সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন
Uncategorized

তামাই গ্রামের লুঙ্গি দেশে বিদেশে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০১৫
  • ৫৫ দেখা হয়েছে

untitled-10_88172
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রাম। প্রায় ৩০ হাজার জনসংখ্যার এ গ্রামের প্রধান ও একমাত্র পেশা তাঁত ব্যবসা। দেশসেরা লুঙ্গি তৈরি হয় এ গ্রামে। দেশের চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগ লুঙ্গিই এ গ্রাম থেকে সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন অন্তত এক লাখ পিস লুঙ্গি উৎপাদন হয়। দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে এ লুঙ্গি বিদেশেও রপ্তানি হয়। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দেশের সব উন্নত ব্র্যান্ডের লুঙ্গির সবগুলোই তৈরি হয় তামাই গ্রামে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৫০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তাঁতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ গ্রামের নারী-পুরুষ অনেকটাই স্বাবলম্বী। জানা যায়, বাংলাদেশের উন্নত ৩০টি ব্র্যান্ডের লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে তামাই গ্রামে। উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে- আমানত শাহ, স্ট্যান্ডার্ড, পাকিজা, এটিএম, অনুসন্ধান, ফজর আলী, মেমোরি, সম্রাট, ক্লোজআপ, হিমালয়, পপুলার ও বিজলী। প্রতিটি লুঙ্গির উৎপাদন খরচ হয় ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এগুলো বিভিন্ন কোম্পানিতে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বাজারে খুচরা বিক্রি হয় গড়ে ২৫০ থেকে ১২৫০ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরেও বিদেশে রপ্তানির জন্য আরও উন্নত মানের লুঙ্গি তৈরি করা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, সোহাগপুর, এনায়েতপুরসহ লুঙ্গির পাইকারি হাট বসে করটিয়া, বাবুবাজার, গাউছিয়া, বাবুরহাট, কুমারখালী, আতাইকুলা ও নারায়ণগঞ্জে। দরদি টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী তাঁত ব্যবসায়ী আল আমিন সরকার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুতার ন্যায্য মূল্য, সহজলভ্যে তাঁত লোন পেলে এ শিল্পের আরও বিকাশ করা সম্ভব। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ খুবই জরুরি। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে লুঙ্গি তৈরিসহ সব ধরনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। আবার জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা চালানো হলে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আশা করি, সরকার এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেবে। এস আর টেক্সটাইলের প্রধান আবদুল আজিজ সরকারের মতে, দেশের ৬০ ভাগ লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে তামাই গ্রামে। গরিব থেকে শুরু করে কোটিপতিরা পর্যন্ত এ গ্রামের লুঙ্গি ব্যবহার করেন। তাঁতশিল্পের কাঁচামালগুলো সাধারণত আনা হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে। এগুলো সিরাজগঞ্জে উৎপাদন হলে তাঁত ব্যবসায়ীদের জন্য আরও সুবিধা হতো। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে উৎপাদন সংখ্যা বাড়ত। তামাই গ্রামের তাঁতশিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে তামাই গ্রামে সহস াধিক জেনারেটর বসানো হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাট, ফায়ার সার্ভিস, স্বল্প সুদে ঋণ, সুতার ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, সুতা প্রসেসিং ও রঙের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা, উন্নত শোধনাগার ও পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরি করা গেলে উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যাবে। এতে উৎপাদন খরচও কম পড়বে। অন্যদিকে পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। পরিবেশ অধিদফতরের জরিমানার নামে নানাভাবে হয়রানি বন্ধেরও আহ্বান জানান তাঁত ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রবাসী বাঙালি ছাড়াও ভারত, ফিলিপাইন, নেপাল, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, সিঙ্গাপুর, জর্ডান, সৌদি আরবসহ বিশ্বের উন্নত সব দেশে রপ্তানি করা হয় এসব লুঙ্গি। চাহিদা ও গুণগত মানের প্রতি লক্ষ্য রেখেই তৈরি করা হয় এসব লুঙ্গি। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, উন্নত জাতের লুঙ্গি ছাড়াও বেলকুচিসহ সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় পাওয়ারলুম ও হস্তচালিত তাঁতে নিখুঁতভাবে তৈরি হচ্ছে জামদানি, সুতি জামদানি, সুতি কাতান, চোষা, সিল্ক চোষা, সিল্ক শাড়ি, সেট, বেনারসি, শেডশাড়ি, থ্রি-পিস ও হরেকরকমের মশারি ও গামছা। শাড়ির ওপর বর্ণিল সুতা, বাক ও চুমকির রয়েছে নানা রকম কারুকার্য। আরও রয়েছে কাপড়ের ওপর প্রিন্ট এবং রংতুলির অাঁচড়ে এবং হাতে করা হচ্ছে নান্দনিক ও মনোমুঙ্কর নকশা। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁতিদের পরিশ্রমের ফল ভোগ করছে মধ্যস্বত্বভোগী বিভিন্ন কোম্পানি। স্বল্প দামে দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের কাপড় কিনে নিজেদের লেভেল লাগিয়ে দেড় থেকে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমানে বাজারে কাপড়ের চাহিদা কম থাকায় এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম বেশি না পাওয়ায় সময় মতো ব্যাংক সুদ ও ঋণ শোধ করতে না পেরে তাঁতিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে ঋণ শোধের জন্য তাঁত ফ্যাক্টরি ও বসতভিটা বিক্রি করে দেউলিয়া হয়ে অন্য ফ্যাক্টরিতে কাজ করে মানবেতর জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবুও তাঁতি ও শ্রমিকরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁতবস্ত্রের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। এ শিল্প রক্ষায় তারা স্বল্প সুদে ঋণ, ঋণ খেলাপিদের ঋণ মওকুফ ও বিদেশে কাপড় রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের উপকরণ সুতা ও রঙের দাম কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। সম্রাট লুঙ্গির স্বত্বাধিকারী আমিরুল ইসলাম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে পুরো সিরাজগঞ্জ নিয়েই একটি উন্নত শিল্পনগরী গড়ে তোলা সম্ভব। যা দেশের অর্থনীতিকে কেবলই সমৃদ্ধ করবে।

শেয়ার করুন

এই ক্যাটাগরির আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী

© All rights reserved by Crimereporter24.com
themesba-lates1749691102