93019_f1
মৌলভীবাজারে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় সমাহিত হলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহরের সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণস্থ কবরস্থানে সমাহিত হন রণাঙ্গনের এই বীর মুুক্তিযোদ্ধা। এর আগে সিঙ্গাপুর, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার তিনদফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মহসিন আলীর কফিনে শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। এছাড়া, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই বীরমুক্তিযোদ্ধার কফিনে শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। উল্লেখ্য, গত ১৪ই সেপ্টেম্বর সকালে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মহসিন আলী। ১৫ই সেপ্টেম্বর রাতে তার মরদেহ দেশে আনা হয়।
শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা
গতকাল সকাল ৮টায় তার মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মানুষের ঢল নামে। সেখানে এক ঘণ্টা মরদেহ রাখা হয়। এরপর মরহুমের জানাজার জন্য জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে শহীদ মিনারে একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে প্রথমে গার্ড অব অনার দেয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড। এরপর সংগঠনটির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এরপর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাড. আফজাল হোসেন, হাবিবুর রহমান সিরাজ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজিত রায় নন্দী ফুল দিয়ে মন্ত্রীর কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। পরে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ, সাংবাদিক মুন্নী সাহা মন্ত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, সিলেট বিভাগীয় চাকরিজীবী পরিষদ, সমাজসেবা হাসপাতাল, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ কৃষক লীগ, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় শ্রমিক লীগ, সুনামগঞ্জ সমিতি, মৌলভীবাজার জেলা সমিতি, জালালাবাদ এসোসিয়েশন, হবিগঞ্জ এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ, মহাকাল নাট্য পরিষদ, দিরাই এসোসিয়েশন, বিয়ানীবাজার সমাজকল্যাণ পরিষদসহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন শ্রদ্ধা জানায়।
সংসদ ভবনে দ্বিতীয় জানাজা
সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর দ্বিতীয় জানাজা জাতীয় সংসদের দক্ষিণপ্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজা শেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কফিনে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার প্রদর্শন করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন। পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ সিনিয়র নেতারা শ্রদ্ধা জানান। পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমু, সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, হুইপ আতিকুর রহমান আতিক, বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা ও রুহুল আমীন হাওলাদার এমপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর পক্ষ থেকে মইন উদ্দীন খান বাদল এমপি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনসহ সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন শ্রেণী পেশার প্রতিনিধিরা। পরে মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত হয়। এসময় শোকাহত মহসিন আলীর ছোট মেয়েকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদও তাকে সান্ত্বনা দেন। এর আগে সকাল পৌনে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে তার মরদেহ সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নেয়া হয়। এসময় সংসদ এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ১০টা ১০ মিনিটের দিকে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। জানাজার আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর বর্ণাঢ্য জীবনী তুলে ধরে চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, একজন রাজনীতিক হিসেবে সবচেয়ে বড় পাওয়া গণমানুষের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। তা তিনি পেয়েছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত গণমানুষের নেতা হিসেবে বেঁচে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এই সৈনিককে দেশবাসী কখনোই ভুলবে না। তার স্মৃতি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অনন্তকাল জ্বল জ্বল করবে। আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্মৃতিচারণ করে বলেন, মহসিন আলীর মৃত্যুতে সিলেটের রাজনীতিতে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ বলেন, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে মহসিন ভাই অবদান রেখে গেছেন। তিনি মৌলভীবাজারের সকল মানুষের নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। মহসিন আলীর ছোটভাই সৈয়দ নওশের আলী পরিবারের পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা ও দোয়া চান। এরপর তার মরদেহ পুরাতন বিমানবন্দরে নেয়া হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারে নেয়া হয়।
