3_287040
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে বলিভিয়া থেকে আমদানি করা সূর্যমুখী তেলের ড্রামে কোকেন পাওয়ার ঘটনায় কসকো শিপিং লাইনের ম্যানেজার এ কে আজাদ ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা এবং তদন্ত অধিদফতর। মঙ্গলবার তাদের গ্রেফতার করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, গ্রেফতারকৃতরা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী দলের সদস্য। ইতিমধ্যে এ চক্রের সঙ্গে জড়িত ইংল্যান্ডের বকুল ও ভারতের রাজু নামের দু’জনের কথাও জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। মঙ্গলবার ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া তিনজন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে- চট্টগ্রাম বন্দরে তেলের আড়ালে আমদানি করা ‘তরল কোকেনের’ চালানটি ভারতে রি-শিপমেন্ট করার চেষ্টা চলছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অবস্থানরত এজেন্টদের মাধ্যমে এ কোকেন পাচারের চেষ্টা করা হয়।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরে গুলশান থেকে গ্রেফতার হওয়া আজাদ কসকো শিপিং বাংলাদেশের ম্যানেজার। ভোজ্যতেলের কনটেইনারে কোকেন রি-এক্সপোর্টে তার সম্পৃক্ততা থাকায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। ড. মঈনুল খান আরও জানান, এর আগে সকালে মোস্তফা কামাল ও তার ভাতিজা আতিকুর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয়। আতিকুর উত্তরায় মণ্ডল গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাকে মণ্ডল গ্রুপের অফিস থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুলশান-১ থেকে মোস্তফাকে গ্রেফতার করা হয়। মোস্তফার তথ্যে গ্রেফতার করা হয় এ কে আজাদকে। শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক আরও জানান, এ চোরাচালানের সঙ্গে ইংল্যান্ডের বকুল ও ভারতে রাজুসহ আরও কয়েকজন জড়িত। তারা আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের সদস্য। তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তাদের দেশীয় এজেন্টদের সবাইকে গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ড. মঈনুল খান বলেন, কোকেন চালান পাচারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের এদেশীয় এজেন্ট জড়িত। তা না হলে কোকেনের এত বড় স্পর্শকাতর চালান চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস বা ভারতের উদ্দেশে রি-শিপমেন্ট করার চেষ্টা করতে পারত না। লোভের বশবর্তী হয়েই তারা কোকেন চালানের মতো এত বড় একটি চালান খালাস বা রি-শিপমেন্ট করার ঝুঁকি নিয়েছিল। চালানটি উত্তর আমেরিকার একটি দেশে নেয়ার চেষ্টা চলছিল বলে তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ এসেছে।
গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবদ, শিপিং লাইনসহ দেশ-বিদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে সংগৃহীত কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পুরো চালানটির উৎস ও গন্তব্য নিশ্চিত করতে এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশী-বিদেশী চক্রকে তারা ধরতে পারবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম বন্দরে তেলের আড়ালে কোকেন চালান পাঠানোর ঘটনায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নাগরিক ফজুল রহমান, বকুল মিয়া ছাড়াও রাজু নামে ভারতীয় এক নাগরিকের নামও তারা জানতে পেরেছেন।
সূত্র জানায়, সানফ্লাওয়ার অয়েলের কথা বলে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে চট্টগ্রামের খানজাহান আলী লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেলের কন্টেইনার আমদানি করে। ৭ জুন চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইয়ার্ডে থাকা ওই কনটেইনার সিলগালা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। পরদিন ৮ জুন কাস্টমস, নৌবাহিনী, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর, ডিবি পুলিশ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই তেল পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় কনটেইনারের ড্রামে তরল কোকেন থাকলেও সেটা শনাক্ত করা যায়নি।
পরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর ভোজ্যতেলের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় বিসিএসআইআর ও বাংলাদেশ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠায়। পরীক্ষার ফলাফলের পর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর জানায়, কনটেইনারের ৯৬ নম্বর ড্রামে তরল কোকেন ছিল। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়।
