1436639970

চুয়াডাঙ্গা শহরের উপকণ্ঠেই আলুকদিয়া ইউনিয়ন। তার পাশে একটি গ্রাম দৌলিদয়াড়। সেখানে জাগ্রত সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার উন্নয়নের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্থানীয় সংসদ সদস্য টেস্ট রিলিফের (টিআর) এক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আসলে কী উন্নয়ন হয়েছে তা দেখতে সংস্থায় যাওয়ার পর সেটি বন্ধ পাওয়া গেল। পাশের একজন জানালেন এটি একটি এনজিও। আর এর মালিক কোহিনুর বেগম। তিনি সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। এনজিওটির ঠিক পাশেই কোহিনুর বেগমের বাড়ি। চিকিত্সার জন্য তিনি তখন দেশের বাইরে। তার ছেলে রোকনুজ্জামানের স্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিল এখানে কী হয়— জবাবে তিনি বললেন, ‘এটি একটি এনজিও। এখানে এলাকার মহিলাদের ঋণ দেয়া ও সুদসহ তা তোলা হয়। এর বাইরে আর কোনো কার্যক্রম নেই।’

শহরের মধ্যেই সবুজপাড়া সন্ধানী মহিলা কল্যাণ সমিতির উন্নয়নের জন্য সংসদ সদস্য একইভাবে এক টন চাল দিয়েছেন। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, একটি বাড়ির মধ্যে সমিতির নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙ্গানো। বাড়িতে খোঁজ নিতেই একজন বেরিয়ে এসে জানালেন তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নুরুন্নাহার কাকলীর ভাই। এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাবেক এই কাউন্সিলর। প্রতিষ্ঠানে কী কাজ হয়— প্রশ্ন করতেই সেই যুবক জানালেন, ‘এটি একটি এনজিও। এখানে মহিলাদের ঋণ দেয়া হয়।’ কোনো ফ্রি প্রশিক্ষণ হয় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘না। এটা শুধুই এনজিও।’

টেলিফোনে কাকলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বললেন, ‘আমার বাড়িতে সন্ধানীর নামে একটি ঘর ছিল সেটি ঝড়ে পড়ে গেছে। ঘর তোলার জন্যই এমপির কাছ থেকে চাল নিয়েছি।’ সন্ধানীর কাজ কী? জবাবে তিনি বলেন, ‘মহিলাদের ঋণ দেই। আবার সেগুলো তুলি। মাঝে মধ্যে প্রশিক্ষণও দেই।’ কিন্তু আশপাশের কেউ প্রশিক্ষণের বিষয়টি জানেন না বলেই এ প্রতিবেদককে জানালেন।

দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের আরামডাঙ্গা গ্রামে টিআরের ৪ লাখ টাকায় গত মে মাসে রাস্তায় ফ্ল্যাট সোলিংয়ের (ইট দিয়ে) কাজ করেছেন স্থানীয় ইউপি মেম্বার আলী রহমান। কিন্তু ইটের মান এত খারাপ ছিল যে, তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে এলাকাবাসী সেই ইট তুলে এক জায়গায় জড়ো করে রাখেন। পরে স্থানীয় চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের হস্তক্ষেপে ভালো ইট দিয়ে সোলিং করা হয়। গ্রামের ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘ওরা খুব প্রভাবশালী তাই সামনে আমরা কিছু বলতে পারি না। কাজ করে চলে যাওয়ার পর আমরা ইট তুলে জড়ো করে রেখেছিলাম। আসলে ওই ইটগুলো ৩ নম্বর ছিল। পরে ২ নম্বর ইট এনে রাস্তা করে দিয়েছে।’ চেয়ারম্যান আবুল কাশেম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘ইট নিয়ে গ্রামবাসীর অভিযোগ থাকায় আমি নিজে ভাটায় গিয়ে ইট পছন্দ করে দিয়েছি। পরে সেই ইট দিয়ে রাস্তার কাজ শেষ করা হয়েছে।’

শুধু এই তিন জনপ্রতিনিধি নয়, চুয়াডাঙ্গায় টিআর আর কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিখা) কাজের চাল ও টাকা এভাবেই বাটোয়ারা করে নিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। অন্য জেলাগুলোতে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও চুয়াডাঙ্গায় অভিযোগটা সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। তাদের কাজের মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। শুধু সদর নয়, জীবননগর, দামুড়হুদা ও আলমডাঙ্গা সব এলাকারই একই চিত্র।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল হাসানের সঙ্গে তার কার্যালয়ে কথা হয় । তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সদ্য তিনি এখানে এসেছেন। তাই আগের কাজ সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারবেন না। আগের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনের সময় কাজগুলো হয়েছে তাই তিনিই এ নিয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে তিনি জেনেছেন এখানকার হুইপ সাহেব সবকিছু জনপ্রতিনিধিদের দিয়েই করান। ফলে ন্যূনতম কাজ যেন হয়।

