pic-077777_240712

শুধু মাথাপিছু জাতীয় আয় বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঠাঁই দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্বীকৃতি দেবে জাতিসংঘ। তার আগে জাতিসংঘের বোর্ড সভায় এটি অনুমোদিত হতে হবে। এই বিরাট স্বীকৃতি পাওয়া থেকে এখন সামান্য দূরে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া তিনটি সূচকের মধ্যে একটির নির্দিষ্ট মান অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ, বাকি দুটিও নিঃশ্বাস-দূরত্বে। মাথাপিছু আয় আরো বাড়িয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে সামান্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হলেই জাতিসংঘের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে বাংলাদেশ। সে জন্য আরো তিন-চার বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩১৪ ডলার। পর পর তিন বছর মাথাপিছু আয়ের গড় এক হাজার ৪৫ ডলার হলেই বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে তা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ৯২৬ ডলার। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় আয়ের এ হিসাব করেছে জাতিসংঘ। ব্যক্তির গড় বার্ষিক আয় (জিএনআই) থেকে কর পরিশোধ ও অবনমন (ডেপ্রিসিয়েশন) বাদ দিয়ে বাকি অর্থ ব্যক্তি কেনাকাটা ও বিনিয়োগে ব্যয় করতে পারে বলে জাতিসংঘ এভাবে হিসাব করে। এ হিসাবে মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ৯২৬ ডলার থেকে এক হাজার ১৯০ ডলারে উন্নীত হতে হবে। তবে সর্বনিম্ন মাথাপিছু আয়ের এ অঙ্ক প্রতিবছরই বাড়িয়ে নির্ধারণ করে জাতিসংঘ।

এবার জাতিসংঘের স্বীকৃতির অপেক্ষা

জাতিসংঘের বাকি দুই সূচকের একটি হলো মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই)। এ সূচকে ন্যূনতম ৬৬ বা তার বেশি অর্জন করতে হবে বাংলাদেশকে। মূলত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নকে মূল্যায়ন করে জাতিসংঘ। এসব ক্ষেত্রে যত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে বাংলাদেশের অবস্থানও তত বাড়বে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৩.৮-এ। অর্থাৎ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশকে আর মাত্র ২.২ পয়েন্ট এগোতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশের অভিধা থেকে মুক্তি পেতে তৃতীয় শর্ত অর্থনৈতিক সংকট সূচক (ইভিআই)। এটা নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন, পণ্য ও সেবা রপ্তানি, প্রচলিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও জিডিপিতে সম্পূর্ণ পণ্য উৎপাদন ও আধুনিক সেবার অংশীদারত্ব ও ছোট অর্থনীতির প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর। তবে শর্তটি বেশ ভালোভাবেই উত্তরণ করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শর্ত অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে ৩২ বা তার চেয়েও কম অবস্থানে থাকতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫ দশমিক ১-এ।

১৯৭১ সাল থেকে জাতিসংঘ বাংলাদেশসহ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আলাদা তালিকায় রেখেছে, যারা এলডিসি হিসেবে পরিচিত। এসব দেশ নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান আংকটাডের নেতৃত্বে সম্মেলন হয়েছে। সর্বশেষ ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এলডিসির অভিধা থেকে বের হওয়ার জন্য কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় পায় দেশগুলো। ২০২০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের সংখ্যা ৪৮ থেকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার চিন্তা করছে। বাংলাদেশও ওই সময়ের মধ্যে এলডিসির খোলস ছেড়ে বের হওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায়, নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে, যে তালিকায় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনামসহ ৫১টি দেশ। ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশ্বব্যাংক গত বুধবার রাতে সারা বিশ্বে একযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। স্বাধীনতার পর গত ৪৪ বছর বাংলাদেশ ছিল নিম্ন আয়ের দেশের তালিকায়। যেখানে রয়েছে উগান্ডা, সিয়েরালিওন, মালিসহ ৩০টি দেশ। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার কথা এত দিন সরকারের নীতিনির্ধারকরা মুখে মুখে বললেও এই প্রথম একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে এ স্বীকৃত মিলল। এর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলো হলো- নিম্ন আয়ের দেশ, নিম্ন মধ্যম আয়ের, উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং উচ্চ আয়ের দেশ। যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। জাতীয় আয় এক হাজার ৪৬ ডলার থেকে চার হাজার ১২৫ ডলারের মধ্যে হলে সেসব দেশকে বলা হয় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এত দিন বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল এক হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে দেশের এখন মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৩১৪ ডলার। এ ছাড়া যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় চার হাজার ১২৬ ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলারের মধ্যে সেসব দেশকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। আর যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলারের বেশি, সেসব দেশকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ, যে তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ ৮০টি দেশ।

বিশ্বব্যাংক এটলাস মেথড নামের পদ্ধতিতে মাথাপিছু জাতীয় আয় পরিমাপ করে থাকে। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় জিএনআই মার্কিন ডলারে রূপান্তর করা হয়। এ ক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়, যাতে করে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠা-নামা সমন্বয় করা সম্ভব হয়। পর পর তিন বছর যদি একটি দেশের জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলারের বেশি হয়, তাহলে ওই দেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশসহ কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান গত ১ জুলাই থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৪৫ ডলারের বেশি। ১ জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত একজন মানুষের মাসিক আয় ছিল সাত হাজার টাকার কম। এখন তা সাত হাজার টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।

কংকা চৌধুরীশেষের পাতা
শুধু মাথাপিছু জাতীয় আয় বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঠাঁই দিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্বীকৃতি দেবে জাতিসংঘ। তার আগে জাতিসংঘের বোর্ড সভায় এটি অনুমোদিত হতে হবে। এই বিরাট স্বীকৃতি পাওয়া থেকে এখন সামান্য দূরে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া তিনটি সূচকের মধ্যে একটির নির্দিষ্ট মান অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ,...