88142_31
নমিতা ভক্ত আর দুলাল ভক্তের সংসারে বইছে আনন্দের বন্যা। ৪ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বুকের মানিককে ফিরে পেয়ে মা নমিতাসহ বাড়ির সবার মাঝে যেন আনন্দ আর ধরছে না। চলছে মিষ্টিমুখ। হারিয়ে যাওয়া দুর্জয়কে একনজর দেখতে মানুষজন সকাল থেকে ভিড় জমাচ্ছে। ফলে দিনব্যাপী বাড়িতে প্রতিবেশীদের ভিড় লেগেই ছিল। সবাই শুনতে চাচ্ছেন কিভাবে হারিয়ে যাওয়া দুর্জয়কে ফিরে পাওয়া গেল। কিভাবে তাকে এত সহজে বাড়ি ফিরিয়ে আনা গেল। কারাইবা সাহায্য করলো। দুর্জয় কেমন ছিল। সেখানকার মানুষজন কেমন। বাড়ি নিয়ে আসার সময় সেখানে কিরকম পরিবেশ হয়েছিল। দুর্জয় কান্নাকাটি করছিল কিনা। শেল্টার হোমে সে কি খাওয়া-দাওয়া করতো- এরকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে নমিতা ভক্তকে। কিন্তু এতকিছুর পরও তিনি হাসিমুখে সবাইকে ম্যানেজ করছেন। কুশলাদি বিনিময় করছেন। মনে হচ্ছে যেন ঈদ আর পূজা পার্বণের আনন্দে মাতোয়ারা নমিতা ভক্তের বাড়িটি। গতকাল রোববার বিকালে খুঁজতে খুঁজতে যশোর শহরের বারান্দী মোল্যাপাড়ার পূর্ব প্রান্তে ভৈরব নদের কোলঘেঁষে মিলল দুলাল ভক্তের বাড়ি। আশপাশের লোকজন তেমন একটা এ পরিবারকে না চিনলেও দুর্জয়ের কারণে ইতিমধ্যে সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে বাড়িটি। বারান্দীপাড়া কবরস্থানের দক্ষিণ গেটের পাশের ইশারতের চায়ের দোকান। দুর্জয়দের বাড়ি কোথায়- এমন কথা পাড়তেই চায়ের দোকানদার বললেন, হ্যাঁ পত্রিকায় খবর পড়ে আমরা সব জেনেছি। দুলালের ছেলে দুর্জয় বাড়ি ফিরে এসেছে শনিবার রাত ১১টার দিকে তার মা আর মামার সঙ্গে। ৪ বছর আগে ছেলেটি হারিয়ে গিয়েছিল। ছেলেহারা মায়ের সেকি কান্না আমরা দেখেছি। ছেলেটি এতদিন পর ফিরে আসবে এটা কেউ বিশ্বাস করতো না। সবাই ভাবতো ছেলেটি হয়তো মারা গেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ছেলেটি ফিরে এসেছে। ইশারতের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই বাড়ি চিনতে বেগ পেতে হলো না। নদীর ধারে দুই কামরার ছোট্ট একটি টিনের ঘরের বারান্দায় দেখা মিললো বেশ কয়েকজন নারীর। তাদের কথাবার্তা শুনেই বোঝা গেল এটাই দুর্জয়দের বাড়ি। কাদাপানি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো দুর্জয়ের মামা সুব্রতের সঙ্গে। পরিচয় দেয়ার পর বারান্দার ছোট্ট খাটে বসতে দিলেন। তার পর প্রতিবেশী নারীরা যে যার মতো প্রশ্ন করতে লাগলেন। ঠাণ্ডা মাথায় সবার প্রশ্নের জবাব দিয়ে শুরু করলাম আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য হাসিল করার কাজ। সাংবাদিক পরিচয় শুনে ঘরের ভেতরে শুয়ে থাকা দুর্জয়ের নানী কামনা মণ্ডল বেরিয়ে এলেন। হাসিমুখে ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করে হাত বাড়িয়ে ধরলেন মিষ্টির প্লেট। অনুরোধ করলেন একটু মিষ্টিমুখ করার। বললেন এত বছর পরে আমার বুকের মানিক নানু ভাই ফিরে এসেছে। আপনারা একটু মিষ্টিমুখ করে ওর জন্য দোয়া করবেন। কিছুক্ষণ পর পানির গ্লাস হাতে করে এগিয়ে এলেন দুর্জয়ের মা নমিতা বিশ্বাস। পরনে নতুন কাপড়। মাথায় সিঁদুর। মুখে বাঁধভাঙ্গা আনন্দের হাসি। ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করার পর আমাদের পাশে বসলেন। কেমন আছেন প্রশ্ন শুনেই ফিক করে হেসে ফেললেন। বললেন, বুঝতেই তো পারছেন ৪ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে হঠাৎ ফিরে পেয়ে মায়ের মনে কেমন আনন্দ হয়। আমার সব না পাওয়ার বেদনা শেষ হয়ে গেছে। কবে, কখন কিভাবে বাড়ি ফিরলেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে গড়গড়িয়ে বলতে লাগলেন নমিতা ভক্ত। যেন সব প্রশ্নের উত্তর তার মুখস্ত। বললেন, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় কলকাতার সল্ট লেক থেকে বাসে রওনা হই। ছেলে দুর্জয় আর ভাই সুব্রতকে নিয়ে। বেলা সাড়ে ১১টায় পেট্রাপোলে পৌঁছাই। প্রায় সব কাজ শেষ হয়ে যায় এক ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু অ্যাম্বাসির একটা লেটার আসতে দেরি হওয়ায় পেট্রাপোলে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তারপর বিকাল ৫টার দিকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের পর কাস্টমসের লোক আর বিজিবি আটকে দেয়। সেখানে ভারতীয় পুলিশ আর বাংলাদেশের পুলিশের মধ্যে কি যেন একটা সমস্যা হয়। তারপর সবকিছু ঠিকঠাক করে রাত সাড়ে ৮টার সময় বেনাপোল থানা পুলিশ আমাদের গাড়িতে তুলে দেয়। রাত ১১টার দিকে বাড়ি পৌঁছাই। তারপর তো দেখতে পাচ্ছেন বাড়িতে মানুষের ভিড় কমছে না। ছেলে কই জিজ্ঞাসা করতেই হাত দেখিয়ে বললেন, ছেলেটা ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাচ্ছে। তারপর তড়িঘড়ি দুর্জয় আর তার ছোট ভাই সুজয় ঘুম থেকে উঠে মায়ের পাশে বসলো। তারপর নানারকম গল্প আর প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে জানলাম দুর্জয়ের হারিয়ে যাওয়া আর ফিরে আসার গল্প।
নমিতা বলেন, ৪ বছর আগে দুর্জয় স্থানীয় বারান্দীপাড়া আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করতো। ঈদের আগের দিন স্কুল বন্ধ থাকায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা বলে বিকাল ৪টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। সেই যে নিখোঁজ হলো আর বাড়ি আসেনি। সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে। নানা জনে নানা কথা বলেছে। সে মোতাবেক অনেক করিবাজ ধরেছি। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আপনাদের মতো সাংবাদিকদের কারণে আমি আমার বুকের ধনকে ফিরে পেয়েছি। কথা বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন মা নমিতা ভক্ত। মাকে থামিয়ে ছেলে দুর্জয় বললো তার হারিয়ে যাওয়া গল্প। সে ক্রাইম রিপোার্টার ২৪.কমকে জানায়, ‘বাড়ির পাশে খেলতে খেলতে কে একজন যেন তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। লোকটার সঙ্গে সে একটা মেলায় যায়। সেখান থেকে লোকটা আমাকে নিয়ে তার বাড়িতে যায়। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর লোকটা আমাকে দিয়ে নানারকম কাজ করাতো। সেসব কাজ আমার ভাল লাগতো না। কিন্তু কিছু করার ছিল না। লোকটা আমাকে কাজ না করলে মারপিট করতো। আমাকে দিয়ে মাদক পাচারের কাজ করাতো। কিন্তু এ কাজে তার মন বসতো না। এদিকে ওই লোকটি দুর্জয়ের নাম পাল্টে রাখে ইন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী। লোকটি তাকে শেখায় কখনো পুলিশের কাছে ধরা পড়লে এই নাম বলবি। না হলে পুলিশ তোকে আটকে রাখবে। ভুল করেও মা-বাবা আর বাংলাদেশের কথা না বলতে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছিল ওই লোকটি। এভাবে কয়েক মাস চলার পর ইন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী নামের দুর্জয় পালায়। সে ট্রেনে উঠে চলে যায় শিয়ালদহে। সেখানে পুলিশ তাকে আটক করে নাম