pic-22_266480
সদ্য অনুমোদিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল সন্তুষ্ট করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। গ্রেড পুনর্নির্ধারণ ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা। গতকাল মঙ্গলবার ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই পালিত হয়েছে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি। ক্লাস-পরীক্ষা কিছুই হয়নি। এখন শিক্ষকরা তাকিয়ে আছেন ‘বেতন বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র দিকে। মূলত সচিবদের সঙ্গে অধ্যাপকদের মর্যাদার বৈষম্য নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের করা এক মন্তব্যে শিক্ষকরা আরো ফুঁসে উঠেছেন। এমনকি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের কর্মসূচির বাইরে গিয়ে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ বুধবার ও কাল বৃহস্পতিবার কর্মবিরতি পালিত হবে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরেকটিতে আজ থেকে রবিবার পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি চলবে।

শিক্ষকদের আন্দোলনে চরম বিপাকে পড়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী। আন্দোলনের কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই সেশনজট দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানায়, দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার। এর মধ্যে অধ্যাপক তিন হাজার ৯০০, সহযোগী অধ্যাপক এক হাজার ৬০০, সহকারী অধ্যাপক এক হাজার ৮০০ এবং প্রভাষক আছেন প্রায় ছয় হাজার। প্রভাষক পদে যোগদানের পর সহকারী অধ্যাপক হতে সময় লাগে তিন বছর। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক হতে সময় লাগে পাঁচ বছর। তবে পিএইচডি ও প্রকাশনা না থাকলে সময় লাগে ছয় থেকে সাত বছর। সহযোগী থেকে অধ্যাপক হতে সময় লাগে কমপক্ষে চার বছর। তবে পিএইচডি ও প্রকাশনা না থাকলে সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় বছর। যদি একজন শিক্ষকের যথাসময়ে পিএইচডি ও সব ধরনের প্রকাশনা থাকে, তাহলে তিনি সর্বনিম্ন ১২ বছরে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হতে পারেন। তবে এভাবে অধ্যাপক হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা। সাধারণত অধ্যাপক হতে গেলে ১৪ থেকে ১৬ বছর সময় লেগে যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অধ্যাপকের এক-চতুর্থাংশ সিলেকশন গ্রেড পায়। সাধারণত অধ্যাপক হওয়ার ১৫ থেকে ১৬ বছরের আগে শিক্ষকদের সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার সুযোগ খুবই কম। আর এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র অধ্যাপকের সংখ্যা ৯৬২।

অন্যদিকে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর একজন কর্মকর্তার উপসচিব হতে সময় লাগে কমপক্ষে ১২ বছর। আর চাকরি জীবনের ১৮ বছর পার করার পরই যুগ্ম সচিব হতে পারেন তারা। আর অতিরিক্ত সচিব পার হয়ে সচিব হতে সময় লাগে চাকরি জীবনের কমপক্ষে ২৮ বছর। এখন সরকারের সিনিয়র সচিব ও সচিবের পদ রয়েছে ৭৮টি।

জানা যায়, সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত সিনিয়র অধ্যাপকরা সপ্তম বেতন স্কেলে সচিবদের সঙ্গেই প্রথম গ্রেডে বেতন পেতেন। অষ্টম বেতন স্কেলেও তাঁরা উভয়েই প্রথম গ্রেডে বেতন পাবেন। কিন্তু গ্রেড-১-এর আগে বিশেষ দুটি গ্রেড করা নিয়েই নাখোশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কারণ, বিশেষ গ্রেডে রাখা হয়েছে সিনিয়র সচিবদের। এখন সিনিয়র অধ্যাপকরাও সিনিয়র সচিবদের সমান মর্যাদা ও বেতন চান। এ নিয়ে শিক্ষকরা চার মাস ধরে আন্দোলন করছেন। কিন্তু এর পরও গত সোমবার সিনিয়র অধ্যাপকদের গ্রেড-১-এ রেখেই মন্ত্রিসভায় নতুন পে-স্কেল অনুমোদন হলে শিক্ষকরা আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। সিনিয়র অধ্যাপক ছাড়া অন্য অধ্যাপকরা অষ্টম বেতন স্কেলে বেতন পাবেন গ্রেড-২-তে। কিন্তু শিক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, সিলেকশন গ্রেড উঠে গেলে পরবর্তী সময়ে সব অধ্যাপকই গ্রেড-২-তে চলে যাবেন। তবে সচিবদের গ্রেডের কোনো হেরফের হবে না। এতে পরবর্তী সময়ে সচিবদের সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদার ফারাক আরো বাড়বে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন সম্পর্কে গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, ‘কোনো জাস্টিফিকেশন নেই। আমি সবচেয়ে আশ্চর্য হচ্ছি এ কারণে, দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত একটা গোষ্ঠী জ্ঞানের অভাবের ফলে এ রকম আন্দোলন করতে পারছে। বেতন কাঠামোতে কী হয়েছে? কোথায় তাঁদের মর্যাদাহানি হয়েছে? আমার জানা নেই। তাঁদের যে করাপ্ট প্র্যাকটিসেস, সেগুলো কন্ট্রোল করা দরকার। প্রত্যেক শিক্ষকই সহকারী প্রফেসর হয়। এর পরে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, প্রফেসর হয়। এসব পদে কোনো আইন-কানুন না মেনে ইচ্ছামতো প্রমোশন দেওয়া হয়। এটা আমি মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করব বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো সিস্টেমটাকে আমলাতন্ত্রের মতো করে ব্যবস্থাপনা করার বিষয়ে। আমরা ২০ লাখ জনবলের যেভাবে ব্যবস্থাপনা করছি, সেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক লাখ মানুষের কন্ট্রোল করা হবে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত শিক্ষকদের ব্যবহারে।’

অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইচ্ছামতো অসংখ্য প্রফেসর। যত প্রফেসর আছে, লেকচারার, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর পদে ততজন নেই। লেকচারার পদে সবচেয়ে কম। এটা কোনো প্রফেশন হলো? ওপরে নিজেরা নিজেদের প্রমোশন দিয়ে দিচ্ছে। এটা রিফর্ম করা দরকার। প্রমোশনে একটা নীতি থাকা উচিত, এটা হওয়া উচিত পিরামিড আকৃতির। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উল্টো পিরামিড আকৃতির হয়ে গেছে। এটা কেন? এ অবস্থা চলতে পারে না। এর সংস্কার প্রয়োজন।’

গতকাল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাপারে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘উনি (অর্থমন্ত্রী) ভুল তথ্য দিচ্ছেন। শিক্ষকদের পাবলিকেশন, গবেষণা, পিএইচডি করা লাগে। কিন্তু প্রশাসনে এগুলো লাগে না বললেই চলে। আর দুজনের কাজের ধরনও আলাদা। একজন শিক্ষককে সিলেশন গ্রেড পেতে কিন্তু প্রায় ৩০ বছর লেগে যায়। কারণ অধ্যাপক হওয়ারও ১৬ থেকে ১৭ বছর পর তাঁরা সিলেকশন গ্রেড পান। আসলে তাঁর (অর্থমন্ত্রীর) জ্ঞানের স্বল্পতা আছে। তিনি না জেনেই মন্তব্য করেছেন। আমাদের কর্মসূচিতে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা যাতে বিঘ্ন না হয় সে বিষয়টি আমরা মাথায় রেখেছি। বৃহস্পতিবার (আগামীকাল) আমরা বসে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে আলোচনা করব। তবে যেহেতু বৈষম্য দূরীকরণ কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করবে, তাই তাদেরও সুযোগ আমরা দেব।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের জন্য অবমাননাকর। ১২ বছরে কেউ অধ্যাপক হন, এমন ঘটনা খুবই কম। আমারই তো ১৭ বছর লেগেছে। এরও অনেক পরে সিলেকশন গ্রেড। পুরোটা না জেনে তাঁর (অর্থমন্ত্রী) এমন কথাবার্তা বলা ঠিক নয়। আমরা আমাদের দাবি ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে বুধ (আজ) ও বৃহস্পতিবার (কাল) পূর্ণ দিবস কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছি।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আর এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে তিনি (অর্থমন্ত্রী) এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। আমরা ইতিমধ্যেই সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় এ মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছি। আশা করব, অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেবেন।’

জানা যায়, ফেডারেশনের পরবর্তী কর্মসূচি ছিল আগামী রবিবার। ওই দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া ওই দিন সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বাক্ষরসংবলিত স্মারকলিপি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকালের পূর্ণ দিবস কর্মসূচি শেষে পরবর্তী কর্মসূচি পালিত হবে কি না, তা পরিষ্কার করেননি শিক্ষক নেতারা। আগামীকাল ফেডারেশনের সভা শেষে কর্মসূচির ব্যাপারে জানানো হবে।

তবে ফেডারেশনের কর্মসূচির বাইরে গিয়ে ইতিমধ্যে জগন্নাথ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আজ ও কাল পূর্ণ দিবস কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আগামী রবিবার পর্যন্ত টানা কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে।

পূর্ণ কর্মবিরতি পালিত : গতকাল সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করেন। কোনো ক্লাস-পরীক্ষাই হয়নি। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও তেমন একটা ছিল না। আর সব বিশ্ববিদ্যালয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে সমাবেশ।

গতকাল কর্মবিরতি চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সকাল সাড়ে ১১টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে মৌন মিছিল বের করেন। টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বর ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছে শেষ হয় মিছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ শিক্ষক এতে অংশ নেন।

আমাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা জানান, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, বুয়েট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়েই পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালিত হয়েছে।

নৃপেন পোদ্দারজাতীয়
সদ্য অনুমোদিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল সন্তুষ্ট করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের। গ্রেড পুনর্নির্ধারণ ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন তাঁরা। গতকাল মঙ্গলবার ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই পালিত হয়েছে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি। ক্লাস-পরীক্ষা কিছুই হয়নি। এখন শিক্ষকরা তাকিয়ে আছেন 'বেতন বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি'র দিকে। মূলত সচিবদের...