ড. এম. নিয়ামুল নাসের ।
নদীবেষ্টিত বঙ্গভূমিতে প্রাচীনকাল থেকে খাদ্যতালিকায় যে মাছটি যথার্থভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে তা ইলিশ মাছ। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ‘বাংলাদেশ ইলিশ’ আজ সারাবিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত। কাঁটা সত্ত্বেও মাছটি দেশি-বিদেশি খাদ্যরসিকদের পাতে নানাপদে পরিবেশিত হচ্ছে। প্রচলিত ইলিশ-পোলাও, ইলিশ-ভাজি, সরষে-ইলিশ, ভুনা-ইলিশ, ভাপা-ইলিশ ছাড়াও ইলিশের ১০০টির বেশি রান্নার পদ্ধতি রয়েছে। এমনকি ইংরেজ বণিকরা কাঁটা ছাড়িয়ে মাছটির স্বাদ গ্রহণ করার প্রণালি বের করেছিল যাকে আজ আমরা ‘স্মোকড ইলিশ’ হিসেবে জানি। বিভিন্ন দেশে এই ইলিশ এতই সমাদৃত যে নানা ভাষায় এর প্রায় ১১০টি নাম প্রচলিত রয়েছে যা কোনো মাছের ক্ষেত্রে একটি বিরল ব্যাপার। কথিত আছে তুর্কি-ভারতীয় বংশদ্ভূত দিল্লির সম্রাট তুঘলক তাঁর মৃত্যুর পূর্ব রাতে তৃপ্তি সহকারে যে মাছটি বারে বারে চেয়ে নিয়ে খেয়েছিলেন, সেটি ছিল ইলিশ মাছ।

প্রকৃতিগতভাবে ইলিশ আমাদের মূল্যবান জলজ সম্পদ। দেশের মূল জেলেগোষ্ঠীর জীবিকা ইলিশ-নির্ভর। বিগত ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪,৯৬,৪১৭ মে.টন ইলিশ মাছ উত্পাদিত হয়েছে, যা দেশের মোট মাছের প্রায় ১২ শতাংশ। কেবলমাত্র বাংলাদেশই পৃথিবীর ৬৫%-এর বেশি ইলিশ মাছ উত্পাদন করছে।

ইলিশ সামুদ্রিক মাছ। কমবেশি সারা বছরই এই মাছ দেশের প্রধান নদনদী ও শাখাগুলিতে প্রজননের সময় চলে আসে। আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমায় ইলিশ সবচেয়ে বেশি প্রজনন করে থাকে। শিশু ইলিশ অর্থাত্ জাটকার আঁতুড়ঘর মিঠাপানির নদনদী। বছরান্তে এরা মিঠাপানিতে ১০ ইঞ্চির কিছু বড় হলেই পরিপক্কতার জন্যে সমুদ্রের লোনাপানিতে চলে যায়। সেখানে এক থেকে দুই বছরে মাছগুলো পরিপক্ক হয়ে ডিম ছাড়ার উপযুক্ত হয়। পরে মিঠাপানির নদনদীতে চলে আসে ডিম ছেড়ে বাচ্চা ফোটাতে। ছয়টি প্রজাতির ইলিশের মধ্যে পদ্ম-ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha Syn. Hilsa ilisha) সবচেয়ে সুস্বাদুু। বঙ্গোপসাগর ছাড়াও চীন সাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগরে মাছটি দেখা যায়। প্রজনন পরিযায়ী হওয়ায় বঙ্গোপসাগরের ইলিশ মাছ বাংলাদেশের মেঘনা ও পশ্চিমবঙ্গের হুগলী-ভাগীরতি নদীতে প্রজননের সময় ঢুকে পড়ে। তবে বাংলাদেশের মিঠাপানির ইলিশের স্বাদ অন্যদেশের ইলিশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেই এই মাছ সমুদ্র থেকে মেঘনা হয়ে পদ্মায় পরিযায়িত হয়। এইখানে স্বাদ ও গন্ধ বিচারে মাছটি তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। টাটকা মাছ রান্নার সময় এর যে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তা থেকে ইলিশভক্তরা সহজেই বলে দিতে পারবে এটি কোন মাছ। সাধারণভাবে মাংসের স্বাদ নির্ধারণ হয় তার গঠন (Texture) এবং গন্ধে (এমিনো এসিড)। আর ইলিশের স্বাদ ও গন্ধ নির্ধারণ হয় চর্বি ও ফ্যাটি এসিডের কারণে। মেঘনা ও পদ্মায় পরিযায়নের সময় এই মাছ প্রায় ৮০ প্রজাতির বেশি ক্ষুদ্র প্লাংটন খেয়ে থাকে। প্লাংটন লিপিড ব্যবহার করেই একদিকে যেমন ইলিশ পরিযায়নে শক্তি অর্জন করে অন্য দিকে সফলতার সাথে প্রজননে কর্মক্ষম ডিম ও স্পার্ম তৈরিতে সাহায্য করে। নদীর প্লাংটন গ্রহণে ইলিশের শরীরের চর্বিও লিপিড প্রোফাইল সমুদ্র থেকে পরিবর্তিত হয়। মেঘনা নদীতে ইলিশ নানা প্রকারের উদ্ভিজ্জ ব্যসিলারিওফাইসি, ক্লোরোফাইসি ও সায়ানোফাইসি এবং প্রাণিজ কোপিপোডা, ক্লাডোসেরা, প্রোটোজোয়া ও রোটিফেরা গোষ্ঠীর প্লাংটনগুলি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে যাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওমেগা-৩, ওমেগা-৬, অলিক এসিড, স্টেয়ারিক এসিড, ইত্যাদি রয়েছে। ফ্যাটি এসিডের তারতম্যের কারণে বিভিন্ন নদনদীতে ইলিশের স্বাদের ভিন্নতা হয়। আবার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড স্বাস্থ্যরক্ষায় খুবই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। ইলিশ রান্নার সময় যে চর্বি ও ফ্যাটি এসিডের ক্ষুদ্রকণাগুলি বাতাসে ভেসে বেড়ায় তা আমাদের নাকের ইন্দ্রিয় কোষের সংস্পর্শে আসলেই আমরা বুঝতে পারি যে এটি ইলিশ মাছের গন্ধ ।