জিজ্ঞাসা করলে তার নাম ইন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী জানায়। যা শেষ পর্যন্ত পুলিশের খাতায় এন্ট্রি হয়ে যায়। পরে পুলিশ তাকে পাঠিয়ে দেয় হাওড়া মালিপুকুর হোমে। হোমের লোকজন ভাল না। কথায় কথায় তাকে মারতো। খেতে দিত না। এ কারণে সে আবারও সেখান থেকে পালিয়ে যায়। শিয়ালদহ স্টেশনে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা তাকে পাঠিয়ে দেয় ২৪ পরগনার কামালগাজিতে ‘ইচ্ছে’ নামের একটি অনাথ আশ্রমে। এ আশ্রমেই কেটেছে বাকি দিনগুলো। অনাথ আশ্রমের স্কুলে সে লেখাপড়া করতো। ইতিমধ্যে ৩ ক্লাস পড়েছে। ইন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী নামেই সে সেখানে পরিচিতি লাভ করে। ইতিমধ্যে কবিতা, গান আর উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ইন্দ্র ৬টি পুরস্কার জিতেছে। যা নিয়ে সে দেশে ফিরেছে গতকাল মা আর মামার সঙ্গে।
দুর্জয়ের মামা শোনালেন কিভাবে তারা তার সন্ধান পেলেন সেই গল্প। সুব্রতের সঙ্গে ভারতের হাওড়া এলাকার সন্দিব কাঞ্চিলাল নামের এক উন্নয়ন কর্মীর ফেসবুকে বন্ধুত্ব হয়। আলাপ পরিচয়ের একপর্যায়ে ৬ মাস আগে সুব্রত তার ভাগ্নে দুর্জয় হারিয়ে যাওয়ার কথা বলে। সন্দিবের পরামর্শ মোতাবেক সুব্রত ফেসবুকে দুর্জয়ের ছবিসহ সব ঘটনা খুলে বলে। সন্দিব এসব ঘটনা শুনে তাকে কিছু কাগজপত্র আর দুর্জয়ের ছবি নিয়ে হাওড়া যেতে অনুরোধ করে। সে মোতাবেক সুব্রত ৩-৪ দফা ইন্ডিয়ায় গিয়ে সন্দিবের কাছে সব কাগজপত্র দিয়ে আসে। সে দুবার দুর্জয়ের মাকে নিয়েও ইন্ডিয়ায় যায়। হাওড়া থেকে কলকাতার বিভিন্ন অলিগলিতে তারা দুর্জয়কে খুঁজেছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা দুই ভাইবোন ফিরে এসেছে হতাশ হয়ে। শেষ পর্যন্ত সুব্রত তার মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আর দুর্জয়ের ছবি সন্দিবের কাছে রেখে গত জুন মাসের শেষদিকে বাড়ি চলে আসে। এরপর গত রোববার সন্দিব ফোন করে বলে তোমার ভাগ্নের সন্ধান মিলেছে। তোমরা চলে আসো। সে মোতাবেক আমরা পরদিন সকালে চলে যাই। হাওড়ায় পৌঁছে সব ঘটনা শুনি। সন্দিব তার এক বন্ধু সাংবাদিকের মাধ্যমে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় দুর্জয়ের ছবিসহ নিউজ করায়। যা দেখে দুর্জয় নিজেই নিজেকে চিনতে পারে। সে আশ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে তার আসল পরিচয় তুলে ধরে দেশে ফিরে আসার জন্য আকুল হয়ে পড়ে। তারপরের গল্প তো আপনারা সবাই জানেন। সুব্রত বার বার তার ফেসবুক বন্ধু সন্দিব কাঞ্চিলাল আর আনন্দবাজার পত্রিকা ও তার রিপোর্টার দীক্ষা ভুঁইয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এদিকে হারানো ছেলেকে দেখতে এখনো বাড়ি আসতে পারেননি বাবা দুলাল ভক্ত। কোম্পানির চাকরি সূত্রে তিনি বর্তমানে ঢাকা শহরে অবস্থান করছেন। গতকাল রোববার বিকালে বাড়িতে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও ব্যস্ততার কারণে আসতে পারবেন না বলে ফোনে জানিয়েছেন।

বাহাদুর বেপারীএক্সক্লুসিভ
নমিতা ভক্ত আর দুলাল ভক্তের সংসারে বইছে আনন্দের বন্যা। ৪ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বুকের মানিককে ফিরে পেয়ে মা নমিতাসহ বাড়ির সবার মাঝে যেন আনন্দ আর ধরছে না। চলছে মিষ্টিমুখ। হারিয়ে যাওয়া দুর্জয়কে একনজর দেখতে মানুষজন সকাল থেকে ভিড় জমাচ্ছে। ফলে দিনব্যাপী বাড়িতে প্রতিবেশীদের ভিড় লেগেই ছিল। সবাই...