মৌলভীবাজারে জানাজায় মানুষের ঢল
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় সৈয়দ মহসিন আলীর মরদেহবাহী হেলিকপ্টার মৌলভীবাজার এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে তার মরদেহ শহরের শ্রীমঙ্গল সড়কের নিজ বাসভবনে নেয়া হয়। এসময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সেখানে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন চোখের জলে বিদায় জানান তাদের প্রিয় অভিভাবককে। পরে ১টা ৩৮ মিনিটে বাড়ির সামনে একটি মঞ্চে রাখা হয় স্থানীয় এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। বেলা ২টায় তার মরদেহ আনা হয় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। শেষবারের মতো এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেন জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, জেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগ, প্রজন্ম লীগ, তরুণ লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ, হবিগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাব, ওসমানীনগর ছাত্রলীগ, মৌলভীবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ, মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতি, মৌলভীবাজার বিজনেস ফোরাম, মৌলভীবাজার সমিতি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, উত্তরণ খেলাঘর আসর, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মৌলভীবাজার ৭ উপজেলা আওয়ামী লীগ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অন্তত দুই শতাধিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিকাল পৌনে ৪টায় জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত মহসিন আলীর কফিনে জেলা পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকস দল বিউগল বাজিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। এরপর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক প্রকাশ কান্তি চেধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর বিকাল ৪টায় মৌলভীবাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল সোয়া ৫টায় শহরের হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে মা বাবার কবরের পাশে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। জানাজার আগে স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন চিফ হুইপ আসম ফিরোজ, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন, হুইপ আলহাজ শাহাব উদ্দিন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাড. মিজবাউদ্দিন সিরাজ, মন্ত্রীর ছোট ভাই সৈয়দ মোস্তাক আলী প্রমুখ। এসময় সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এমপি, মাহমুদুস সামাদ কয়েছ এমপি, মাহবুবুর রহমান এমপি, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুুরী এমপি, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট সিটির সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নেছার আহমদ, জেলা পরিষদ প্রশাসক আজিজুর রহমানসহ দলীয় নেতাকর্মীর ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
‘গান, আড্ডা আর দান ছিল তার প্রাণ’
ও কখনও তো এমন ছিল না। আড্ডা শেষ হলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেত। কিন্তু হঠাৎ সে আমাদের না বলে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করে কথাগুলো বলছিলেন সদ্য প্রয়াত সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর বাল্যবন্ধু শহরের শাহ মোস্তফা রোডের বাসিন্দা জহির ফারুক। জহির ফারুক ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বাল্যকাল থেকেই সৈয়দ মহসীন আলী ছিলেন সহানুভূতিশীল। বন্ধু ও সহপাঠীদের বিপদে সবার আগে তিনি এগিয়ে আসতেন। করতেন সার্বিক সহযোগিতা। এ অভ্যাসটি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। হাতে টাকা থাকলে তা গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। অসহায় মানুষদের সাহায্য-সহায়তা করা ছিল তার নেশা। ছোট বেলা থেকে তার এমন স্বভাবের কারণে বন্ধু মহলে তাকে দানবীর মহসিন বলতাম। বন্ধু মহলে আড্ডার মধ্যেও যদি কোন অসহায় লোক এসে সাহায্য চাইতো সে তার পকেট থেকে এবং অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওই ব্যক্তিকে দিত। অন্যকে খাইয়ে অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়েই মহসিন আলী আনন্দ পেতেন। সরল, স্পষ্টবাদী, বন্ধুবৎসল, আড্ডাবাজ, সামাজিকতা, খেলাধুলা আর সংস্কৃতির প্রতি উদারতায় তার কোন জুড়ি নেই। এমন পরোপকারী বন্ধুকে হারিয়ে আমি ও আমরা বন্ধুরা আজ বড় অসহায়। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আফজাল আহমদ চৌধুরী ও আবু আহমেদ গোলাম নবীসহ অনেকেই আড্ডা দিতেন মৌলভীবাজার শহরের চৌমুহনীর চৌধুরী ফার্মেসিতে। তার ঘনিষ্ঠ এই দু’বন্ধু মারা গেছেন অনেক আগেই। বর্তমানে চৌধুরী ফার্মেসির মালিক আফজাল চৌধুরীর ছোট ভাই আজমল আহমদ চৌধুরী যিনি বয়সে সমসাময়িক হওয়ায় এবং এক সঙ্গে লেখাপড়া করায় তিনি সৈয়দ মহসিন আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, বন্ধুও ছিলেন। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান তার বড় ভাই আফজাল আহমদ চৌধুরী, মন্ত্রী ও তার ভাই সৈয়দ মোস্তাক আহমদ এবং তিনি একই সঙ্গে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন। খেলাধুলায় আর পড়ালেখাও মন্ত্রী অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মহসিন আলী ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলা পছন্দ করতেন। ক্রিকেটে তিনি একজন ভাল অল রাউন্ডার ছিলেন। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানালেন, এই ফার্মেসির আগে এই স্থানে তাদের একটি ডেকোরেটর্সের দোকান ছিল তার ভাই এই দোকানটির দেখাশোনা করতেন। এই সুবাধে তখন থেকে তারা এখানে আড্ডা দিতেন। ১৯৮৩ সালের দিকে তারা ডেকোরেটর্সের ব্যবসা বাদ দিয়ে ফার্মেসি খোলেন। তখনও কয়েকজন বন্ধু ওখানে সন্ধ্যার দিকে নিয়মিত বসতেন আর তখন সঙ্গে থাকতেন স্বপন চক্রবর্তী (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী), সিদ্দিকুল হাসান তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী), মরহুম আবদুল ওয়াদুদ তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আবদুল মতিন ঠিকাদার (কলিমাবাদ), ইঞ্জিনিয়ার মনসুরুজ্জামান (টিলাবাড়ি), ডা. সুবিমল সিংহ চৌধুরী (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী) মরহুম আবু আহমদ গোলাম নবী প্রমুখ। গান, আড্ডা আর দান এই ছিল তার প্রাণ। সবসময় তিনি আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন। আড্ডার বিষয় ঠিক না থাকলেও দেশের চলমান রাজনীতি, খেলাধুলা, শিল্প ও সংস্কৃতি প্রাধান্য পেত। সবসময়ই বন্ধুদের খাওয়াতে পছন্দ করতেন তিনি। আড্ডায় খাদ্য তালিকায় থাকত ঝালমুড়ি, বাদাম, পিয়াজু, লাল চা, জিলাপি, মিষ্টি আর ফলের মওসুমে আম, লিচু, আনারস, পেয়ারা আর মাঝে মধ্যে থাকত কাঁঠাল। আজমল চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন ১৯৮৪ সালে ভয়াবহ বন্যা হয়। মহসিন আলী তখন ছিলেন পৌর মেয়র। আমিও কাউন্সিলর ছিলাম। এই বন্যার সময় পৌরসভার তেমন কোন ফান্ড ছিল না। তখন মহসিন আলী নিজে শ্রীমঙ্গল গিয়ে ব্যবাসায়ীদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা তুলে বন্যা দুর্গতদের সাহায্য করেছিলেন। এমনকি এই বন্যায় তিনি নিজে পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার এমন মহত গুণের কারণে এত দূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পেরেছেন। তার মৃত্যুতে আমরা একজন প্রকৃত জনদরদি বন্ধু ও জনদরদি রাজনীতিবিদকে হারালাম। তিনি জান্নাতবাসী হন এই দোয়া করছি ও সকলের কাছে এই দোয়া চাইছি। তার দীর্ঘ দিনের পৌরসভার সহকর্মী তৎকালীন কাউন্সিলর বর্তমান পৌরসভার প্যানেল মেয়র মনবীর রায় মঞ্জু ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন তার উদার আন্তরিকতা ও জনগণের প্রতি সেবামূলক মানসিকতার থাকার কারণে তিনি জনগণের ভোটে ৩ বারের পৌর মেয়র নির্বাচিত হতে পেরেছিলেন। তার মৃত্যুতে মৌলভীবাজারবাসী একজন অভিভাবক হারাল। আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে তার বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।
মৌলভীবাজার প্রেস ক্লাব সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক এম এ সালাম ও সাধারণ সম্পাদক এসএম উমেদ আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, সৈয়দ মহসীন আলী ছিলেন প্রকৃত সাংবাদিকদের বন্ধু আর অযোগ্য ও অপসাংবাদিকদের শত্রু। তিনি স্পষ্টবাদী থাকায় বাস্তব সত্য কথাগুলো কথার মারপ্যাঁচ ছাড়াই বলে ফেলতেন। তার সঙ্গে জেলার সাংবাদিকদের সু-সম্পর্ক ছিল। মন্ত্রী হওয়ার আগেও তিনি প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানগুলোতে নিজ ইচ্ছায়ই অংশ নিতেন। তিনি প্রকৃত সাংবাদিকদের বন্ধু মনে করতেন। তিনি নিজেও একসময় কিছু দিন সাংবাদিকতা করেছেন। আর সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের ভাল বলেই তার মেজো মেয়েকে সাংবাদিকতায় (অনার্স-মাস্টার্স) পড়িয়েছেন।
বাবা সৈয়দ মহসিন আলীকে নিয়ে যা বললেন তার সাংবাদিক মেয়ে শারমিন
সৈয়দ মহসিন আলীর মেজো মেয়ে সৈয়দা সানজিদা শারমিন তার ফেসবুকে লিখেছেন আর কোন জার্নালিস্ট মহসিন আলীর বকা খাবেন না। উনি আর কোন জার্নালিস্টের নিউজ সোর্সও হবেন না। একজন জার্নালিস্ট হয়ে বলছি, আপনারা সৈয়দ মহসিন আলীকে বুঝলেন না। উনিও আপনাদের বুঝিয়ে যেতে পারলেন না। এরকম একজন দুর্নীতিমুক্ত, সৎ এবং বহুমাত্রিক গুণাবলীর মানুষের কন্যা হওয়ার জন্য গর্ববোধ করি। আল্লাহ তুমি আমার বাবাকে ভাল রেখো।

অর্ণব ভট্টএক্সক্লুসিভ
মৌলভীবাজারে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় সমাহিত হলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শহরের সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণস্থ কবরস্থানে সমাহিত হন রণাঙ্গনের এই বীর মুুক্তিযোদ্ধা। এর আগে সিঙ্গাপুর, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার তিনদফা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মহসিন আলীর কফিনে শ্রদ্ধা...