01_261420
অঅ-অ+

প্রতিবছর আগস্ট মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রাথমিকের পাঠ্য বই ছাপানোর কাজ। কিন্তু এবার বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও এখনো মুদ্রণের কার্যাদেশ বুঝে নেয়নি সর্বনিম্ন দরদাতারা। অথচ কার্যাদেশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে সম্মতিপত্র দিতে হয় মুদ্রণকারীদের। এরপর ২৮ দিনের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হবে। তারপর ৯৮ দিনের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে হবে। এই হিসাবে দেখা যায়, চলতি সপ্তাহেও যদি কার্যাদেশ নেওয়া হয়, তবু কাজ শেষ করতে আগামী জানুয়ারি মাসের অন্তত ২০ তারিখ পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যাদেশ নিতে সম্মতিই জানায়নি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এবার শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রাথমিকের বই নিয়ে সরকার প্রাক্কলন (সম্ভাব্য দর) ঠিক করেছিল ৩৩০ কোটি টাকা। কিন্তু দেশীয় ২২টি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান ২২১ কোটি টাকা দর দেয়। এনসিটিবির নির্ধারিত দরের চেয়ে এটি ১০৯ কোটি টাকা কম। এ দরের কারণেই বিশ্বব্যাংক বই ছাপার মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও নতুন শর্ত আরোপ করে। কারণ প্রাথমিকের বিনা মূল্যের বইয়ের মোট খরচের সাড়ে ৯ শতাংশ দেয় বিশ্বব্যাংক। বাকি টাকা দেয় সরকার। এতে প্রায় ১৯ কোটি টাকা পাওয়া যায় বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। আর এই টাকা পাওয়ার শর্ত হিসেবে কার্যাদেশ দেওয়ার আগে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

জানা গেছে, জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) যথাসময়েই তাদের টেন্ডারপ্রক্রিয়া শুরু করলেও এখন ত্রিপক্ষীয় সংকটে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে গতকাল বুধবার বিকেল ৩টায় সর্বনিম্ন দরদাতা ২২টি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় বসে এনসিটিবি। কিন্তু সেখানেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিশ্বব্যাংকও তাদের নতুন শর্তে অটল রয়েছে। মুদ্রণকারীরা টেন্ডার অনুযায়ী কাজ করতে চায়।

সভা সূত্রে জানা যায়, মুদ্রণকারীরা বলছে, তারা প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর এই কাজ করতে চায়, তবে তা হবে দরপত্রের শিডিউল অনুযায়ী। তাহলে তারা ৯৮ দিন নয়, ৬০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করে দেবে। কিন্তু এনসিটিবি চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল তাদের সে কথায় রাজি হননি। বিশ্বব্যাংকের নতুন শর্তানুসারে তাদের কার্যাদেশ নিতে অনুরোধ করেছেন। এতে অমীমাংসিতভাবেই সভা শেষ হয়েছে।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি শহীদ সেরনিয়াবাত গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘এনসিটিবি আমাদেরকে যে কার্যাদেশ বা নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড- এনওএ দিতে চেয়েছে তা বেআইনি, পিপিআর-পরিপন্থী; দেশীয় প্রেস মালিকদের জন্য অবমাননাকর। আমাদেরকে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের সন্তুষ্টি সাপেক্ষে বিল নিতে হবে। কিন্তু কিভাবে সন্তুষ্টি অর্জন করব তা বলা হয়নি। আসলে এটি পদ্মা সেতুর মতো একটি ষড়যন্ত্র। তবে আমরা এই ফাঁদে পা দিইনি। তাই আজকের সভায় কোনো সুরাহা হয়নি। এনসিটিবি যদি শিডিউলের শর্তের বাইরে কোনো এনওএ দেয় তাহলে তা পাওয়ার পর আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

জানা যায়, প্রাথমিকের পাঠ্য বই মুদ্রণ নিয়ে যে ত্রিপক্ষীয় সংকট চলছে, তার এক পক্ষ মুদ্রণকারী, দ্বিতীয় পক্ষ বিশ্বব্যাংক আর তৃতীয় পক্ষ এনসিটিবি। তবে এনসিটিবি একটি পক্ষ হলেও তাদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। তারা বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব মুদ্রণকারীদের দিচ্ছে। আর মুদ্রণকারীদের কথা বিশ্বব্যাংককে জানাচ্ছে। তাদের নিজেদের কোনো সিদ্ধান্ত বা ছাড় দিয়ে সমঝোতা করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সঠিক সময়ে কাজ শুরু করতে না পেরে তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছে।

এসব বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘আসলে আমরা সুখবর দেওয়ার মতো কোনো জায়গায় পৌঁছতে পারিনি। তবে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে বেশি কম দর পাওয়ায় বিশ্বব্যাংক কিছু শর্ত যোগ করেছে। বিনা মূল্যে বই প্রদান সরকারের একটি বড় উদ্যোগ। এ জন্য আমরা মুদ্রণকারীদের সহায়তা চাই। কোনো সমাধানে না পৌঁছানোর বিষয়টি প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীকে জানাব। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশানুসারেই পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’

এনসিটিবি কর্মকর্তারা বলেন, ‘প্রাথমিকের বই প্রায় ১১ কোটি। অন্যদিকে মাধ্যমিক, দাখিল, কারিগরি, ইবতেদায়ির বই প্রায় ২২ কোটি। প্রাথমিকের কাজ আন্তর্জাতিক টেন্ডারে হলেও অন্যান্য বই দেশীয় টেন্ডারে হচ্ছে। দেশীয় মুদ্রাকররা যদি ২২ কোটি বইয়ের কাজ সঠিকভাবে করতে পারে তাহলে ১১ কোটি বইয়ের কাজ করতে পারবে না কেন? আসলে কোনো একটি মহলকে সুবিধা দিতে বিশ্বব্যাংক কিছু খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। আর বর্তমানে আমাদের প্রেস উন্নত। যদি ৫০ কোটি বইয়ের কাজও হয় তাও সঠিকভাবে শেষ করতে আমাদের প্রেসগুলো সক্ষম।’

জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমতি নিতে গিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে এনসিটিবি। বাজারদরের চেয়েও কম দামে বই ছাপার দর দেওয়ায় বিশ্বব্যাংক কাগজের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তারা বইয়ের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাইয়ের মান নিশ্চিত করার অঙ্গীকার চায়। সে অনুযায়ী টেন্ডারের বাইরেও নতুন কিছু শর্ত জুড়ে দিয়ে এনওএ ছাড় দেয় বিশ্বব্যাংক। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব টিম বই ছাপা-পূর্ব, ছাপাকালীন এবং ছাপা-পরবর্তী পরিদর্শন, তদারকি, দেখভাল করবে। ছাপার আগে কাগজের নমুনা, ছাপার নমুনা এবং বই বাঁধাইয়ের পর বইয়ের নমুনা তাদের কাছে পাঠাতে হবে। ছাপার সময় তাদের টিম আকস্মিক যেকোনো প্রেস পরিদর্শন করতে পারবে। বই ছাপা শেষে উপজেলায় পৌঁছানোর পর তা আবার নিরীক্ষা হবে। ছাপা কাজের গুণগত মান নিশ্চিত হলেই কেবল ছাপার বিল দেওয়া হবে। এ ছাড়া মুদ্রণকারীদের জামানত বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার শর্ত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হলেও বিল দেওয়া হবে ৩০ মার্চের মধ্যে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক অবিশ্বাস্য কম মূল্য বললেও আসলে তা নয়। বরং যৌক্তিক দরই দিয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রণকারীরা। কারণ গত বছর কাগজের ব্রাইটনেস ৮৫ চাওয়া হলেও এবার তা ৮০ চাওয়া হয়েছে। ফলে সবক্ষেত্রে খরচ কমে আসবে। আর ভারতীয় মুদ্রণকারীদের পরিবহন খরচের কারণে দেশীয় মুদ্রণকারীদের খরচ অনেক কম। আর সর্বনিম্ন দরদাতাদের অবিশ্বাস্য কম মূল্য বলা হলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতীয় মুদ্রণকারীরাও এবার সেই অবিশ্বাস্য কম দরই দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রণকারীদের চেয়ে তারা মাত্র চার শতাংশ দর বেশি দিয়েছে। ফলে এবার যে শুধু বাংলাদেশি মুদ্রণকারীরাই কম দর দিয়েছে তা নয়; ভারতীয়রাও দিয়েছে। আর এত দিন শিল্প হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রণশিল্প গড়ে না উঠলেও সম্প্রতি তারা সেই সক্ষমতা লাভ করেছে। কারণ বইয়ের সব মুদ্রণই এখন হয় অটোমেশনে। ফলে আগের চেয়ে এমনিতেই খরচ অনেক কমে যায়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে মাত্র ১৯ কোটি টাকা নেওয়া হয় বলে অনেকেই বলছে তা না নিলেই হয়। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কারণ এই বই ছাপার বিষয়টি প্রাইমারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (পিইডিপি-৩) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই প্রকল্পের ২২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। তাই প্রাথমিকের বই ছাপানোর টাকা না নিতে চাইলে পিইডিপি-৩ প্রকল্পই সংশোধন করতে হবে। কিন্তু সেটা করা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। চলতি বছরে তো তা সম্ভবই নয়। আর ১৯ কোটি টাকা না নিলে বিশ্বব্যাংক পুরো ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েই নতুন চিন্তা করতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাংককে সঙ্গে রেখেই কাজ করতে হবে।

নাম প্রকাশ না করে সর্বনিম্ন দরদাতাদের একজন গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শুরু থেকেই আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট। যেভাবেই কাজ করি না কেন, তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখন ছাপার আগে কাগজের এক ধরনের ব্রাইটনেস থাকে, ছাপার পর তা ভিন্ন হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সব স্পেসিফেকশেন কিছু কমবেশি হতেই পারে। সেটা যদি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ধরে তাহলে তো আমরা বিলই পাব না। আর দরপত্রে পার্ট বাই পার্ট টাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শর্তে বলছে, কাজ শেষে। তাহলে আমরা কাজ করব কিভাবে?’

তিনি আরো বলেন, ‘দরপত্র আর নতুন শর্তের বিরাট ফারাক হলেও এনসিটিবি তো কোনো ভূমিকাই পালন করছে না। টাকাও নিতে হবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সন্তুষ্টির ওপর। তাহলে এনসিটিবির কাজ কী? তারা টাকা দেওয়ার গ্যারান্টি দিক, আমরা কাল থেকেই কাজ শুরু করব। আসলে দেশীয় মুদ্রণশিল্প ধ্বংস করতে এটা একটা চক্রান্ত।’

অর্ণব ভট্টজাতীয়
অঅ-অ+ প্রতিবছর আগস্ট মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রাথমিকের পাঠ্য বই ছাপানোর কাজ। কিন্তু এবার বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও এখনো মুদ্রণের কার্যাদেশ বুঝে নেয়নি সর্বনিম্ন দরদাতারা। অথচ কার্যাদেশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে সম্মতিপত্র দিতে হয় মুদ্রণকারীদের। এরপর ২৮ দিনের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হবে। তারপর ৯৮ দিনের মধ্যে সব কাজ...