1_283467
এই বাংলাদেশকে আগে দেখেনি ভারত। ক্রিকেটবিশ্ব কি দেখেছে? এমন আবেগমাখা, অকুতোভয় লাল-সবুজ সেনানীদের কে কবে দেখেছে? এমন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ক্রিকেট?
আর মুস্তাফিজ? ঈদের চাঁদরাতের আগে যিনি পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে উদ্ভাসিত বাংলাদেশের ক্রিকেট-আকাশে। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের তেঁতুলিয়া গ্রামের ১৯ বছরের হালকা-পাতলা গড়নের লাজুক ছেলেটি ধ্রুবতারা হয়ে আবির্ভূত হল মিরপুরে। শেরেবাংলায় আরেক বাঘের গর্জন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হুংকার। এই বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ নয়। সাহস-সামর্থ্য, আÍবিশ্বাস-অহংবোধের একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ। আকাশ ছোঁয়ার অভিযাত্রায় যারা অগ্রসরমাণ খরস্রোতা নদীর মতো। এজন্যই তো প্রথম ওডিআই জিতেও কোচ হাথুরুসিংহে বলেন, তিনি পুরোপুরি খুশি হতে পারেননি। দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজার উচ্চারণ, এটাই তাদের সেরা পারফরম্যান্স নয়। নিজেদের ক্রমশ ছাড়িয়ে যাওয়ার নেশায় বুঁদ বাংলাদেশ এখন নিজেদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী। আর ভারত? বিশ্বকাপে তারা যা ছিল, আজও তাই আছে। নাকি বদলে গেছে?
আরে, বদলে তো গেছে বাংলাদেশ। টাইগারদের রূপান্তরেই বিবর্ণ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন-আপের দল। পরপর দুই ম্যাচে ধোনিরা কেমন গুটিয়ে গেলেন লাল-সবুজের ক্রিকেটীয় শৌর্য-সামর্থ্য-আত্মবিশ্বাসের ধাক্কায়। পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় একটা কথাই বারবার লেখা হচ্ছে-
পদ্মাপাড়ে ধুলায় মিশে গেল ভারতের মান-সম্মান। এতদিনে তিলে তিলে গড়ে তোলা দর্প চূর্ণ করে দিল এক নবাগত টাইগার। যার বিষাক্ত অফ-কাটার, স্লে­ায়ার ডেলিভারি যখন-তখন ছোবল মেরেছে রোহিত শর্মাদের।
কথাটা আংশিক সত্যি।
প্রথম দুটি ওডিআই জিতে বাংলাদেশ তাদের ইতিহাসে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে। বাকি রইল এক। আজ সেই মহারণ। মাশরাফিরা আজও জিতলে ভারতকে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশ করার উৎসবে মাতবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। আজই হয়ে যাবে চাঁদরাত। আর ভারত সিরিজ হারানোর পর সম্ভ্রমও হারিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে ফিরে যাবে। এই দৃশ্যটা একসময় কল্পনায়ও ভিড় করতে সাহস পেত না। কিন্তু এই বাংলাদেশ তো সেই বাংলাদেশ নয়। একসময় এমন উৎসবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও হয়তো মন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগত। মনের সঙ্গে মস্তিষ্কের লড়াই চলত। মন বলত সম্ভব, মস্তিষ্ক বলত না। এখন মন ও মস্তিষ্ক দুইয়েরই একই অভিমত, পারবে বাংলাদেশ, পারবে। ৭৯ রান ও ছয় উইকেটের জয়ের পর এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।
একেবারে কাছেপিঠে পাকিস্তানকে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার নজির জ্বলজ্বল করছে। ভারতকে এই প্রথম হোয়াইটওয়াশ করার ‘মওকা’। বাংলাদেশ এর আগে দশবার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করেছে। এর মধ্যে এ বছর পাকিস্তানকে। এও এক দুর্লভ অর্জন হবে যে, পরপর দুটি সিরিজে উপমহাদেশের দুই জায়ান্টকে হোয়াইটওয়াশ করবে বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন পূরণ থেকে মাত্র একটি জয় দূরে মাশরাফিরা।
এছাড়া বাংলাদেশ কেনিয়া (২০০৬), জিম্বাবুয়ে (২০০৬-২০১৪) ও নিউজিল্যান্ডকে (২০১০ ও ২০১৩) দু’বার করে হোয়াইটওয়াশ করেছে। বাকি চারটির মধ্যে স্কটল্যান্ড (২০০৬), আয়ারল্যান্ড (২০০৮), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২০০৯) এবং পাকিস্তান (২০১৫) একবার করে ধবলধোলাই হয়েছে টাইগারদের হাতে।
