4_288488
রাজধানী ঢাকার মহাখালী রেলগেট। এই গেট ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি দোকান। রেললাইন ঘেঁষে বিপজ্জনক স্থানে গড়ে ওঠা এসব দোকানে বিক্রি হচ্ছে ফল, পান-সিগারেট, চাসহ একাধিক ভাতের হোটেল। এছাড়া রেললাইনের পূর্ব পাশে আছে একটি সেলুনও। এগুলোর ঠিক ওপরেই মহাখালী ফ্লাইওভার। রেলগেট পার হয়ে উত্তর দিকে মোড় নিলেই চোখে পড়বে দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের অফিস। এর একটির সাইনবোর্ডে লিখা আছে-‘২০নং ওয়ার্ড ও বনানী থানা যুবলীগ’ আর অন্যটিতে আছে ‘ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ, বনানী থানা’। যুবলীগের সাইনবোর্ডের ওপরের একদিকে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আরেকদিকে যুবলীগ উত্তরের সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল ও সাধারণ সম্পাদক ঈসমাইল হোসেনের ছবি এবং নিচের বাম পাশে বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুকুল ইসলাম ফারুক ডান পাশে আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক জাকির হোসেন জাকিরের ছবিসহ নাম লেখা আছে। ছোট দুটি পাকা ঘরে গড়ে ওঠা এই অফিস দুটি ঘেঁষেই উত্তর-দক্ষিণে এবং পেছনে দোকানগুলোর অবস্থান। সবগুলো স্থাপনাই রেলের জমির ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। দোকানগুলো বসিয়েছেন অফিস দুটির নিয়ন্ত্রণকারীরা। অফেরতযোগ্য অগ্রিম টাকাসহ দৈনিক ভাড়াও দিতে হয় দোকানদারদের। এমন অবস্থা শুধু মহাখালীতে নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই সরকারি জমি দখল করে ক্ষমতাসীন দলের অফিস নির্মাণ করাটা যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর থেকেই শুরু হয়েছে তাদের এই তাণ্ডব। নব্বই দশকে এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যালয় অথবা নেতা-নেত্রীর নামে সরকারি জমিতে সাইনবোর্ড টানানোর হিড়িক পড়ে। ক্ষমতার পালাবদলে পাল্টে যায় সাইনবোর্ডের শিরোনামও।
রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত অধিদফতর, সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারের খাস জমি অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা হয় রাজনৈতিক কার্যালয়। এরপর আশপাশের জমির ওপর চোখ পড়ে নেতাকর্মীদের। এই জমি নিজেদের দখলে নিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয় দোকানপাট, ট্রাকস্ট্যান্ড, বাস কাউন্টারসহ অন্যান্য স্থাপনা। এসব স্থাপনা বিভিন্ন মেয়াদে মৌখিক চুক্তিতে ভাড়া দেয়া হয়। নেয়া হয় অফেরতযোগ্য মোটা অংকের অগ্রিম টাকা। এরপর যোগ হয় দৈনিক ভাড়া। তবে নেতাকর্মীরা তথাকথিত ভাড়াটিয়ার সঙ্গে সরাসরি লেনদেন করেন না। এক্ষেত্রে তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তি। এভাবেই রাজধানীসহ দেশজুড়ে নির্বিঘেœ চলছে সরকারি জমি দখল করে ক্ষমতাসীনদের অফিস নির্মাণ ও অবৈধ স্থাপনা ভাড়ার নামে চাঁদাবাজির মহোৎসব। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আবার গড়ে উঠেছে এগুলো। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় এগুলো নির্মিত হওয়ায় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে বাধ্য হন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক চাপে অসহায়ের কথা স্বীকার করেছেন কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে এবং ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে পাওয়া গেছে উল্লিখিত সব তথ্য।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দল ও এর সমর্থিত সংগঠনের অফিস গড়ে ওঠে সরকারি জায়গায়। অফিসের সামনে বড় সাইনবোর্ডে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছবিও সাঁটানো থাকে। দিনের বেলায় রাজনৈতিক কার্যক্রম চললেও অধিকাংশ অফিসে রাতভর চলে আড্ডা আর মাদক সেবনসহ নানা অপকর্ম। পাশাপাশি এসব অফিস থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে অফিস নির্মাণ করায় পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারি জমিতে গড়ে উঠা প্রায় সবগুলো অফিসেই রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। বিকাল হতেই বসে আড্ডা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতে থাকে বিভিন্ন অবৈধ কার্যকলাপের নানা প্রস্তুতি। রাত যতই ঘনিয়ে আসে, জমে উঠে মদ ও জুয়ার আসর। