শিরোনাম

পুণ্যময় হজ

9eb65ec7b5816a463c356b401fae4580-3
হজ একটি পুণ্য ও স্মৃতিময় ইবাদত। হজের প্রতিটি কর্মে রয়েছে বিভিন্ন পুণ্যময় স্মৃতি। তাই হজের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতায় সে স্মৃতি মানসপটে জাগ্রত হলে হজের উদ্দেশ্য অনুধাবন সম্ভব হবে এবং লক্ষ্যপূরণ সহজ হবে।
হজের কর্মসীমাকে হারাম শরিফ বলে। হারাম শরিফের সীমা বায়তুল্লাহর পূর্বে জেরুজালেমের পথে নয় মাইল, পশ্চিমে জেদ্দার পথে শুআইদিয়া পর্যন্ত দশ মাইল, উত্তরে মদিনা শরিফের পথে পাঁচ মাইল এবং দক্ষিণে তায়েফের পথে সাত মাইল। এই পবিত্র এলাকায় কিছু বিধিনিষেধ আছে। মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফে অমুসলমানদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হারাম শরিফের মধ্যে নাপাক অবস্থায় প্রবেশ করবেন না। এখানে জীবজন্তু শিকার করা নিষিদ্ধ। এমনকি গাছপালা, তৃণলতা ইত্যাদি ছেঁড়াও নিষেধ। এখানে কোনো জিনিস পড়ে থাকলেও মালিকের কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্য ছাড়া স্পর্শ করবেন না। হারাম শরিফের সীমার ভেতর ঝগড়া–বিবাদ, মারামারি—সবই নিষেধ। হারামের প্রাণকেন্দ্র হলো মসজিদুল হারাম, এর কেন্দ্রস্থলে কাবা শরিফ অবস্থিত। পবিত্র কাবাগৃহের দৈর্ঘ্য ২৪ হাত এবং প্রস্থ ২০ হাত। হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে কাবাগৃহের সৃষ্টি। নূহ নবীর (আ.) সময় মহাপ্লাবনের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-সহ এর পুনঃসংস্কার করেন। এযাবৎ কাবা শরিফ দ্বাদশবার সংস্কার করা হয়েছে।
কাবা শরিফের উত্তর পাশের অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থানকে ‘হাতিম’ বলা হয়। এই স্থানটুকু আগে কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে নামাজ পড়া মানে কাবাঘরের ভেতরে নামাজ পড়া। দোয়া কবুলের জন্য হাতিম উত্তম স্থান। হাতিমের ঠিক ওপরে কাবা শরিফের ঘরের ছাদের সঙ্গে একটা সোনার পরনালা আছে। বৃষ্টির সময় এই পরনালা দিয়ে ছাদের পানি পড়ে। সে জন্য এর নাম মিজাবে রহমত। মিজাবে রহমতের নিচে নামাজ পড়ে দোয়া করলে তা কবুল হয়।
হাজরে আসওয়াদ মানে কালো পাথর, এটি একটি স্বর্গীয় পাথর। হজরত আদম (আ.)–এর সময় এটি আনীত হয়। এই পবিত্র পাথরের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি ও প্রস্থ ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে এটি আট টুকরো। এটি মাটি থেকে চার ফুট ওপরে কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দেয়ালের বহির্দিকে প্রোথিত। এই পবিত্র প্রস্তরখণ্ডকে নবী করিম (সা.) অত্যন্ত বিনয় ও মহব্বতের সঙ্গে চুেমা দিতেন। নবী করিম (সা.)-এর সময়ে তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির অল্পকাল আগে কাবাঘরের সংস্কার করা হয়। সে সময় হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। নবী করিম (সা.) এর সুন্দর সমাধান দেন এবং হাজরে আসওয়াদকে স্থাপন করেন। হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করে আবার হাজরে আসওয়াদে শেষ করতে হয়।
হাজরে আসওয়াদ ও কাবাঘরের দরজার মধ্যবর্তী স্থানটুকু মুলতাজিম নামে পরিচিত। এখানে দোয়া কবুল হয়। কাবা শরিফের পূর্ব দিকে মাকামে ইব্রাহিমে যে প্রস্তরখণ্ড রক্ষিত আছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘরের প্রাচীর গাঁথতেন। হজরত ওমর (রা.) প্রথম এখানে নামাজ পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। এই পবিত্র স্থানের পেছনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক প্রকার তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। এই নামাজ ওয়াজিব।
পবিত্র কাবাঘরের পূর্ব দিকে মসজিদুল হারাম শরিফের চত্বরেই জমজম কূপ অবস্থিত। এর গভীরতা ৬০ গজ ও এর মুখের বিস্তার ৪ গজ। কিন্তু বর্তমানে তাওয়াফের জায়গা সম্প্রসারণের কারণে জমজম কূপ দেখা সম্ভব নয়। তবে হারাম শরিফের সর্বত্রই জমজমের পানি রাখা থাকে। জমজম দোয়া কবুলের একটি স্থান। জমজমের পানি পান করার পরও দোয়া করা যায়। শিশু হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পদাঘাতে মরুভূমিতে এই কূপের সৃষ্টি হয়।
মসজিদুল হারাম শরিফ–সংলগ্ন পূর্ব দিকে সাফা ও মারওয়া পাহাড় অবস্থিত। এই দুই পাহাড়ের মধ্যস্থলে নির্বাসিত বিবি হাজেরা (আ.) তদীয় শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-এর পানীয়ের অনুসন্ধানে অতি ব্যস্ততাসহকারে ছোটাছুটি করছিলেন। সেই স্মৃতি রক্ষার্থে হাজিদের এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাত চক্কর দৌড়াদৌড়িকে সায়ি বলা হয়। সায়ি করা ওয়াজিব।