সামর্থ্য আত্মবিশ্বাসের জ্বালানি সরবরাহ করে। আত্মবিশ্বাস জোগায় সাহস। এজন্যই কাল সংবাদ সম্মেলনে আসা নাসির হোসেন ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নে তাৎক্ষণিক উত্তর দেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা হোয়াইটওয়াশ করব ভারতকে।’ সাফল্য কখনও কখনও আÍতুষ্টির বীজ বপন করে। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটতে নারাজ। বরং মঙ্গলবার অনুশীলনের আগে টিম মিটিংয়ে অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজা সতীর্থদের একটি মূল্যবান বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘প্রথম দুটি ম্যাচে আমরা হেরে গেছি, যেন এমনটা ভেবে শেষ ওডিআইতে আমরা মাঠে নামি।’ অর্থাৎ আÍতুষ্টিকে একপাশে সরিয়ে রেখে এটিকে আরেকটি ম্যাচ হিসেবে মনে করে যেন খেলা হয়। এটাই রূপান্তরিত বাংলাদেশের নতুন সংস্করণ। প্রাক-ম্যাচ কথোপকথনে নাসিরের উচ্চারণেও তা প্রতিধ্বনিত হয়, ‘আমাদের একটাই চিন্তা, জিততে হবে। আমরা জেতার জন্যই খেলব।’ সিরিজ যদি ২-০ করা যায়, তাহলে ৩-০ও করা সম্ভব। এই মনোভাব এখন টাইগারদের। তাই নাসির বলেন, ‘আমরা যেভাবে খেলে এসেছি, সেভাবে খেলতে পারলে সিরিজের শেষ ম্যাচেও ভারতকে হারানো সম্ভব।’ ভারত যে মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করবে, তা বিলক্ষণ জানা আছে টাইগারদের। সে সম্পর্কে নাসির বলেন, ‘আমরা জানি ওরা সর্বোচ্চ আক্রমণ করবে আমাদের ওপর। সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমরা কী করব, সেটাই আসল।’ দলের তরুণ তুর্কি, নিজের প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নেয়া মুস্তাফিজুর সম্পর্কে নাসিরের মন্তব্য, ‘নেটে ওর বল খেলতে আমাদের সমস্যা হয়। আমি দুষ্টুমি করে ওকি বলি, আমাকে কাটার মারবি না।’
হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো মুস্তাফিজুরকে পেয়ে স্বাগতিকরা যেমন আনন্দে উদ্বেল, প্রতিপক্ষ তেমনি আতংকিত। অশ্বিনের কথায় তা স্পষ্ট, ‘আমরা যদি মুস্তাফিজকে খেলতে না পারি, তাহলে আমাদের কী করার আছে? আমরা কী ওকে অপহরণ করব?’ সবকিছু মিলিয়ে এক ঐতিহাসিক অর্জনের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকে ৫-০ এবং পাকিস্তানকে ৩-০তে হোয়াইটওয়াশ করার চেয়েও বড় অর্জনের হাতছানি মাশরাফিদের সামনে। আজ ভারতকে ধুয়ে দিলে (পড়ুন ৩-০তে হারালে) ক্রিকেটবিশ্ব কুর্নিশ করবে লাল-সবুজ সেনানীদের। ধোনি স্বীকার করেছেন, তাদের একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে বাংলাদেশ। জোড়া হার ভারতের জন্য এমনই এক বিরাট ধাক্কা যে, ধোনির সিংহাসন টলে গেছে। অভিমানে তিনি বলেই ফেলেছেন, ‘আমাকে দিয়ে না চললে, বাদ দিয়ে দিক।’ নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত পরাজয়ের জ্বালা সইতে না পেরে।
ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের দুই নম্বর দলের এই দুরবস্থা করার কৃতিত্ব বাংলাদেশের। ‘মিরপুর স্টেডিয়ামে ওদেরই কর্তৃত্ব’, অশ্বিনের এহেন উচ্চারণে অসহায়ত্বই ফুটে ওঠে। নিজেদের মাঠে বাংলাদেশের ওডিআইতে টানা ১১তম জয় রুখতে যেন অপারগ ভারত। কোনো সন্দেহ নেই, আজও মিরপুরের গ্যালারি থাকবে জনাকীর্ণ। শব্দের গর্জন, রঙের বাহার আর উচ্ছ্বাসের ঢেউয়ে দর্শকরা মাতিয়ে রাখবেন গোটা ম্যাচ। বৃষ্টির হুমকি উপেক্ষা করে গ্যালারিজুড়ে থাকবে লাল-সবুজের উদ্দামতা। সেটি উৎসবে রূপ নেবে মাশরাফিরা আরেকটি মহাকাব্য রচনা করলে। তারপর? তারপর কী হবে কল্পনা করে নিন। টিএসসি চত্বর উল্লাসে ফেটে পড়বে। গোটা বাংলাদেশ উৎসবে মেতে উঠবে। সেই উৎবের রং হবে শুধুই লাল-সবুজ।

তাহসিনা সুলতানাখেলাধুলা
এই বাংলাদেশকে আগে দেখেনি ভারত। ক্রিকেটবিশ্ব কি দেখেছে? এমন আবেগমাখা, অকুতোভয় লাল-সবুজ সেনানীদের কে কবে দেখেছে? এমন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ক্রিকেট? আর মুস্তাফিজ? ঈদের চাঁদরাতের আগে যিনি পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে উদ্ভাসিত বাংলাদেশের ক্রিকেট-আকাশে। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের তেঁতুলিয়া গ্রামের ১৯ বছরের হালকা-পাতলা গড়নের লাজুক ছেলেটি ধ্রুবতারা হয়ে আবির্ভূত হল মিরপুরে। শেরেবাংলায় আরেক...