samaresh_93242
প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। তখনো জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি-কোচবিহারের রাস্তায় বড়দের দেখলে অল্প বয়সীরা সিগারেট লুকিয়ে ফেলত। সেই ‘বড়’ লোকটি পরিবারের কেউ নন, পাড়ার সুবাদে দাদা-কাকা, মেসোমশাই হতে পারেন। কিন্তু তার মুখের সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবা যেত না। নিজের পরিবারের বাইরে পাড়ার মানুষদের নিয়ে আরও বড় একটি পরিবার বহুকাল ধরেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কলেজে পড়ছি যখন তখন ভরবিকেলে পাড়ার এক মাসিমা হাত নেড়ে কাছে ডেকে যদি বলতেন, ‘কাঁঠালতলা থেকে একটু সন্দেশ এনে দিবি বাবা, হুট করে অতিথি এসে গেছে অথচ বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে আসার মতো কেউ নেই।’ তার দেওয়া টাকা নিয়ে সাইকেল চালিয়ে ছুটে যেতাম মিষ্টি আনতে। একটুও খারাপ লাগত না। ছুটি শেষ হয়ে গেলে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগের দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বলে আসতাম পূজোর ছুটিতে আবার আসব। আর সেই বিদায় নেওয়ার সময় জুটত নারকেলের নাড়ু অথবা মোয়া। তখন টেলিফোনের আকাল ছিল। চিঠি এলো অমুক তারিখে অমুক মামাকে নিয়ে মামি আসছেন কলকাতায়। পেটে টিউমার হয়েছে, অপারেশন করতে হবে। সেই সঙ্গে অনুরোধ, ‘তোর ভরসায় যাচ্ছি’।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হোস্টেলে থাকি। বাবার পাঠানো টাকায় চলি। কোনো ক্ষমতা নেই। সেই আমার ওপর ভরসা যার সেই মামা থাকতেন জিলা স্কুলের পাশে, খুব গম্ভীর প্রকৃতির লোক। দেখা হলেই বলতেন, ‘সময় নষ্ট কর না, সময় খুব দামি।’ না রক্তের সম্পর্ক, না আত্দীয়তার বন্ধন, কী করি বুঝতে সময় লাগল। ক্লাসের বন্ধুদের বলতেই তারা হইহই করে এগিয়ে এলো। মেডিকেল কলেজে কারও দাদা জুনিয়র ডাক্তার, কারও কাকা সার্জন। থাকার জায়গার সমস্যা নেই, মির্জাপুর স্ট্রিটের আইডিয়াল হোম হোস্টেল আছে। নর্থ বেঙ্গল এঙ্প্রেসে শিয়ালদায় এলেন মামা-মামি এবং তাদের মেয়ে।

আমরা কয়েকজন সেই যে তাদের সঙ্গ নিয়েছিলাম, সুস্থ করে ট্রেনে তুলে না দিয়ে তা ছাড়িনি। কলকাতার বন্ধুরা জানত তিনি আমার নিজের মামা। ভুলটা ভাঙাইনি। কারণ, একজন অর্ধপরিচিত পাড়ার মামার জন্য কলকাতায় কেউ এত ব্যস্ত হয় না।

জানি, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’ জানি, এড়ায় না। কলকাতার বাতাস ওখানেও পেঁৗছে গেছে। পাড়া দূরের কথা, পাশের বাড়ির মানুষের সঙ্গে পরিচয় নেই অনেকের। ৩০-৪০ বছর আগে জলপাইগুড়ির মানুষ বাড়ি তৈরি করে অথবা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকত। তখন জলপাইগুড়িতে মাল্টিস্টোরিড বাড়ি তৈরি হয়নি, ফ্ল্যাট কিনে মানুষ সেখানে বসবাস আরম্ভ করেনি। দু-তিন ঘরের খাঁচায় বাস করার কথা তারা ভাবতে পারতেন না। বাড়ির ভিতরে একটা উঠোন, বাইরে ছোট বাগান, ঘরের মধ্যে একটি ঠাকুরঘর না থাকলে মন উঠত না তাদের। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখছি সব তছনছ হয়ে গেছে। এখনো যারা ওইরকম বড়িতে আছেন তারা ভাগ্যবান। কিন্তু তাদের পরিবারের মহিলারা অত বড় বাড়ির দখল আর সামলাতে চান না। ছোট্ট ফ্ল্যাটেই তারা স্বস্তিতে থাকতে চান। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ার পরে আমরা অনেক কিছু হারালাম। বাবা-কাকার দ্বন্দ্বের পরিণতি যেহেতু সম্পত্তি ভাগাভাগি, বিক্রি করে আলাদা হওয়া, তাই কাকার প্রতি ভাইপোর, জ্যাঠার প্রতি অন্য ভাইপোর শ্রদ্ধা কমে যেতে বাধ্য। উল্টো তাদের উপেক্ষা করার সাহস ওরা পেয়ে গেল। নিজের কাকা-জ্যাঠাদের যেখানে উপেক্ষা করা যাচ্ছে সেখানে পাড়ার কাকা-জ্যাঠাদের সম্মান দেখানোর দায় থাকতে পারে না। এখন জলপাইগুড়ির রাস্তায় বয়স্ক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে অনেক তরুণকে একটুও সঙ্কুচিত হতে দেখি না।

আমার ছোট পিসিমার বিয়ে হয়েছিল কৃষ্ণনগরের পাত্রের সঙ্গে। বরযাত্রীরা যখন এলো তখন পিতামহ আমার পিতাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের দেখাশোনার। বিয়ের রাত্রে তাদের অনেককেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গেল। খাবারের অপচয় করলেন সেই কারণে। পরদিন বর-কনে চলে যাওয়ার পর পিতামহ পিতাকে ডেকে কৈফিয়ৎ চেয়েছিলেন, ‘তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া সত্ত্বেও তুমি ওদের মদ্যপান থেকে বিরত করনি কেন? পিতা বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, তার নিষেধ ওরা শোনেনি। আবার বরযাত্রী বলে তিনি বেশি কড়া হতেও পারেননি।’ পিতামহ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে তৎক্ষণাৎ আমাকে জানাওনি কেন? আমি ওই মদ্যপদের পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিতাম না। তুমি খুব অন্যায় করেছ, তাই এখন থেকে এই বাড়িতে তোমার জায়গা নেই। বউমা থাকবেন, তোমার ছেলেও থাকবে। শুধু তুমি আর এই বাড়িতে থাকবে না।’

আদেশ শুনে বড় পিসিমা কেঁদে উঠেছিলেন, মা পাথরের মতো বসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বড় পিসিমার আবেদন-অনুরোধে পিতামহ বলেছিলেন, ‘তোমাকে ক্ষমা করছি না, ঠিক আছে, থাকতে পার, তবে দ্বিতীয়বার এরকম হলে আমি কোনো কথা শুনব না।’

নব্বই সালের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। জলপাইগুড়িতে সিরিয়ালের শুটিং করতে কলকাতা থেকে যে দল গিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন নামি অভিনেতা ছিলেন, যিনি নিয়মিত পরিমিত মদ্যপান করতেন। তার সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়েছিলাম আমি, সঙ্গী শহরের আরও দুজন, যার একজন অধ্যক্ষ, একজন সরকারি উকিল। তিনি পান করলেন, আমরা কথা বললাম। বোতলটি শেষ হয়ে গেলে আমরা যখন উঠছিলাম তখন সরকারি উকিল সেটি চেয়ে নিলেন। বোতলের গড়ন দেখে শখ হয়েছিল বাড়িতে রাখার। জানুয়ারি, রাত ১১টা, প্রচণ্ড শীত। রাস্তায় রিকশা দূরের কথা, মানুষই নেই। হেঁটে কদমতলায় এসে যে যার বাড়ির পথ ধরব, এমন সময় পুলিশের উদয় হলো। অন্ধকারে লোক দুটো বোতল হাতে সরকারি উকিলকে দেখে মাতাল ভেবে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করল। ভদ্রলোক যতই বলেন তিনি কোনো দিন মদ্যপান করেননি ততই লোক দুটো বলতে লাগল, ‘জলপাইগুড়ির রাস্তায় মদের বোতল নিয়ে ঘোরা? কী আস্পর্ধা! লাইটপোস্টের আলোয় এসে চিনতে পেরে একহাত জিভ বেরিয়েছিল লোক দুটোর। এখন বোধহয় পুলিশ চোখ বন্ধ করে ডিউটি দেয়!

– See more at: http://www.bd-pratidin.com/first-page/2015/07/12/93242#sthash.iWbYpgpY.dpuf

শুভ সমরাটমতামত
প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। তখনো জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি-কোচবিহারের রাস্তায় বড়দের দেখলে অল্প বয়সীরা সিগারেট লুকিয়ে ফেলত। সেই 'বড়' লোকটি পরিবারের কেউ নন, পাড়ার সুবাদে দাদা-কাকা, মেসোমশাই হতে পারেন। কিন্তু তার মুখের সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবা যেত না। নিজের পরিবারের বাইরে পাড়ার মানুষদের নিয়ে আরও বড় একটি পরিবার বহুকাল ধরেই...