1441647506
সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অষ্টম বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নতুন পে-স্কেলে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত) ও সর্বনিম্ন মূল বেতন হবে আট হাজার ২৫০ টাকা। এর ফলে গ্রেডভেদে বেতন বেড়েছে ৯১ থেকে ১০১ শতাংশ। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন এ স্কেল কার্যকর হবে। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকেরাও এর অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে ভাতা কার্যকর হবে ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কাঠামো নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা অনিষ্পন্ন রেখেই অনুমোদন করা হয়েছে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘বেতন ও চাকরি কমিশন, ২০১৩’ ও ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি, ২০১৩’ এবং এ সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশের আলোকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ও ভাতাদি নির্ধারণ করা হয়।

অনুমোদিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী বাতিল করা হয়েছে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন শ্রেণি পরিচয় থাকবে না, তাদের পরিচয় হবে গ্রেড ভিত্তিক। প্রতিবছর ১ জুলাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তিন বাহিনী প্রধানের বেতনে সমতা আনা হয়েছে।

এর আগে ২০০৯ সালে সর্বশেষ বেতন স্কেল দেয়া হয়েছিল। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রেস ব্রিফিংয়ে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, নতুন পে-স্কেলে ২০০৯ সালের স্কেলের মতোই ২০টি গ্রেড থাকবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুটি উত্সব ভাতার পাশাপাশি এখন থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়তি একটি ভাতা পাবেন। মূল বেতনের ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ২০ থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে মূল বেতনের ৫ শতাংশ। পঞ্চম গ্রেডে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। তিন ও চার নম্বর গ্রেডে প্রবৃদ্ধি হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড দুই-এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর এক নম্বর গ্রেডে কোনো প্রবৃদ্ধি হবে না।

তিনি বলেন, গত ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ বেতন পাবেন। তবে প্রথমে মূল বেতন ও ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ভাতা কার্যকর হবে। এর আগেও এভাবে পর্যায়ক্রমে বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে।

মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, মূল বেতনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি চক্রবৃদ্ধি হারে হবে। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ‘ধরুন, কারও মূল বেতন ১০ হাজার টাকা। এক বছরে তাঁর ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে ৫০০ টাকা। প্রথম বছর শেষে ওই ব্যক্তির প্রবৃদ্ধিসহ বেতন দাঁড়াবে ১০,৫০০ টাকা। যেহেতু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে, তাই দ্বিতীয় বছরে ওই ১০,৫০০ টাকার ওপর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে। এভাবে প্রত্যেক বছরই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। প্রতি বছরের ১ জুলাই সবার জন্য একই সঙ্গে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আগে টাইম স্কেল অনুযায়ী যে বেতন বাড়ত, নতুন পদ্ধতিতে তার চেয়ে বেশি বেতন বাড়বে।

মন্ত্রী পরিষদ সচিব বলেন, বেতন কমিশন ১৬ গ্রেডের কাঠামো দিলেও সচিব কমিটির সুপারিশে আগের মতো ২০টি গ্রেডেই এই বেতন কাঠামো করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্রেণি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন থেকে আর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ-কোনো শ্রেণি থাকবে না। গ্রেড দিয়ে পরিচিতি পাবেন। আগে শ্রেণি দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচিতি হতো। তিনি বলেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী টাকা পাবেন। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই তা কার্যকর হবে। তবে কীভাবে শিক্ষকদের এই বেতন দেয়া হবে তা অর্থ বিভাগ পরিপত্র দিয়ে নির্ধারণ করবে। শিক্ষকদের একটু অপেক্ষা করতে হবে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসন্তোষ প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী পরিষদ সচিব ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ‘বেতন বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিষয়ে মন্ত্রিসভা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তাদের অবস্থান নিয়ে সরকার সচেতন। তারা নতুন স্কেলে বেতন পাবেন। যে যে গ্রেডে আছেন ওই গ্রেডের নতুন কাঠামোতেই বেতন পাবেন।

এর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে সপ্তম বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১ জুলাই। সে অনুযায়ী এতোদিন সরকারি চাকরিজীবীরা সর্বনিম্ন ৪,১০০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা ‘বেসিক’ ধরে বেতন পেয়ে আসছিলেন। এর সঙ্গে ২০১৩ সালের ১ জুলাই তারা পাচ্ছিলেন মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে মহার্ঘ্য ভাতা। যা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দিন থেকে বিলুপ্ত হবে।

মন্ত্রীপরিষদ সচিব ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তিন বাহিনীর প্রধানের জন্য একই বেতন নির্ধারণ করে সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আগে সেনা প্রধানের বেতন নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানের চেয়ে বেশি ছিল। এখন তিন বাহিনীর প্রধানের বেতনই ৮৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নৌ বাহিনী এবং বিমান বাহিনী প্রধানের র্যাংকও আপগ্রেড করা হবে। তিন বাহিনীর প্রধানেরা এখন থেকে মন্ত্রীপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সমান বেতন পাবেন।

