Oporadher Dairy Theke
বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে আলোচিত অনেক মামলার শতাধিক আসামি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এ জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বিচারকের নকল স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে প্রস্তুত করা ভুয়া জামিননামা। সেই ভুয়া জামিননামায় আসামিদের নাম-ঠিকানার পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় জামিনদারের পরিচয় এবং আসামিদের আইনজীবীর স্বাক্ষর ও সিল। তবে এসব বিষয়ে মামলার নথিপত্রে বিচারকের কোনো আদেশ নেই। এমনকি আসামিদের মুক্তির বিষয়ে আদালত থেকে কোনো আদেশও দেওয়া হয়নি কারা কর্তৃপক্ষকে। তবু কারাগার থেকে হুরহুর করে বেরিয়ে গেছে ভয়ঙ্কর শতাধিক দাগি আসামি।

ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এসব বিরল জালিয়াতির ঘটনা, যার প্রমাণ বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক মুঠোফোনে বলেন, ‘অনিয়মের খবরটি আপনার কাছ থেকে শুনলাম। জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

ঘটনা-১ : রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকা থেকে ১২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আক্তার ও মাহবুব নমের দুজনকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এ ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় গত বছরের ১৬ নভেম্বর মামলা হয়, নম্বর-২৫(১১)১৪। পরে তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলায় অভিযোগে বলা হয়, হাজারীবাগের মধুবাজারের ১২/এ রোডের ১৭৫ নম্বরের বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটের ভিতর প্রবেশ করে আসামিদের ঘেরাও করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে আসামিরা জানায়, ফ্ল্যাটের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে রক্ষিত স্টিলের আলমারির মধ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট আছে। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে আলমারির বাঁ পাশের ড্রয়ারের মধ্যে চারটি পলিথিন প্যাকেটে মোট ১২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পরে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এই ১২ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট যৌথভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে আসামিরা সংরক্ষণ করেছে। পরে মামলা বিচারের জন্য বদলি হয়ে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আসে, যার দায়রা মামলা নম্বর-১২৬/১৫। এরপর বিচারক কারা কর্তৃপক্ষকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি আসামিদের আদালতে হাজির করতে ২৩ মার্চ দিন ধার্য করেন এ জন্য যে, ওই দিন অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। কিন্তু ওই দিন আসামিদের কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে পাঠায়নি। পাঠাবে কী করে! আসামিরা যে এরই মধ্যে জালিয়াতি করে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছে।

ঘটনা-২ : রাজধানীর চকবাজারের বাসিন্দা মঈনউদ্দীন। চলতি বছরের ২২ মার্চ ভোর সাড়ে ৬টায় সহকর্মীকে নিয়ে শাহবাগ থানা এলাকার সম্রাট হোটেলের সামনে দিয়ে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ আসামি শহিদুল ইসলাম শিবির ব্যারিকেড দিয়ে ধরে বলে, মোটরসাইকেল দিয়ে যেতে হবে। পরে মোটরসাইকেল দিতে অস্বীকৃতি জানালে আরেক আসামি আজিজুল হক অপু কালো রঙের একটি পিস্তল বের করে মঈনউদ্দীনের মাথায় ঠেকিয়ে ধরে এবং গুলি করে দেবে বলে হুমকি দেয়। তখন ডাকচিৎকার দিলে আসামিরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে একজনকে এবং পরে আরেকজনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। মামলা নম্বর-৩০(৩)১৫। পরে ঘটনার তদন্ত করে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামি শহিদুল ইসলাম শিবিরের ঠিকানা সঠিক। কিন্তু ওই ঠিকানায় তাদের কোনো বাড়িঘর বা সম্পত্তি বর্তমানে নেই। তারা জন্ম থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করে আসছেন। অপর আসামি আজিজুর রহমান অপুর স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। তিনি যে ঠিকানা জানিয়েছেন তা সঠিক নয়। তাই আসামিদের জেল-হাজতে রেখে বিচারকাজ পরিচালনা করা হোক। এরপর মামলা বিচারের জন্য বদলি হয়ে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আসে, যার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর-৩৬৭/১৫। এরপর বিচারক অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৮ জুলাই দিন ধার্য করে আসামিদের আদালতে হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে এ মামলার আসামিদের আর কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে হাজির করতে পারেনি। কারণ এর আগেই জালিয়াতি করে আসামিরা কারাগার থেকে বের হয়ে লাপাত্তা!

উপরের এ দুটো ঘটনা উদাহরণ মাত্র। একইভাবে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি মামলায় শতাধিক আসামি কারাগার থেকে বেরিয়ে এখন পলাতক। পুলিশের খাতায় এসব আসামিরা দুর্ধর্ষ। তবে এ আসামিদের সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ মামলার নথিপত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এ ধরনের ঘটনায় কোনো আইনজীবী জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকা আইজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী মো. নজীব উল্লাহ হিরু বলেন, এ ধরনের অনিয়ম স্বাধীন বিচারব্যবস্থার জন্য হুমকি। এর সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। কারণ আসামির পক্ষে একা জালিয়াতি করা সম্ভব নয়। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ধরনের জঘন্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু বলেন, মাঝেমধ্যে এ ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। এরপর আর তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। যারা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। জালিয়াতির ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, জালিয়াতি করে আদালত থেকে জামিন নেওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতেরই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

শুভ সমরাটঅপরাধের ডায়েরী থেকে
বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে আলোচিত অনেক মামলার শতাধিক আসামি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এ জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বিচারকের নকল স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে প্রস্তুত করা ভুয়া জামিননামা। সেই ভুয়া জামিননামায় আসামিদের নাম-ঠিকানার পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় জামিনদারের পরিচয় এবং আসামিদের আইনজীবীর স্বাক্ষর ও সিল। তবে এসব বিষয়ে...