শিরোনাম

চোরাকারবারির ‘রেড অ্যালার্ট’!

untitled-13_160572
রেড অ্যালার্ট’, কাস্টমস। তিন শব্দের ছোট্ট মেসেজ পাঠিয়ে সহযোগীদের সতর্ক করতেন বিমানের মেকানিক সুপারভাইজার মাসুদুর রহমান (৫০)। তবে বিধিবাম! মাসুদের বিশ্বস্ত সহযোগী স্বর্ণ চোরাকারবারি এয়ারক্রাফট মেকানিক আনিস উদ্দিন ভূঁইয়ার মোবাইলে একই ধরনের খুদেবার্তা পাঠানোর পরই কপাল পুড়ল তার। যখন ওই বার্তা পাঠানো হয়, ততক্ষণে মাসুদ স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দাদের জালে। ওই খুদেবার্তার সূত্র ধরেই বেরিয়ে আসে স্বর্ণ চোরাচালানে মাসুদের জড়িত থাকার আরও অনেক তথ্য। দেশের ইতিহাসে বৃহৎ দুটি স্বর্ণ চোরাচালানসহ একাধিক ঘটনায় তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনটি মামলায় মাসুদ এজাহারভুক্ত আসামি। শনিবার রাজধানীর উত্তরার চার নম্বর সেক্টরের ২১ নম্বর রোডের নিজ ফ্ল্যাট থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল কৌশলে মাসুদকে গ্রেফতার করে। গতকাল রোববার স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় মাসুদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত

দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
১২৪ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মাসুদসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি এয়ারক্রাফট থেকে ১২৪ কেজি চোরাই স্বর্ণ আটক করা হয়। সেটি ছিল দেশের ইতিহাসে স্বর্ণ চোরাচালানের সবচেয়ে বড় ঘটনা। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনার ২৫ মাস পর গ্রেফতার হলেন বিমানের মেকানিক সুপারভাইজার মাসুদ। ২০১৪ সালে এপ্রিলে শাহজালালে ১০৫ কেজি চোরাই স্বর্ণ জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন। শাহজালালে আটক ১৪ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের আরেকটি মামলার আসামিও মাসুদ।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, শাহজালালকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালানের অন্যতম হোতা মাসুদ। বিভিন্ন নম্বর থেকে মাসুদ তার সহযোগীদের সতর্কতামূলক খুদেবার্তা পাঠাতেন। এ ধরনের বার্তার সূত্র ধরে স্বর্ণ চোরাচালানে তার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানা যায়। উদ্ধার করা হয়েছিল ১০৫ কেজি স্বর্ণ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (উত্তর) মাহফুজুল ইমলাম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বিমানের মেকানিক মাসুদকে দীর্ঘদিন ধরে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছিল। একটি মামলায় জামিন নিয়ে তিনি আবার স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। মাসুদকে গ্রেফতারের পর দু’দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের এপ্রিলে শাহজালালে বিমানের একটি ফ্লাইটে রহস্যজনকভাবে মেকানিক অ্যাসিস্ট্যান্ট আনিসকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। গোয়েন্দা তথ্য ছিল, ওই ফ্লাইটে চোরাই স্বর্ণ রয়েছে। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রথমে সেই ফ্লাইটে কোনো চোরাই স্বর্ণের চালান না পেয়ে হতাশ হন। এ সময় হঠাৎ ফ্লাইটের ভেতরে থাকা আনিসের মোবাইল ফোনে ‘রেড অ্যালার্ট, কাস্টমস’ লেখা খুদেবার্তা আসে। তখন মোবাইল ফোন জব্দ করার পর মাসুদের কাছ থেকে আসা একই ধরনের আরও বার্তা পাওয়া যায়। এর পরই নড়েচড়ে বসেন শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তল্লাশির সময় খুদেবার্তাটি তারা না পেলে স্বর্ণের চালানটি শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। দ্রুত ওই ফ্লাইটে তল্লাশি প্রক্রিয়া শেষ করার তাড়া ছিল। কারণ ওই ফ্লাইটটি একজন ভিভিআইপিকে নিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া চলছিল। তবে খুদেবার্তাটি পাওয়ার পর ফের তল্লাশি করে ১০৫ কেজি চোরাই স্বর্ণের চালান পাওয়া যায়।

ডিবির একজন কর্মকর্তা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনভুক্ত মাসুদ বিলাসী জীবন-যাপন করতেন। উত্তরায় রয়েছে তার দামি ফ্ল্যাট। নামে-বেনামে হিসাব নম্বরে আছে লাখ লাখ টাকা। জামিনে বেরিয়ে তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্য ছিল_ শনিবার মাসুদ উত্তরায় তার বাসায় অবস্থান করছেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল বাসায় যায়। তবে মাসুদের স্ত্রী জানান, ফ্ল্যাটে তার স্বামী নেই। এরপর ডিবির কর্মকর্তারা তার বাসার ভেতরে প্রবেশ করে আলনার পেছনে লুকিয়ে থাকা এই শীর্ষ স্বর্ণ চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদের মাধ্যমে শাহজালালকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালানের আরও অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান ডিবির কর্মকর্তারা।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ১২৪ ও ১০৫ কেজি চোরাই স্বর্ণের চালান ছাড়াও আরও কয়েকটি ঘটনায় তার নাম পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে অন্তত দুটি মামলায় একাধিক আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মাসুদের নাম জানান। ১২৪ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ১৪ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। আসামিরা হলেন_ এয়ারক্রাফট মেকানিক সুপারভাইজার মাসুদ, সিকিউরিটি অফিসার কামরুল হাসান, ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার সালেহ আহমেদ, মজিবর রহমান, অ্যাসিস্ট্যান্ট এয়ারক্রাফট মেকানিক আনিস উদ্দিন ভূঁইয়া, বিমানের সুইপিং সুপারভাইজার আবু জাফর, হ্যাঙ্গারের মেকানিক ওসমান গণি, জুনিয়র ইন্সপেকশন অফিসার শাহাজাহান সিরাজ, রায়হান আলী, মাকসুদ, নেপালের নাগরিক গৌরাঙ্গ রোসান, ভারতীয় নাগরিক জেসন প্রিন্স, বাংলাদেশের এসএস কার্গোর চেয়ারম্যান মিলন শিকদার ও জসীম উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে ছয়জনকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যরা পলাতক।