ইলিশ এখনো দামি মাছ। দেশের বিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সারা বছর বড় ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্যে সারা বছর ইলিশ মাছ ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের উজানের যে সব নদনদীতে ইলিশ কমে গেছে বা হারিয়ে গেছে সেখানে ইলিশ-নির্ভর জেলে শ্রেণি সমস্যায় আছে। তাই ইলিশের ক্ষতি মানেই জেলে-দেশ-অর্থনীতির ক্ষতি।

দেশের নদনদীতে আজ ইলিশের পরিযায়নের সুযোগ কমে গেছে। নদীতে চর, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এর কারণ। অন্যদিকে, নদনদীর পাশে শিল্পায়ন ও কলকারখানা স্থাপন, বিদুত্ উত্পাদন কেন্দ্রের বর্জ্য, কীটনাশক, অতি-আহরণ ইত্যাদি ইলিশসম্পদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রতি বছরে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল অভয়াশ্রমগুলিতে যে কোনো ধরনের মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রজননক্ষম ইলিশ রক্ষায় আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার সময় ২২ দিন নদীতে কোনো মাছ না ধরা। সমুদ্রের মাছ রক্ষায় ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন কোনো মাছ ধরা নিষিদ্ধ। ১০ ইঞ্চির নিচে ইলিশ বা জাটকা ধরা আইনত দণ্ডনীয়।

পরিশেষে, সমুদ্রে ইলিশের বাসস্থান, নদনদীতে প্রজনন ও নার্সারি এলাকাগুলোর সুষ্ঠ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে বর্তমান সংরক্ষণপদ্ধতির পাশাপাশি ইলিশের নিরাপদ আশ্রয়স্থল (Fish refuge) এবং এমপিএ (Marine Protected Area) বা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। ‘জাটকা ধরবো না, খাবো না’—এই নীতি সামনে রেখে আমরা শিশুইলিশ বাঁচতে দিলেই দেশে এক থেকে দুই বছরে প্রচুুর বড় ইলিশ পাওয়া যাবে। ইলিশ সাশ্রয়ী হবে। দেশের ইলিশ-অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/04/1010.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/04/1010-300x300.jpgজান্নাতুল ফেরদৌস মেহরিনএক্সক্লুসিভ
ড. এম. নিয়ামুল নাসের । নদীবেষ্টিত বঙ্গভূমিতে প্রাচীনকাল থেকে খাদ্যতালিকায় যে মাছটি যথার্থভাবে প্রথম স্থানে রয়েছে তা ইলিশ মাছ। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ‘বাংলাদেশ ইলিশ’ আজ সারাবিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত। কাঁটা সত্ত্বেও মাছটি দেশি-বিদেশি খাদ্যরসিকদের পাতে নানাপদে পরিবেশিত হচ্ছে। প্রচলিত ইলিশ-পোলাও, ইলিশ-ভাজি, সরষে-ইলিশ, ভুনা-ইলিশ, ভাপা-ইলিশ...