তিনি বলেন, নতুন বেতন স্কেলে অবসর সুবিধা বাড়বে। ২০০৯ সালের পে-স্কেলে সরকারি চাকুরেরা অবসরের সময় মূল বেতনের ৮০ ভাগ পেনশন ভাতা পেতেন। নতুন স্কেলে মূল বেতনের ৯০ শতাংশ অবসর সুবিধা পাবেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রথম বছর নতুন স্কেলে শুধু মূল বেতন পাবেন। এই বর্ধিত বেতনের অর্থ সংস্থান করতে চলতি বছরে সরকারকে ১৫ হাজার ৯০৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। তবে, আগামী বছর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নতুন স্কেলে বেতন ও ভাতা পাবেন। এ জন্য সরকারকে ২৩ হাজার ৮২৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হবে।

এদিকে নতুন বেতন কাঠামোতে বিশেষ ধাপে মন্ত্রি পরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবদের মূল বেতন ৮৬ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি বিশেষ ধাপ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবদের মূল বেতন ৯০ হাজার টাকা এবং বেতন কমিশন এক লাখ টাকা করার সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে এ বেতন ৪৫ হাজার টাকা। সিনিয়র সচিবদের মূল বেতন করা হয়েছে ৮২ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি সিনিয়র সচিবদের মূল বেতন ৮৪ হাজার টাকা ও বেতন কমিশন ৯০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে সিনিয়র সচিবেরা নির্ধারিত ৪২ হাজার টাকা মূল বেতন পান।

সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ ধাপ হিসাবে বিবেচিত সচিবের মূল বেতন (গ্রেড-১) নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৮ হাজার টাকা। পর্যালোচনা কমিটি সচিবের মূল বেতন ৭৫ হাজার টাকা ও কমিশন ৮০ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল। সপ্তম বেতন কাঠামোতে এখন এই কর্মকর্তারা ৪০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির শুরুতে মূল বেতন হয়েছে ২২ হাজার টাকা (নবম ধাপ)। পর্যালোচনা কমিটিও এ ক্ষেত্রে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা ও বেতন কমিশন ২৫ হাজার টাকা সুপারিশ করেছিল। প্রথম শ্রেণির চাকরির শুরুতে কর্মকর্তারা আগে ১১ হাজার টাকা পেতেন। সর্বনিম্ন স্তরের (গ্রেড-২০) মূল বেতন হয়েছে আট হাজার ২৫০ টাকা। এ ক্ষেত্রে পর্যালোচনা কমিটিও আট হাজার ২৫০ টাকার সুপারিশ করেছিল। তবে বেতন কমিশন সুপারিশ করেছিল আট হাজার ২০০ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোর ২০ টি গ্রেডের দ্বিতীয় গ্রেডে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৬৬ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ২৯ হাজার টাকার স্থলে ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ গ্রেডে ২৫ হাজার ৭৫০ টাকার পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে ২২ হাজার ২৫০ টাকার স্থলে ৪৩ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ১৮ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা, সপ্তম গ্রেডে ১৫ হাজার টাকার জায়গায় ২৯ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ১২ হাজার টাকার স্থলে ২৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। দশম গ্রেডে আট হাজার টাকার পরিবর্তে ১৬ হাজার টাকা, ১১ তম গ্রেডে ছয় হাজার ৪০০ টাকার পরিবর্তে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, ১২ তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ৯০০ টাকার পরিবর্তে ১১ হাজার ৩০০ টাকা, ১৩ তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ১১ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে পাঁচ হাজার ২০০ টাকার পরিবর্তে ১০ হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে ১৫, ১৬ ও ১৭ তম গ্রেডে মূল বেতন হয়েছে নয় হাজার ৭০০ টাকা, নয় হাজার ৩০০ টাকা ও নয় হাজার টাকা। আগের স্কেলে এ বেতন ছিল চার হাজার ৯০০, চার হাজার ৭০০ ও চার হাজার ৫০০ টাকা। আগে ১৮তম গ্রেডের মূল বেতন চার হাজার ৪০০ টাকা ও ১৯তম গ্রেডের মূল বেতন চার হাজার ২৫০ টাকা ছিল। নতুন বেতন কাঠামোতে তা বেড়ে হয়েছে আট হাজার ৮০০ ও আট হাজার ৫০০ টাকা।

শুভ সমরাটজাতীয়
সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অষ্টম বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নতুন পে-স্কেলে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত) ও সর্বনিম্ন মূল বেতন হবে আট হাজার ২৫০ টাকা। এর ফলে গ্রেডভেদে বেতন বেড়েছে ৯১ থেকে ১০১ শতাংশ। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন এ স্কেল কার্যকর হবে।...