1.1_250279

প্রাথমিক শিক্ষায় নিট ভর্তির হার কত, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সরকারের দুই সংস্থা ভিন্ন তথ্য দেওয়ায় এ ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘বার্ষিক প্রাথমিক স্কুলশুমারি ২০১৪’-এর তথ্যমতে, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিট ভর্তির হার ৯৭.৭ শতাংশ। সে হিসাবে স্কুলের বাইরে রয়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ শিক্ষার্থী। তবে সরকারের আরেক সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনিসেফের প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। এই দুই সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সীর মধ্যে এখনো ১১ শতাংশ শিশু স্কুলে ভর্তি হয়নি। তাদের হিসাবে ১৬ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। সে হিসাবে নিট ভর্তির হার ৮৯ শতাংশ। ভর্তির হার নিয়ে এ দুই সংস্থার মধ্যে অমিল প্রায় ৯ শতাংশের।

বিশ্বের অন্য সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের হার সর্বোচ্চ। দরিদ্রতা, শিক্ষার অভাব, অসচেতনতা, নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কারসহ সমাজের নানা পারিপার্শ্বিকতার কারণে ১৮ বছরের আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন অভিভাবকরা। ১৮ বছরের আগে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বিআইডিএস ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সারা দেশে ১৫ বছর বয়সের নিচে বিবাহিত নারীর সংখ্যা ২০ লাখ, যা মোট বিবাহিত নারীর ২৯ ভাগ। অন্যদিকে ১৮ বছর বয়সের নিচে বিবাহিত নারীর সংখ্যা ৪৫ লাখ, যা মোট বিবাহিত নারীর ৬৫ ভাগ। বিআইডিএস ও ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২৩ হাজার ‘শিশু মা’ সন্তান প্রসব জটিলতায় মারা যায়। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, দেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে যত শিশু আছে, তার মধ্যে ৬ শতাংশ শিশু শ্রমশক্তির সঙ্গে যুক্ত। সংখ্যার দিক দিয়ে যা ১০ লাখ। এর মধ্যে সেবা খাতের সঙ্গে যুক্ত চার লাখ, কৃষি খাতে চার লাখ এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে দুই লাখ শিশু।

১৮ বছরের নিচে বিবাহিত নারীর সংখ্যা ৪৫ লাখ

বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু পরস্পর সম্পর্কিত এ তিনটি বিষয় নিয়ে গবেষণা করে বিআইডিএস ও ইউনিসেফ। এতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পঞ্চম আদমশুমারি ও খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এ গবেষণা করা হয়। গতকাল বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অন্যদের মধ্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা, বিবিএস মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বিআইডিএস মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা ডিএফআইডির বাংলাদেশের প্রতিনিধি সারা কুক, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বিগবেদার প্রমুখ বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষক জুলফিকার আলী।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী দুজনই আশ্বস্ত করেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছরই থাকবে। বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুসংখ্যা কমানো না গেলে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ খুব একটা সুফল পাবে না বলে দুই মন্ত্রীই স্বীকার করেন। সে জন্য সরকার উল্লিখিত তিনটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

মূল প্রবন্ধে জুলফিকার আলী বলেন, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী এক কোটি ৬০ লাখ শিশুর মধ্যে ১১ শতাংশ শিশু কখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। সংখ্যার দিক দিয়ে যা ২০ লাখ। এ ছাড়া ১০ শতাংশ শিশু যারা দেরিতে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সংখ্যার দিক দিয়ে যা ১৯ লাখ। ছয় বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও তারা ভর্তি হয়নি। অনেক পরে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া ২ শতাংশ শিশু স্কুলে ভর্তি হয়ে পরে ঝরে পড়েছে। সব মিলিয়ে ২৩ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যায় যা ৪০ লাখ। বান্দরবান, সুনামগঞ্জ, ভোলা, নেত্রকোনা ও কক্সবাজার জেলায় বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, ফেনী ও যশোর জেলায় বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে কম।

গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও হবিগঞ্জে কম বয়সে বিয়ের প্রবণতা কম। অন্যদিকে মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা ও বগুড়ায় কম বয়সে বিয়ের প্রবণতা বেশি। কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে একদিকে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমছে না। অন্যদিকে নারীরা বাড়ির বাইরে আসতে পারছে না। শিশুদের শরীর সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে না। উচ্চশিক্ষায় মেয়েরা আসতে পারছে না। বাল্যবিয়ে কমলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৩২.৫ শতাংশ। সংখ্যায় যা ২১ লাখ।

অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দরিদ্র শিশুদের নিরাপত্তার অভাবই বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণ। একটি মেয়েশিশু যখন বাল্যবিয়ের শিকার হয় তখন তার ফলস্বরূপ সে স্কুলবহির্ভূত শিশুতে পরিণত হয়। এ ধারাবাহিকতায় সরকার মেয়েদের জন্য যে শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে, তা থেকে সে বঞ্চিত হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী বলেন, ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌনকর্মীর শিশু ও চা-বাগানের শ্রমিকদের শিশুসহ অতিদরিদ্র শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমানে সারা দেশে এক হাজার ৩০০টি স্কুল পরিচালনা করছে। শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-এ তিনটি বিষয়কে নির্মূল করতে সামাজিক বিপ্লব দরকার বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-এ তিনটিকে সামাজিক ব্যাধি উল্লেখ করে বলেন, ‘শিশুরা লেখাপড়া করতে পারবে না, অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাবে এবং কাজে নিযুক্ত হয়ে পড়বে-এটা কোনো সভ্য জগতে মেনে নেওয়া যায় না। এ অভিশাপ দূর করতে সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাবে। মন্ত্রী এ সময় এসব খাতে ইউনিসেফ যাতে আরো বেশি করে অবদান রাখে, সে আহ্বান জানান।

শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুর সংখ্যা কমাতে হলে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে অথচ সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে রাশেদা কে চৌধুরীর এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমাচ্ছে না। বর্তমানে বাজেটে শিক্ষার জন্য আলাদাভাবে বরাদ্দ থাকে। একই সঙ্গে অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ও তাদের নিজস্ব মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কারিগরিভাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে, যা শিক্ষা খাতে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত শিক্ষায় আইসিটি মন্ত্রণালয় যে বরাদ্দ দিচ্ছে তা শিক্ষা খাতে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। সে জন্য আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় শিক্ষায় বরাদ্দ কমেছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে ব্যয়কে ব্যয় হিসেবে না দেখে বরং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে থাকে বলেও মন্ত্রী মন্তব্য করেন।

শুভ সমরাটপ্রথম পাতা
প্রাথমিক শিক্ষায় নিট ভর্তির হার কত, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। সরকারের দুই সংস্থা ভিন্ন তথ্য দেওয়ায় এ ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের 'বার্ষিক প্রাথমিক স্কুলশুমারি ২০১৪'-এর তথ্যমতে, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিট ভর্তির হার ৯৭.৭ শতাংশ। সে হিসাবে স্কুলের বাইরে রয়েছে মাত্র...