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজধানীর সরকারি জমির ওপর নির্মিত বিএনপি-জামায়াতের অফিসগুলো রূপান্তরিত হতে থাকে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন ও ‘দোকান’খ্যাত সরকার সমর্থক বিভিন্ন ভুইফোঁড় সংগঠনের নামে। এই প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত আছে। এ অবস্থা চোখে পড়ে রাজধানীর উল্লেখযোগ্য প্রায় সব এলাকায়। জমি দখল করে অফিস নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই সংগঠনের সংশ্লিষ্টরা। সরকারি দল ও সহযোগী সংগঠনের অফিসকে সামনে রেখে আশপাশের জায়গাও দখলে নেয় তারা। এসব জায়গায় গড়ে ওঠে দোকানপাট। এসব দোকানের ভাড়াও যাচ্ছে সংগঠনের নেতাদের পকেটে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সোমবার টেলিফোনে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, দলীয়ভাবে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অফিস করার সিদ্ধান্ত থাকলেও পাড়া-মহল্লায় অফিস করার কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা নেই। সরকারি জমির ওপর অফিস করার নির্দেশনা তো নেই বরং নিষেধাজ্ঞা আছে। খুব স্পষ্ট করে নির্দেশ আছে কোথাও অফিস করার প্রয়োজন হলে, হয় নিজস্ব জমিতে বা ভাড়া করা জমিতে অফিস করতে হবে। কোথাও যদি কেউ সরকারি জমি দখল করে অফিস করে থাকে সেটা বেআইনি এবং তারা তা নিজের সিদ্ধান্তে করেছে মন্তব্য করে হানিফ বলেন, দল তা সমর্থন করে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে রাজধানীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পর থেকেই যাত্রাবাড়ীতে সরকারি জায়গা দখলের মহোৎসব চলছে। যাত্রাবাড়ী থানাসংলগ্ন টিএন্ডটি অফিসের সামনে সরকারি জায়গা দখল করে আওয়ামী ওলামা লীগ ও থানা শ্রমিক লীগের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। জুরাইনের ডিআইটি প্লটসংলগ্ন সরকারি জমি দখল করে থানা আওয়ামী লীগের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। রায়েরবাগে সরকারি জায়গা দখল করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ এবং কদমতলী থানাধীন গীত ও সংগীত সিনেমা হলের সামনে সরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠেছে শ্রমিক লীগের কার্যালয়। একই থানায় মুরাদপুর রোডের মাথায় সরকারি জমিতে আওয়ামী লীগের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে।
গুলশান-২ নম্বর মোড়ে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ অফিস। গুলশানের পাশেই নতুন বাজার মোড়ের কাছে আমেরিকান দূতাবাসের সামনে সরকারি জায়গা দখল করে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের কার্যালয়ের জন্য পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কার্যালয়ের সামনে বড় ব্যানারও সাঁটানো হয়েছে। তাতে লেখা ‘১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ, গুলশান থানা, ঢাকা মহানগর আওয়ামী যুবলীগ উত্তর, সৌজন্যে মো. বাবুল মৃধা। এর পাশেই রয়েছে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস। ২৫ জুন রাত নয়টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, যুবলীগের অফিসে চলছে আড্ডাবাজি। তাতে যোগ দিয়েছেন একজন পুলিশও। উচ্চশব্দে টেলিভিশন চলছে। এই অফিস দুটির দু’পাশেই রয়েছে অনেকগুলো অস্থায়ী দোকান। স্থানীয়রা জানান, ওয়ার্ড যুবলীগ ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিস থেকে ভাগাভাগি করে এসব দোকান বসানো হয়েছে। আর ভাড়াও ভাগাভাগি করে নেয়া হয়।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশে ও টিএন্ডটি অফিসসংলগ্ন সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট দোকানঘর ও সরকারদলীয় অঙ্গ-সংগঠরের বিভিন্ন অফিস। জাতীয় শ্রমিক লীগ, মিরপুর থানা ছাত্রলীগ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংস্থার নামে পরপর তিনটি অফিস নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের নিচে সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, খিলগাঁও থানা কমান্ডের অফিস। খিলগাঁও রেলগেটসংলগ্ন রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে যুবলীগের অফিস। মালিবাগ রেলগেটসংলগ্ন রেলের জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মতিঝিল থানা কমান্ডের কার্যালয়। ঢাকা মহারনগর নাট্যমঞ্চের পেছনে আওয়ামী লীগ গুলিস্তান ইউনিটের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। পল্টন বক্স কালভার্ট রোডে সরকারি জায়গা দখল করে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন অফিস ঘর নির্মাণ করছেন। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের বাঁয়ে জায়গা দখল করে শেরেবাংলা নগর থানা শ্রমিক লীগের ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। আদাবরে শেখের টেকের দুই নম্বর রোডের ওপরেই মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের অফিস। আর শেখের টেকের ১৩ নম্বর রোডের ওপরে রয়েছে মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের অফিস। এর একটু দূরে শিয়া মসজিদের মোড়ে টেম্পোস্ট্যান্ডের পাশে রয়েছে স্থানীয় ওয়ার্ড ছাত্র লীগের অফিস।
সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি দখলে পিছিয়ে নেই ‘দোকান’ খ্যাত ভুইফোঁড় সংগঠনগুলোও। সেগুনবাগিচার কাঁচাবাজারের মুখেই রয়েছে বঙ্গবন্ধুর চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের অফিস। সরকারি জমির ওপর এটা নির্মাণ করা হয়েছে। শাহবাগে শিশু পার্কের জায়গায় ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ পার্ক এভিনিউ ইউনিট এবং বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার দীপিকার মোড়ে সরকারি কোয়ার্টারের জায়গায় গড়ে উঠেছে ২৪নং ওয়ার্ড যুবলীগের কার্যালয়। পাকা ভবনের এই অফিসের দু’পাশে নির্মাণ করা হয়েছে আরও দুটি দোকানঘর। এরমধ্যে একটি লোকমান মেডিসিন কর্নার ও অপরটি লেপতোষকের দোকান।
এছাড়া পলিটেকনিক পোস্ট অফিসের সামনে সরকারি জায়গায় পাকা ভবন করে গড়ে তোলা হয়েছে ১৫ নম্বর ইউনিট আওয়ামী লীগের কার্যালয়। বিটাকের মোড়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা ছাত্রলীগের অফিসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে একটি আধাপাকা ভবন। তবে ভবনের টিনের চালা এখনও লাগানো হয়নি। বিএসটিআইর মোড়ে এ্যালবাট ডেভিড অফিসের কোণায় ফুটপাতের ওপরে গড়ে তোলা হয়েছে জাতীয় শ্রমিক লীগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড অফিস। মাদকদ্রব্য অধিদফতরের বিপরীতে রাস্তার জায়গায় ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের অফিস গড়ে তোলা হয়েছে। মোটামুটি সবগুলো অফিসের কার্যকলাপ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে একই ধরণের চিত্র পাওয়া যায়। দিনব্যাপী আড্ডাবাজি, রাজনৈতিক কার্যকলাপের পাশাপাশি এসব অফিসে চলে জুয়ার আসর। আশপাশের দোকান থেকে চাঁদাবাজি, ভাড়া তোলা এসব কার্যালয়ের নিত্যদিনের কাজ।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে দলীয় কার্যালয় বানানো অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ। কাউকে সরকারি জমিতে কার্যালয় বানানোর অনুমতি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, এ রকম কোনো দৃষ্টান্ত পেলে সেই শাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এতদিন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ রকম খবর তার জানা ছিল না।
রাজধানীর বুকে সরকারি বিভিন্ন জায়গায় দলের কার্যালয় গড়ে তোলার বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম। তাদের অজান্তেই এসব কার্যালয় স্থাপিত হয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, দখলবাজরা যে দলের হোক না কেনো তা উচ্ছেদ করা হবে। বিভিন্ন জোন থেকে অভিযোগ পেলেই আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালাই।’ কিন্তু দখল করে গড়ে ওঠা ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর অফিসতো দীর্ঘদিন ধরে রয়েই গেছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ওইগুলোও উচ্ছেদ করা হবে।
এছাড়া ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামানের কাছে ফোনে রেলওয়ের জমি দখল করে অফিস করার বিষয়ে অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্টেটে অফিসে খোঁজ না নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
