Oporadher Dairy Theke
সিলেটের কুমারগাঁওয়ে সামিউল আলম রাজনকে নির্যাতন করে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তারা হলো- দুলাল আহমদ ও নুর মিয়া। দুলাল মামলার প্রধান আসামি মুহিত আলমের আত্মীয়। নুর মিয়া তার মোবাইল ফোনে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিল।

এ মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত চার আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হলো। দুলাল ও নুর মিয়া বাদে অন্যরা হলো- মুহিত আলম ও চৌকিদার ময়না মিয়া। তদন্তভার পাওয়ার পর গতকাল মামলার নথিপত্র বুঝে নিয়েছে ডিবি পুলিশ।

এদিকে আগের ২৮ মিনিটের ভিডিওচিত্রের পর এবার রাজনকে নির্যাতনের আরেকটি ভিডিওচিত্র পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের নতুন ভিডিওচিত্রটি আরো নির্মম। এতে দেখা যায়, নির্যাতনের একপর্যায়ে রাজন পানির জন্য আকুতি জানায়, তখন নির্যাতনকারীরা তার গায়ের গেঞ্জিতে পানি ছিটিয়ে দিয়ে বলে, ‘গেঞ্জি চেটে পানি খা’। আর চৌকিদার ময়না ২১ সেকেন্ডে রাজনকে ১৬টি থাপ্পড় মারে। এই ভিডিওচিত্রটি প্রকাশের পর নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিলেট শহরতলির টুকেরবাজার এলাকার জাঙ্গাইলের বাড়ি থেকে স্থানীয়রা নুর মিয়াকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। রাজনকে যেখানে নির্যাতন করা হয়েছে সেখানকার একটি ওয়ার্কশপে কাজ করে নুর মিয়া। জালালাবাদ থানার ওসি আখতার হোসেন জানান, পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুর মিয়া জানিয়েছে, সৌদিপ্রবাসী ও এ মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলামের কথায় সে মোবাইল ফোনে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণ করে। আর বুধবার দুপুরে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি দুলালকে তার গ্রামের বাড়ি শেখপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করে জালালাবাদ থানার পুলিশ। দুলালের মা-ই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সুরঞ্জিত তালুকদার গতকাল দুলাল ও নুর মিয়াকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। বিকেলে শুনানি শেষে সিলেট মহানগর হাকিম আদালতের (তৃতীয়) বিচারক আনোয়ারুল হক দুজনের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

‘কম্পিটিশন করিয়া মারো’ : নতুন ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, নির্যাতনের একপর্যায়ে বিমর্ষ রাজন হিতাহিত জ্ঞান হারায়। তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বারবার পানি খেতে চায়। নির্যাতনকারীরা পানির বোতল থেকে পানি মাটিতে ও রাজনের গেঞ্জিতে ছিটিয়ে দিয়ে বলে গেঞ্জি থেকে পানি চেটে খা।

ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, রাজনকে গাড়ির গ্যারেজে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারা হচ্ছিল। হাতে থাকা লোহার রোলার দিয়ে আঘাত করতে থাকে কামরুল। রাজনের গালে অনবরত চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে চৌকিদার ময়না। ময়না সঙ্গীদের উদ্দেশে বলছিল, ‘মারো, যে যেভাবে পারো মারো, কম্পিটিশন করিয়া মারো…!’ ভিডিওচিত্রের ১ মিনিট ৩ সেকেন্ড থেকে ২৪ সেকেন্ড পর্যন্ত থেমে থেমে রাজনকে চড় মারে ময়না। এরপর পানি খাওয়ার আকুতি জানালে দূর থেকে বলা হয়, ‘হা কর…!’ তার সামনে পানির বোতল কাত করে ধরে ময়না। কিন্তু পানি মুখে না পড়ে পড়েছিল পরনের ময়লা গেঞ্জিতে।

আগেও ভিডিওচিত্রটিতে দেখা যায়, রাজন বলছে ‘আমারে পানি খাওয়াওরেবা।’ নির্যাতনকারীরা তাকে পানির বদলে ঘাম খেতে বলে।

