Oporadher Dairy Theke
মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মধ্যপাড়া (করারভাগ) গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীনের ছেলে মো. বাবুলের বয়স এখন ৫২ বছর। ১৯৯৯ সালে তাঁর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে। প্রায় ১৭ বছর ধরে বাবুল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এত বছরেও শেষ হয়নি মামলাটির বিচার।

রাজধানীর ডেমরা থানার ওই হত্যা মামলাটি ঢাকা মহানগর দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে (মেট্রো-দায়রা মামলা নম্বর ৪৪৮/০২) বিচারাধীন।

গত ২৮ জুন মামলার শুনানির তারিখ ধার্য থাকায় ওই দিন বাবুলকে কারাগার থেকে আদালতে নেওয়া হয়। আদালতে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে সঙ্গে কথা হয় তাঁর। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পার করে দিলাম অন্ধকার জগতে। ১৭ বছর ধরে কারাগারে আছি। মামলা শেষ হয় না। অনেক বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। আমার জীবনের কোনো হেরফের হয় না। দিনের পর দিন কারাগার থেকে আদালতে আর আদালত থেকে কারাগারে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। জেল-ফাঁস যা হয় হয়ে গেলে মনে হয় বেঁচে যেতাম। বিচার নয়, এখন জেল-ফাঁস দিয়ে দিতে বলেন।’ তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তাঁর ভাই জাফরও এই মামলার আসামি ছিলেন। তিনি বছর চারেক আগে মারা গেছেন। আসামি বাবুল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘আমাকেও হয়তো এভাবেই কারাগারে মরতে হবে।’ তাঁর দাবি, মামলায় তাঁদের অহেতুক জড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা এই ঘটনার ক্লু না পেয়ে প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার না করে আমাদের জড়িয়েছেন।’

বিচারিক আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) মো. শাহজামাল লিটন স্বীকার করেন যে আসামি বাবুল প্রায় ১৭ বছর ধরে কারাগারে আছেন। এত দিনেও মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, এরই মধ্যে সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। শুধু মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যিনি দিয়েছেন সেই চিকিৎসকের সাক্ষ্য নিতে পারলেই নিষ্পত্তি হয়ে যেত। কিন্তু ওই চিকিৎসক সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। চেষ্টা চলছে তাঁকে আদালতে হাজির করার। হাজির না হলে আগামী তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে বলে আদালত আদেশ দিয়েছেন।

বেশ কয়েকজন আইনজীবীর মতে, এমন মামলার বিচারকাজ দীর্ঘদিন চালানোর কোনো সুযোগ নেই। ১৭ বছর ধরে কারাগারে বিনা বিচারে একজন আসামিকে রাখা অমানবিক। অনেক আগেই জামিন পাওয়া উচিত ছিল। ঢাকার আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ হেলাল চৌধুরী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ১৭ বছর ধরে কারাগারে বিনা বিচারে কোনো আসামিকে রাখা শুধু অমানবিক নয়, সব মানবতাকে হার মানায়। অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এ ঘটনা মানুষকে বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেবে। আস্থাহীন করে তুলবে। হত্যা মামলায় একজন আসামি হলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে সে-ই খুনি।

ঘটনার বিবরণ : মামলার নথি থেকে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন ডেমরা থানার মীরহাজিরবাগের ৮৬ নম্বর বাড়ির একটি কুয়ার মধ্যে মোখলেছুর রহমান নামের এক ছাত্রের জবাই করা লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় মোখলেছুর রহমানের বাবা আ. সাত্তার বাদী হয়ে ওই দিনই ডেমরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। রাত ১টা থেকে ৪টার মধ্যে কে বা কারা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী। আসামি হিসেবে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। এরপর তদন্তকালে ১৯৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্ত : ডেমরা থানায় তখন কর্মরত এসআই মো. আ. হামিদ মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৯ সালের ১১ এপ্রিল ছয়জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। ১৭ বছর ধরে কারাগারে থাকা আসামি বাবুল ও তাঁর ভাই জাফর ছাড়া চার্জশিটভুক্ত অন্যরা হলেন নাজু, জহির, সেলিম ও বদরুল। এরা পলাতক রয়েছেন।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আসামিরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কেন, কিভাবে জড়িত তাঁর কোনো ব্যাখ্যা নেই প্রতিবেদনে। শুধু বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হলো।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়নি : বিচারাধীন এই মামলায় মোট ১৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। তাদের মধ্যে মাত্র ছয়জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে সরকারপক্ষ। সরকারি কৌঁসুলি দাবি করেন, মামলার সাক্ষী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন চিকিৎসক (মেডিসিন বিভাগ) ডা. মো. নুরুল ইসলাম সাক্ষ্য দিলে আগেই চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি নিষ্পত্তি হতো। কিন্তু তিনি আদালতে আসছেন না। মামলার নথি থেকে দেখা যায়, বারবার আদালত তাঁকে তলব করলেও তিনি আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও হাজির করছে না। এ কারণে আগামী ধার্য তারিখে তাঁকে হাজির করা সম্ভব না হলে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে বলে গত ২৮ জুনের আদেশে বলেছেন আদালত।

জামিন মেলে না বাবুলের : মামলার নথি থেকে দেখা যায়, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা বাবুলের জামিন আবেদন বারবার নাকচ করেছেন আদালত। গত ২৮ জুনও তাঁর জামিনের আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঢাকা মহানগর দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোসাম্মাৎ শামসুন্নাহার এটি একটি নৃশংস ঘটনার মামলা বিবেচনায় আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দেন।

ঘটনা নৃশংস, কিন্তু আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য নেই : ঘটনাটি নৃশংস হলেও আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত মোখলেছুরের বাবা আ. সাত্তার, তাঁর দুই ভাই, একজন এলাকাবাসী ও দুজন পুলিশ সদস্য। ঘটনায় আসামিরা জড়িত মর্মে কোনো সাক্ষ্য দেননি নিহত ব্যক্তির স্বজন ও এলাকাবাসী। এমন মামলায় ১৭ বছরেও আসামির জামিন না পাওয়া দুঃখজনক ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে আসামির আইনজীবীরা শুনানির সময় আদালতকে জানান। কিন্তু ফল কিছুই হয় না।

হীরা পান্নাঅপরাধের ডায়েরী থেকে
মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মধ্যপাড়া (করারভাগ) গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীনের ছেলে মো. বাবুলের বয়স এখন ৫২ বছর। ১৯৯৯ সালে তাঁর বয়স যখন ৩৫ বছর, তখন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে। প্রায় ১৭ বছর ধরে বাবুল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। এত বছরেও শেষ হয়নি মামলাটির বিচার। রাজধানীর...