মহাখালীতে রেলওয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা যুবলীগের অফিস প্রসঙ্গে ২০ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন তার নিজস্ব এখতিয়ারে করেছেন বলে জানান ওই ওয়ার্ডের সভাপতি ও থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুকুল ইসলাম ফারুক। তিনি বলেন, জাকির ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং থানা যুবলীগের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক। ওয়ার্ডের সভাপতি হওয়ায় সাইনবোর্ডে তার নাম লেখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি (ফারুক) দাবি করেন, তিনি ওই অফিসে যান না, এবং এর সঙ্গে জড়িতও নন। জাকির কারও অনুমতি না নিয়েই নিজের এখতিয়ারে ওই অফিস গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে জাকিরের মন্তব্য চাইলে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকে লিজ নিয়ে ওই অফিস করা হয়েছে। কিন্তু জমি রেলওয়ের হওয়ায় তা সিটি কর্পোরেশন লিজ দিতে পারে না উল্লেখ করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এক পর্যায়ে জাকির বলেন, তিনি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অফিস গড়ে তুলেছেন। এরপর ফোন কেটে দেন। পরে বারবার ফোন করলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ বনানী থানার সভাপতি জালাল আহমেদের কাছে অফিস করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে, কারও অনুমতি বা লিজ নিয়ে অফিস করা হয়নি। তবে, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করে অফিস তৈরি করা হয়েছে। এখান থেকে দোকানের ভাড়া তোলা হয় এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন জালাল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় এ রকম অগণিত অফিস আছে, সেগুলো তুলে দেয়া হলে নিজেরটাও তুলে ফেলবেন। সরকারি জমিতে ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও সমমনা দলের অফিস নির্মাণের বিষয়ে রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বিভিন্ন ব্যুরো এবং জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো কয়েকটি প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ নিচে দেয়া হল-
নগরীর আমতলির দারুল ফজল মার্কেট দখল করে কার্যালয় হিসেবে গড়ে তোলে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ। ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। কোনো রকম ভাড়া ছাড়াই এখানকার একটি কক্ষে কার্যক্রম পরিচালিত হয় সংগঠনটির। একইভাবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় রয়েছে নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে দোস্ত বিল্ডিংয়ে। ভবনটি এক সময় সরকারি থাকলেও এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন। কিন্তু সরকারি থাকা অবস্থায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ একটি কক্ষ ভাড়া হিসেবে দখলে নিলেও পরে কোনো রকম ভাড়া ছাড়াই এখন পর্যন্ত কার্যক্রম চলছে। এই ভবনে রয়েছে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন- যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের দফতর। এসব কার্যালয়ও একইভাবে বছরের পর বছর ভাড়া ছাড়াই চলছে। এছাড়া জেলার মিরসরাই থানায় পৌর বাজারের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের ৩ তলাবিশিস্ট ভবন।
জেলা যুবলীগ খলিলগঞ্জ বাজারসংলগ্ন খলিলগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি দখল করে সাইনবোর্ড তুলেছে। গাইবান্ধা জেলা সদরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অফিস স্থাপন করা হয়েছে রেলওয়ের কাছ থেকে লিজ নেয়া জমির ওপর। ঠাকুরগাঁও জেলায় আওয়ামী লীগ অফিস সরকারি খাস জমিতে স্থাপন করা হয়েছে।