কোকেন চোরাচালানের সঙ্গে ইতিপূর্বে গ্রেফতার হওয়া খানজাহান আলী লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান প্রাইম হ্যাচারির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেলকে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। নগর গোয়েন্দা পুলিশ ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া তিনজনকে আজ চট্টগ্রামে নিয়ে আসার কথা। মঙ্গলবার রাতেই তাদের নিয়ে চট্টগ্রামে উদ্দেশে রওযানা হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। চট্টগ্রামে পৌঁছার পর এ তিনজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আজ আদালতে তোলা হবে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি সোমবার থেকেই তদন্ত কাজ শুরু করেছে। প্রথম দিনে যে শিপিং লাইনের মাধ্যমে কনটেননারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসে সেই আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন কসকো শিপিংয়ের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ অফিসে অভিযান চালিয়ে তেলের নামে কোকেন চালান আমদানির সব কাগজপত্র জব্দ করা হয়। ওই অফিসের কম্পিউটারে রক্ষিত এ সংক্রান্ত ডাটা ও হার্ডডিস্কও জব্দ করা হয়। অভিযানে ব্যস্ত থাকায় কসকো শিপিং থেকে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্র বা কম্পিউটার ডাটা যাচাই-বাছাই করার সুযোগ হয়নি বলে তদন্ত সংশ্লিস্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিন পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল মঙ্গলবার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বন্দরে কোকেন চালান আটকের ঘটনায় দায়ের করা মাদকদ্রব্য ও চোরাচালান আইনের মামলাটি তদন্ত করবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির সহকারী কমিশনার কামরুজ্জামানকে মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে গ্রেফতার হওয়া প্রাইম হ্যাচারির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেলকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়ার কথা উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাজধানী থেকে গ্রেফতার হওয়া অন্য তিনজনকেও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার এসএম তানভীর আরাফাত মঙ্গলবার বিকালে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, কোকেন চালান আমদানির সঙ্গে জড়িত ও ঢাকায় গ্রেফতার হওয়াদের আনতে তিনি ঢাকায় রয়েছেন। রাতে অথবা বুধবার সকালে তাদের নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছবেন বলেও জানান।
চট্টগ্রামে গ্রেফতার প্রাইম হ্যাচারির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেলকে মঙ্গলবার চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদ আলমের আদালতে তুলে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। আদালত শুনানি শেষে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাকে আজ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে সানফ্লাওয়ার তেলের নামে আমদানি করা একটি চালানে কোকনে আছে সন্দেহে ১০৭টি ড্রাম জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদঢতর এবং পুলিশ। এসব ড্রাম থেকে তেলের নমুনা নিয়ে ঢাকার দুটি ল্যাবে পরীক্ষার করা হয়। এর মধ্যে একটি ৯৬ নম্বর ড্রামে কোকেনের অস্তিত্ব রয়েছে বলে ধরা পড়ে পরীক্ষায়। আর কোকেনের অস্তিত্ব ধরা পড়ার পরই সারা দেশে হৈচৈ পড়ে যায়। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। দেশী-বিদেশী মাফিয়া চক্রকে খুঁজে বের করতে শুরু হয় তদন্ত। কোকেনের পরিমাণ ও দাম নির্ধারণ এবং তদন্তে সহায়তা করতে আহ্বান জানানো হয় জাতিসংঘকে। মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তা ড. মঈনুল খান বলেন, খুব শিগগিরই ব্রিটিশ-আমরিকার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলও আসবে।

ওয়াজ কুরুনীচোরাচালানের খবর
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে বলিভিয়া থেকে আমদানি করা সূর্যমুখী তেলের ড্রামে কোকেন পাওয়ার ঘটনায় কসকো শিপিং লাইনের ম্যানেজার এ কে আজাদ ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা এবং তদন্ত অধিদফতর। মঙ্গলবার তাদের গ্রেফতার করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, গ্রেফতারকৃতরা আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী দলের সদস্য। ইতিমধ্যে এ চক্রের...