মসজিদুল হারাম শরিফ থেকে আধা মাইল পূর্ব-উত্তর দিকে মিনার রাস্তার পাশের পবিত্র গোরস্তান জান্নাতুল মুআল্লায় বহু দিনদার মুসলমান ও শহীদের মাজার আছে। রাসুলে করিম (সা.)-এর কয়েকজন সাহাবি এবং তাঁর পূর্বপুরুষের মাজার এখানে রয়েছে। উম্মুল মুমিনিন খাদিজাতুল কুবরা (রা.), নবীজির দুই পুত্র হজরত কাছেম (রা.) ও হজরত আবদুল্লাহ (রা.), নবীজির প্রিয় সাহাবি আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের (রা.), হজরত আয়েশা (রা.)-এর জ্যেষ্ঠ ভগ্নি আসমা (রা.), নবীজির চাচা আবু তালিব, দাদা আবদুল মুত্তালিব, পরদাদা আবদে মান্নাফ প্রমুখের মাজার শরিফ এখানে রয়েছে।
হজরত বেলাল (রা.)-এর আজানধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল মসজিদে বেলাল থেকে। কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) এখানে প্রথমবারের মতো হজের আহ্বান করেছিলেন। হজরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময়ও এই স্থানে বেহেশত থেকে আনা হাজরে আসওয়াদকে আমানত রাখা হয়েছিল। হজরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) হজের সময় এখানে অবস্থান করতেন।
জাবালে আবু কোবায়েছ পাহাড়ের ওপর নবীজি (সা.) আল্লাহর ইচ্ছায় কাফেরদের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় অঙ্গুলিনির্দেশে চন্দ্রকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন।
মওলুদুন নবী (সা.) বা নবীজির জন্মস্থানে (খাজা আবদুল্লাহ ও বিবি আমিনার ঘর) বর্তমানে একটি গ্রন্থাগার করা হয়েছে। মসজিদুল হারামের সন্নিকটে পূর্ব দিকে অবস্থিত। ‘মওলুদুন্নবী’ বললে এই বাড়িটি যে কেউ দেখিয়ে দেবে। হজরত বিবি খাদিজা (রা.)-এর বাড়িতে হজরত মা ফাতিমা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে এখানে একটি মাদ্রাসা অবস্থিত।
জাবালে নূর (হেরা পাহাড়) পাহাড়েই গারে হেরা বা হেরা গুহা অবস্থিত। এখানে নবীজি (সা.) দীর্ঘকাল সাধনা করেছেন এবং জিব্রাইল (আ.) মারফত প্রথম ওহি লাভ করেন। এখানেই প্রথম কোরআন শরিফ নাজিল হয়।
হিজরতের প্রাক্কালে নবীজি (সা.) জাবালে সূর (সওর পাহাড়) পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে ইসলাম ধর্মকে সযত্নে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহর প্রতি রাসুল (সা.)-এর অবিচল বিশ্বাস এবং হজরত আবু বকর (রা.)-এর অসীম ধৈর্য ও প্রেমের অনন্য সাক্ষী এই পাহাড় ও গুহা। এই পাহাড়ের গুহায় মাকড়সা জাল বুনে, কবুতর ডিমে তা দিয়ে নবীজি (সা.)–কে সাহায্য করেছিল। এখনো সেখানে কবুতর দেখতে পাওয়া যায়।
আরাফাত একটি প্রশস্ত ময়দান। এর আয়তন ৩১ বর্গকিলোমিটার। খানায়ে কাবা থেকে আরাফাত ১২ কিলোমিটার এবং মিনা থেকে ৯ কিলোমিটার। ৯ জিলহজ হাজিদের আরাফাত ময়দানে অবস্থান করতে হয়। আরাফাত মানে পরিচয়। আরাফাত ময়দানে হজরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে হজরত হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন হয় এবং তাঁরা স্বীয় ভুলের জন্য তথায় আল্লাহ তাআলার দরবারে মোনাজাত করেন এবং ওই মোনাজাত কবুল হয়।
আরাফাত ময়দানে অবস্থিত জাবালে রহমত পাহাড়ের উচ্চতা ৩০০ ফুট। এর উপরিভাগে একটি সাদা স্তম্ভ আছে, যেখান থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই পাহাড় দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্র লাব্বাইক ও দরুদ শরিফ পড়তে হয়।
আল্লাহ তাঅালার আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তদীয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে যে স্থানে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই স্থানের নাম মিনা। মক্কা শরিফ থেকে মিনা পাঁচ কিলোমিটার। মিনা প্রান্তরে হজের আগের দিন এবং হজের পর তিন দিন তাঁবুতে অবস্থান করতে হয়।
মসজিদে খায়েশ মিনা প্রান্তরে অবস্থিত। এখানে আদিকাল থেকে আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত ৭০ জন পয়গম্বর আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। মিনার পাশেই তিনটি জুমরা বা স্তম্ভ (বহুবচন জামারাত) অবস্থিত। এগুলো ছোট শয়তান (জুমরায়ে উলা), মেজো শয়তান (জুমরায়ে উস্তা), বড় শয়তান (জুমরায়ে আকাবা) নামে পরিচিত। হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির পথে এই স্থানে শয়তান বাধা সৃষ্টি করেছিল এবং তিনি পাথর মেরে শয়তানকে তাড়িয়েছিলেন। এর স্মরণে এখানে কঙ্কর মারতে হয়।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com