মহানগরী খুলনা ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিন দেখা যায়, মহানগরী খুলনার পিটিআই মোড়ে কেসিসির জমির ওপর অবৈধভাবে ২৭নং ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের আধা-পাকা অফিস, রূপসায় এলজিইডির অফিসের সামনে ২৯নং যুবলীগের অফিস, সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের নতুন সেতু এলাকায় কেডিএ’র জায়গা দখল করে ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী যুবলীগের সাংগঠনিক নামের এক অফিস গড়ে তোলা হয়েছে। জোড়াগেট রেল ক্রসিংয়ের পাশে রেলওয়ের জমির ওপর ২১নং শ্রমিক লীগ, ২১নং ওয়ার্ড যুবলীগ ইউনিট অফিস, নগরীর বয়রা বৈকালী মোড়ে সড়ক ও জনপথের (সওজ) ১৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, মহিলা লীগ, যুবলীগ ও স্বোচ্ছাসেবক লীগের আধা-পাকা অফিস গড়ে তোলা হয়েছে। খুলনা রেলস্টেশনের পানির ট্যাংকির পাশে রেলওয়ের জায়গায় ২১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস। নগরীর খালিশপুরে রেলওয়ে ও বিআইডসির জমির ওপর ১৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের পাকা অফিস গড়ে উঠেছে।
এছাড়া জেলার রূপসা উপজেলায় খোড়ার বটতলায় রেলওয়ের জমির ওপর নৈহাটি ইউনিয়ন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিস, পাইকগাছা উপজেলার সওজের জমিতে জিরো পয়েন্টে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, পাইকগাছার সোলাদানায়র আমুড়কাটয় খাস জমির ওপর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিস, দেলুটি দারুল মল্লিক এলাকায় পাউবোর জমির ওপর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিস করা হয়েছে। কয়রা উপজেলার বেদকাশী খাল ভরাট করে সরকারি খাস জমিতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিস, তেরখাদা উপজেলায় কালিয়া চিত্রা সেতুর গোড়ায় পাউবোর জমির ওপর আওয়ামী লীগ অফিস। বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা চক্রাখালি সওজের জমির ওপর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, বটিয়াঘাটা পুরনো ফেরিঘাটসংলগ্ন পাউবোর জায়গা দখল করে উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিস, সাচিবুনিয়ায় সৈয়দ ট্রাস্টের জমি দখল করে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিস ও বালিয়াডাঙ্গা এলজিইডির জায়গা দখল করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিস করা হয়েছে। জেলার ডুমুরিয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে চৌরঙ্গী নামক স্থানে সওজের জমিতে আওয়ামী লীগের অফিস ও খর্নিয়া সেতুর নিচে মরা গ্যাংরাইল নদীর চরে আওয়ামী লীগ অফিস নির্মাণ করা হয়েছে।
রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন স্থানে সরকারি জমি দখল করে করা হয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। এসব কার্যালয় হল- ওয়ার্ড শাখা আওয়ামী লীগের। ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস করা হয়েছে নগরীর বন্ধগেট এলাকায় রেলওয়ের জমিতে। রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের পাশে সড়ক ও বিভাগের জমিতে রয়েছে ১৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়। উপশহরে সরকারি জমি দখল করে করা হয়েছে ১৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়। এছাড়া, নগরীর বিনোদপুরে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের পাশে সড়ক বিভাগের জমিতে রয়েছে ৩০নং আওয়ামী লীগের কার্যালয়। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় রয়েছে নগরীর কুমারপাড়ার সরকারি জমিতে। তবে এটি স্থায়ীভাবে লিজ নেয়া।
দক্ষিণের তিন জেলায় সরকারি জমি ও ভবন দখল করে কার্যক্রম চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বরিশালে সিটি কর্পোরেশনের ভবন, পটুয়াখালীতে খাস জমি ও ঝালকাঠিতে টাউন হল দখল করে চলছে কার্যক্রম। বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে বিবির পুকুর পাড়ে সিটি কর্পোরেশনের এনেক্স ভবন অবস্থিত। এই ভবনেরই নিচ তলায় একটি অংশে কার্যক্রম চলছে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের।

তুনতুন হাসানজাতীয়
রাজধানী ঢাকার মহাখালী রেলগেট। এই গেট ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি দোকান। রেললাইন ঘেঁষে বিপজ্জনক স্থানে গড়ে ওঠা এসব দোকানে বিক্রি হচ্ছে ফল, পান-সিগারেট, চাসহ একাধিক ভাতের হোটেল। এছাড়া রেললাইনের পূর্ব পাশে আছে একটি সেলুনও। এগুলোর ঠিক ওপরেই মহাখালী ফ্লাইওভার। রেলগেট পার হয়ে উত্তর দিকে মোড় নিলেই চোখে পড়বে...