্যাসহ নাশকতার বিচারে সরকারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। শুধু দলের নয়, নিজের এবং ‘জিয়া পরিবারের’ রাজনৈতিক ভাগ্য নিয়েও ভাবনায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নিজের অবর্তমানে দলে ভাঙনের প্রক্রিয়া গতি পেতে পারে এবং সংশ্লিষ্টরা নতুন করে কলকাঠি নাড়তে পারেন-কার্যত এই শঙ্কা থেকেই ওমরাহ পালনের উদ্দেশে খালেদা জিয়া সৌদি আরবে তার পূর্বঘোষিত সফরে যাননি। গত বুধবার সৌদি আরবের উদ্দেশে তার ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সফর স্থগিত করেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিন নিয়ে ‘হয়রানি’র নেপথ্যে সরকারের ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে, এমন সন্দেহও তার সৌদি আরব যাত্রা বাতিলের অন্যতম কারণ। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সমঝোতা করে চলা কয়েকজন নেতার ডজন ডজন মামলায় আগাম জামিন পাওয়ার বিষয়টিকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। যার কারণে খালেদা জিয়া সাধারণত প্রতিবছর রোজার শেষভাগে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে গেলেও এবার শেষ মুহূর্তে সফর বাতিল করেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল রবিবার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘আমাদের নেত্রী সৌদি আরব যাননি বা হয়তো যাচ্ছেন না, এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে দলের কেউ দল ভাঙার ষড়যন্ত্র করতে পারেন, এটি আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু সরকারের সেই ধরনের কু-উদ্দেশ্য হয়তো থাকতে পারে। কেননা এখন যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি দাঁড় করানো হয়েছে, তাতে আমরা কম-বেশি সকলেই পরমতসহিষ্ণুতা থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির রাহুগ্রাসে আটকে গেছি।’

তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের মতে, ‘খালেদা জিয়া এখন আতঙ্কিত, বিএনপির নেতাকর্মীরা যেভাবে অনাস্থা ব্যক্ত করেছেন, তার নেতৃত্বের প্রতি যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাতে বিএনপি ভেঙে যেতে পারে। দল ভাঙার আশঙ্কায় খালেদা জিয়া কোথাও যাচ্ছেন না।’ বিএনপি ভাঙার নেপথ্যে সরকার কলকাঠি নাড়ছে, বিএনপি নেতাদের এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ভাঙতে আওয়ামী লীগ লাগবে না। আওয়ামী লীগ দল ভাঙার রাজনীতি করে না। বরং বিএনপির সিনিয়র নেতারাই বর্তমান নেতৃবৃন্দের প্রতি অনাস্থা ব্যক্ত করেছেন।’ হানিফ একথা বললেও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম কয়েকদিন আগে বলেছেন, ‘বিএনপি ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে।’

বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ‘চেয়ারপারসন কেন সৌদি আরব সফর স্থগিত করলেন, সে বিষয়ে আসলে আমরা জ্ঞাত নই। তবে আমরা অনুমান করছি, কয়েকদিন ধরে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ নেতাদের কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া, দ্বিতীয়বারের মতো কারাগার থেকে একজন স্থানীয় নেতার মৃত অবস্থায় বেরিয়ে আসা, অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা সবকিছু মিলিয়ে চেয়ারপারসনের মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। এই কারণেই সম্ভবত তিনি যাননি।’ তবে বিএনপি নেতারা শুধু সরকারের দিকে আঙ্গুল উঁচালেও দলীয় নেতাদেরই একটি অংশ দলের বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সক্রিয়। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এসব নেতা এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে একাধিক দফায় নিজেদের মধ্যে কথাবার্তাও বলেছেন। তাদের আলোচনায় খালেদা জিয়া ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের সমালোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। এবার সৌদি আরব গেলে দলের এই অংশটি নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে নতুন করে তত্পর হয়ে উঠতে পারে, এমন তথ্য ছিল খালেদা জিয়ার কাছে।

দলের যেসব নেতা বিকল্প এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত এবং ‘বিএনপি এখন জিয়াউর রহমানের আদর্শে নেই’ বলে সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ও টেলিফোন কথোপকথনে মন্তব্য করেছেন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘তাহলে কী বিএনপি শেখ হাসিনার আদর্শে চলছে? যারা এটা মনে করছেন, তারা বিএনপি ছেড়ে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় যোগ দিচ্ছেন না কেন, বিএনপি করতে আপনাদের কে বলেছে?’ জানা গেছে, গত সোমবার দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে কারও নাম উল্লেখ না করে দলীয় নেতাদের উদ্দেশে তিনি এ-ও বলেছেন- ‘আপনারা কে কোথায় কী করছেন, কার সাথে কথাবার্তা বলছেন—আমার কাছে সব তথ্যই আছে। সামনেই দলের কাউন্সিল করবো। যারা দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল ও আন্দোলনের সময় মাঠে সক্রিয় থাকেন, তাদেরকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে।’

সোমবারের ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির দু’জন সদস্য এবং একজন ভাইস-চেয়ারম্যান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তিন মাসের নিষ্ফল আন্দোলনের পর দলের স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও ড. আবদুল মঈন খানের ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও বিএনপি জিয়ার আদর্শচ্যুত হওয়া নিয়ে মন্তব্যে খালেদা জিয়া উষ্মা প্রকাশ করেন। এদিকে খালেদা জিয়া যখন তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় এবং এই দুটি মামলা নিয়ে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কথা চলছে, তখন পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যার বিচারে সরকারের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে তাকে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এসব নাশকতার হুকুমদানকারী হিসেবে খালেদা জিয়া ও তার সহযোগীদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।’ প্রধানমন্ত্রী এ-ও বলেছেন, এজন্য নতুন করে আইন করারও দরকার হবে না। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের জন্য এরই মধ্যে জনবল ও প্রয়োজনীয় অর্থ চাওয়া হয়েছে। আর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, আসন্ন রোজার ঈদের পরেই এই ট্রাইব্যুনাল গঠনের কাজ শুরু হবে।

বিএনপির একাধিক নেতা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে সঙ্গে আলাপকালে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নিয়ে তারা চিন্তিত। এর ফলাফল তারা অনুমান করতে পারছেন। এর মধ্যদিয়ে শুধু বিএনপির নয়, খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের রাজনীতিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেও মামলায় দণ্ডিত হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যেতে পারেন বলেও শঙ্কা ব্যক্ত করে তারা জানান, এসবের মধ্যদিয়ে দল ভাঙনের মুখে পড়তে পারে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপিকে ভেঙ্গে দলটির একাংশকে নির্বাচনে আনার নানা চেষ্টা হয়েছিল। নির্বাচনের পরেও বিএনপির সাবেক দুই এমপি আবু হেনা ও শহীদুল হক জামালকে দিয়ে বিএনপিকে ভেঙে ‘নতুন বিএনপি’ গড়ার লক্ষ্যে তত্পরতা শুরু হয়। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সেটি এখনো চলমান বলে জানা গেছে।

অর্ণব ভট্টজাতীয়
বিএনপিতে ভাঙনের আশঙ্কায় ভুগছেন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া! গত কয়েকবছর ধরেই এই শঙ্কা কম-বেশি থাকলেও কিছু ঘটনায় সম্প্রতি এই ভীতি বহুগুণে বেড়েছে বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি। এই শঙ্কার জন্য সরকারের পাশাপাশি নিজ দল-জোটের বেশ ক’জন শীর্ষ এবং মাঝারি নেতাদেরও সন্দেহের চোখে দেখছেন ২০ দল...