উপরের তিনটি কাজের একটি করেছেন এমন একজন জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, এক টন চাল পেতে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এই ঘুষের টাকা এমপি থেকে শুরু করে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, থানার ওসিসহ সবাই ভাগ পান। আবার সেই চাল তুলে বাইরে বিক্রিরও কোন সুযোগ নেই। তাদের মনোনীত ডিলারের কাছে ১৭/১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়। তারা যেভাবে দাম দেয় সেভাবেই নিতে হয়। তাহলে কাজ করবেন কিভাবে? ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়ে এতো পরিশ্রমের পর শেষ পর্যন্ত যা থাকে তাতে মনে হয় এটা আমারই প্রাপ্য! এসব কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিআরের চালে কোন কাজ হচ্ছে না।

এখানেই শেষ নয়। কর্মসৃজন প্রকল্পে নারী শ্রমিকদের দিয়ে রাস্তায় মাটি ভরাটের কাজ হয়। সেখানে একজন নারী ৭ দিন কাজ করার কথা থাকলেও তিন দিন কাজ করিয়ে তাকে বাদ দেয়া হয়। এসব কাজের টাকা সরাসরি ব্যাংকে চলে যায়। ফলে যেসব নারী শ্রমিক কাজ করেন তাদের কাছ থেকে সই করা চেকবইয়ের পাতা রেখে দেয়া হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে জনপ্রতিনিধিরা সেসব টাকা তুলে নিয়ে যান। পাশাপাশি যে কদিন কাজ করে তাদের ২০০ টাকা করে পাওয়ার কথা সেখান থেকেও ৩০ টাকা করে কেটে রাখা হয় বলে অভিযোগ।

দামুরহুদার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নে কাবিখার ৮ টন চালে ইউপি মেম্বার লিয়াকত আলী নিজের বাড়ির পাশ থেকে চারাবটতলা পর্যন্ত মাটি ভরাটের কাজ করেছেন। গত এপ্রিলে এই কাজ হয়েছে। একই সময়ে হরিরামপুরের বাগান থেকে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত ১০ টন চালে রাস্তা সংস্কার হয়েছে। এটি করেছেন সবুর মিয়া। দুটি কাজই হয়েছে! কিন্তু চালের সঙ্গে কাজের কোন মিল নেই। এই কাজ নিয়ে এলাকাবাসীরও অভিযোগের শেষ নেই।

জীবননগর উপজেলার চিত্র আরো ভয়াবহ। জীবননগরের উথলী ইউনিয়নের খয়েরহুদা গ্রামের মতিয়ার রহমানের বাড়ি থেকে বয়ারগাড়ী রাস্তায় মাটি সংস্কার ও খয়েরহুদা কাশেম আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ৮ টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্প চেয়ারম্যান ছিলেন সংশ্লি­ষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দীন। এ কাজ সম্পর্কে মেহেরপুর পল্ল­ীবিদ্যুত্ সমিতির সাবেক পরিচালক ও ঐ গ্রামের বাসিন্দা শরীফ উদ্দিন দারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, প্রকল্পের রাস্তাটি মাটির নয়, এটি ইট বিছানো। তারপরও রাস্তার দুই পাশে মাটি ভরাট করার সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঐ রাস্তায় মাটির কোন কাজ তিনি হতে দেখেননি। খয়েরহুদা কাশেম আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুজ্জামান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে কোন সোলার প্যানেল লাগানো হয়নি।’

এই কাজের ব্যাপারে চেয়ারম্যান শরীফ উদ্দিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘বরাদ্দের গমই তো আমি এখনো পাইনি। তাহলে কাজ করব কিভাবে। এক বছর আগে বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু বরাদ্দের গম তো আমাকে দেয়া হয়নি। আমি পঙ্গু মানুষ, তাই দৌড়াদৌড়ি করতে না পারার কারণে এগুলো আমার কাছে আসছে না। যদি কখনো আমাকে দেয়া হয় তাহলে কাজ করে দেব।’ তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, বরাদ্দের সব গম দেয়া হয়ে গেছে।

হীরা পান্নাশেষের পাতা
চুয়াডাঙ্গা শহরের উপকণ্ঠেই আলুকদিয়া ইউনিয়ন। তার পাশে একটি গ্রাম দৌলিদয়াড়। সেখানে জাগ্রত সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার উন্নয়নের জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্থানীয় সংসদ সদস্য টেস্ট রিলিফের (টিআর) এক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আসলে কী উন্নয়ন হয়েছে তা দেখতে সংস্থায় যাওয়ার পর সেটি বন্ধ পাওয়া গেল। পাশের...