আসামি ধরিয়ে দিয়েছে জনতা : রাজনের হত্যাকারীদের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সবাইকে ধরে পুলিশে দিয়েছে জনতা। পুলিশ নিজস্ব অভিযান চালিয়ে একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। বরং পুলিশ টাকার বিনিময়ে ঘটনার পরপরই মূল হোতা কামরুলকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকার লোকজন পুলিশের এমন ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

ভ্যানগাড়ি চুরির অভিযোগে ৮ জুলাই রাজনকে কুমারগাঁওয়ে একটি ওয়ার্কশপের বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করে ছয়জন। রাজনের লাশ অন্যত্র ফেলে দিতে গিয়ে ওই দিনই জনতার ধাওয়ায় হাতেনাতে আটক হয় মুহিত আলম। কামরুল সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে জনতাই তাকে আটক করে সে দেশের পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। মঙ্গলবার রাতে গ্রামবাসী আটক করে পুলিশে দেয় ময়না মিয়াকে। বুধবার দুলালকে আটক করে তার মা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ এলাকাবাসীর হাতে তুলে দেন। একই রাতে নুর মিয়াকে আটক করে স্থানীয়রা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সোমবার লামাকাজি এলাকা থেকে প্রত্যক্ষদর্শী ইসমাইল হোসেন আবলুছ, আজমল হোসেন ও ফিরোজ আলী নামের তিনজনকে আটক করে পুলিশে দেয় গ্রামবাসী। এ ছাড়া মুহিতের স্ত্রী লিপি বেগমকে আটক করে পুলিশ। তিনি পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

আসামি নিজ নিজ গ্রাম ও আশপাশ থেকে আটক হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন তারা নিজেদের গ্রাম তথা আশপাশেই অবস্থান করছিল। অথচ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এ বিষয়ে জালালাবাদ থানার ওসি আখতার হোসেন বলেন, ‘এবার পুলিশ, সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকরা মিলেই একযোগে কাজ করছি। তাই অতি সহজেই ফলাফল শতভাগ হয়ে যায়।’

গ্রামবাসী আসামিদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, সদর উপজেলার মানুষ সব সময় আইনকে সাহায্য করেন। এর আগে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে হত্যার ঘটনায় এলাকাবাসী ৯ জনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছিল। কান্দিগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, পুলিশ যেখানে ব্যর্থ, জনগণ সেখানে সফল। পুলিশ সময়মতো অ্যাকশনে গেলে এক দিনের মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার করা সম্ভব হতো।

মামলার নথি বুঝে নিয়েছে ডিবি : গতকাল দুপুরে মামলার নথিপত্র গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুরঞ্জিত তালুকদারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানান জালালাবাদ থানার ওসি আখতার হোসেন।

সুরঞ্জিত তালুকদার জানান, তিনি মামলার তদন্ত শুরু করেছেন। দুলাল ও নুর মিয়াকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবাদ, মানববন্ধন অব্যাহত : রাজন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে সিলেটে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। গতকালও নগরের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছে বিভিন্ন সংগঠন।

বিকেলে নগরের চৌহাট্টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন চলাকালে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সিলেটের সভাপতি আবুল হোসেন।

হত্যাকারীদের বিচার ও ফাঁসির দাবিতে গতকাল দুপুর ২টায় নগরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে সিলেটের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সিলেটের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে মানববন্ধনে অংশ নেন রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান। মানববন্ধনে তিনি ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

মানববন্ধন শেষে রাজনের বাবার হাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সহায়তা হিসেবে ৫৫ হাজার টাকা তুলে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া নগরের জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন ব্যবসায়ী সমিতি জিন্দাবাজারে এবং নারী রাজনৈতিক নেতারা সিলেটের ব্যানারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধনের আয়োজন করেন।

হীরা পান্নাঅপরাধের ডায়েরী থেকে
সিলেটের কুমারগাঁওয়ে সামিউল আলম রাজনকে নির্যাতন করে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তারা হলো- দুলাল আহমদ ও নুর মিয়া। দুলাল মামলার প্রধান আসামি মুহিত আলমের আত্মীয়। নুর মিয়া তার মোবাইল ফোনে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারণ করেছিল। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার...