BC-05-07-15-N_21
ঈদে যানজট। রাজধানী থেকে সারাদেশের সড়ক মহাসড়ক জুড়ে থমকে থাকা হাজার হাজার গাড়ি। চরম দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ। আর ওই দুর্ভোগ নিরসনের কৌশল আবিস্কার নিয়ে বার বার হাইপ্রফাইল বৈঠক। বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের টেকসই নানা মতবাদ আসে। সরকারিভাবে নানা সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কমে না যানজট। কমে না ভোগান্তি। কারণ, হাইপ্রফাইল বৈঠকের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নেই। নেই বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ। এ পরিস্থিতিতে এবারও রাজধানীতে রমজানের যানজট চরম আকার ধারণ করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ঈদে ঘরমুখী মানুষজনও ভোগান্তির শিকার হবেন।

প্রতিবছর রমজান এলে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যানজট নিরসনে একাধিক সভার আয়োজন করে। সভাগুলোতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও অংশ নেয়। এসব বৈঠকে রমজান ও ঈদে যানজট ভোগান্তি নিরসনে নানারকম নির্দেশনা এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে প্রায়ক্ষেত্রেই এসব নির্দেশনা এবং সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয় না। ফলে রমজানে রাজধানীর যানজটে জনভোগান্তিরও কোনো প্রশমন হয় না।

জানা যায়, রোজা ও বর্ষা মৌসুমের দুর্ভোগ নিরসনে বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের নিয়ে গত ২৮ মে একটি বৈঠক করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ রাজধানীর দুই নির্বাচিত মেয়র। এছাড়া ছিলেন বিআরটিএ (সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ), বিআরটিসি (সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন), রাজউক, এলজিইডি, সিটি কর্পোরেশন, বিআইডব্লিউটিএ (অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ), বিআইডব্লিউটিসি (অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন), (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) ডিএমপিসহ সব সংস্থার প্রধানরা। বৈঠকে ঢাকার ১৫ বিশেষ স্থান যানচলাচলের বিশৃঙ্খলার জন্য চিহ্নিত করা হয়। সড়ক-মহাসড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযানের নির্দেশনা দেয়া হয় বৈঠকে। সিদ্ধান্ত অনুসারে এরপর গত ১ জুন গুলিস্তান এবং ১২ জুন ফার্মগেট এলাকার রাস্তা ও ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাত্র কয়েকঘণ্টার মধ্যেই আবারো দখলকারীরা ফের জাঁকিয়ে বসে সড়ক ও ফুটপাতে।

এরপর ১ জুলাই পুরো মহানগরী অবৈধ দখলমুক্ত করার কথা থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

ডিটিসিএ সূত্র আরো জানায়, ডিটিসিএর ওই সভায় ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করা ছাড়াও বর্ষা এবং ঈদের আগেই সব রাস্তা মেরামত করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে গত শুক্রবারও কাওরানবাজারের একটি রাস্তা মেরামত করতে দেখা গেছে। এর দুদিন আগে ওই এলাকার আরেকটি রাস্তা মেরামত করা হয়েছে। রাজধানীর অনেক রাস্তা এখনো ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। অলিগলির রাস্তার অবস্থা আরো ভয়াবহ। গলির যানজট বেশিরভাগ সময় প্রধান সড়কে যানজটের সৃষ্টি করছে।

এছাড়া সভায় নগরীর ৩ বাসটি টার্মিনাল এবং ঢোকার ও বের হওয়ার পয়েন্ট, গাবতলী, আমিনবাজার, সাভার বাজার, নবীনগর, চন্দ্রা, ভোগড়া, আশুলিয়া, চেরাগ আলী, গাজীপুর চৌরাস্তা, বাবুবাজার, মহাখালী, সায়েদাবাদ, যাত্রীবাড়ী, চিটাগাং রোড, কাঁচপুর ব্রিজসহ অন্যান্য স্থান যানচলাচলের উপযোগী রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ওইসব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কাগজেই থেকে যায়। ফলে বরাবরের মতোই রমজানে যানজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি এবার বর্ষা মৌসুমও একই সময়ে হওয়ায় জনভোগান্তি আরো বেড়ে গেছে।

গত কয়েকদিনে সরজমিন রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টার থমকে থাকছে রাজপথ। গাড়ির চাকা ঘুরছে না বললেই চলে। মহাখালী থেকে শাহবাগ, নিউমার্কেট থেকে কারওয়ানবাজার সবখানে একই দৃশ্য। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ঈদ আসতে আসতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

গতকাল রোববার দুপুরে বাংলামোটর ওভাব্রিজের নিচে দাঁড়ানো সফিকুল ইসলাম নামে এক পথচারী বলেন, সকাল ১০টায় যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান এসেছি। এরপর আর বাস না পেয়ে হাঁটা শুরু করেছি।

ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রমজান মাসের বাকি দিনগুলোতে যানজট খুব একটা কমবে না। বরং বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরো বাড়বে। রমজানের সামনে ছুটির দিনগুলোতে যানজট আরো বেড়ে যাবে।

অন্যদিকে ডিটিসিএর সভার পরে গত ২৩ জুন ঈদে মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এবং রমজানে যানজট পরিস্থিতির উন্নয়নে রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ের আরেকটি বৈঠক হয়। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাসির, পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামানসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

হাইপ্রফাইল ওই বৈঠকেও ঈদে মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশ ও বহির্গমনে প্রচলিত রুটের বাইরে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা-সুলতানা কামাল সেতু-সিলেট রুট, বাবুবাজার ব্রিজ-ইকুরিয়া-পোস্তগোলা ব্রিজ-পাগলা-চাষাঢ়া-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড-সাইনবোর্ড-চট্টগ্রাম, গাবতলী-মাজার রোড-মীরের দৌড়-আশুলিয়া-ইপিজেড-চন্দ্রা হয়ে উত্তরবঙ্গ, রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু-জিঞ্জিরা-কেরানীগঞ্জ-মাওয়া, মিরপুর মাজার- ধৌউর-বিরুলিয়া-আশুলিয়া-মহাসড়ক-উত্তরবঙ্গ রুটসহ বিকল্প ১০টি রুট ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলেন, যানজট সমস্যা কেবল ঈদের সময় হয় এমন নয়। এটা সারাবছরই থাকে। তবে এ সময়ে একটু বেশি। সরকার এ সময়ে যানজট নিরসনে বিগত কয়েকবছর থেকে নানারকম নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো কম ব্যবহার করে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার। কিন্তু অন্য সময়েও যানজট থাকলেই চালকরা ওই বিকল্প পথগুলোই ব্যবহার করে। তাতে অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয় না। ঈদের সময়ে এসব বিকল্প পথ ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

বাংলাদেশ ট্রাক শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রায় রমেশ চন্দ্র ক্রাইম রেিপার্টার ২৪.কমকে বলেন, বিগত ৩০ বছর থেকে আমরা বলে আসছি ঢাকায় বাইপাস সড়ক দরকার। কিন্তু আমাদের কথা সেভাবে কেউ শুনছে না। মোটকথা ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হলে এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।

এছাড়া আন্তঃমন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে মগবাজার ফ্লাইওভারের কাজ ঈদের আগের সাত দিন ও পরের তিন দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে খোঁজ নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগে পরে ১০ দিন কাজ বন্ধ রাখলেও ফ্লাইওভার সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে যানজট কমবে না। কারণ প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে এবং যেভাবে রাস্তার ডিভাইডার কেটে রাখা হয়েছে তাতে কাজ বন্ধের সুফল পাওয়া যাবে না।

মগবাজার ফ্লাইওভারের কাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি ২৩ জুনের সভায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও সিডিএর আওতাধীন রাস্তাগুলো ১০ জুলাইয়ের মধ্যে মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা এবং কাটা রাস্তা মেরামত করার নির্দেশ দেয়া হয়।

সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা সূত্র জানায়, গত ২৮ মের ডিটিসিএর সভাতেও ওই নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে এখনো সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো অনেক এলাকায় রাস্তার মেরামত কাজ চলছে। অনেক এলাকার রাস্তা ভাঙাচোরাই রয়ে গেছে। ঈদের পরেও এসব রাস্তার মেরামত সম্ভব হবে না।

এছাড়া সভায় প্রতিবছরের মতো ঈদে যানজট ও মানুষের চাপ কমাতে একইদিন সব গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ছুটি না দিতে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে নির্দেশ দেয়া হয়। এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে বিজেএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে অন্য সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট সূত্র অবশ্য জানায়, তারা ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

সড়ক পরিবহন সচিব এম এ এন সিদ্দিক ক্রাইম রেিপার্টার ২৪.কমকে বলেন, একই সময়ে সব প্রতিষ্ঠান ছুটি দিলে মহাসড়ক ও পরিবহনে ব্যাপক চাপ পড়ে। তাই ঈদে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোকে ছুটি দিতে প্রতিবছর সরকারের নির্দেশনা থাকে। এবারো এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তুনতুন হাসানপ্রথম পাতা
ঈদে যানজট। রাজধানী থেকে সারাদেশের সড়ক মহাসড়ক জুড়ে থমকে থাকা হাজার হাজার গাড়ি। চরম দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ। আর ওই দুর্ভোগ নিরসনের কৌশল আবিস্কার নিয়ে বার বার হাইপ্রফাইল বৈঠক। বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের টেকসই নানা মতবাদ আসে। সরকারিভাবে নানা সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কমে না যানজট। কমে না ভোগান্তি। কারণ,...