1438102043

নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি থেকে বিএনপি সরে আসার পর এখন দলটির নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে শর্ত সাপেক্ষ নির্বাচনে রাজি তারা। এজন্য নেতারা সরকারের কাছ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ বেশ কিছু দাবি-দাওয়ার পূর্ণ বাস্তবায়ন চান। একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন যেকোনো মূল্যে একটি মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন চান। সেজন্য কিছু বিষয় ছাড় দিতেও তাদের আপত্তি নেই। বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতে হবে। এই তিন মন্ত্রণালয়ে দুই দল আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের বসাবেন। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বদলিয়ে সেখানে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করেই সবকিছু চূড়ান্ত করতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড।

জানা গেছে, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নয়’- এতদিন এমন দাবিতে অনড় থাকলেও দুইটি বড় আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে এ দাবি থেকে সরে আসতে হচ্ছে। এতোদিন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং পরামর্শকরা তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে ছাড় দেয়ার কথা বললেও সর্বশেষ বেগম খালেদা জিয়ার কথায়ও সে বিয়য়টি বেশ তীব্র হয়ে উঠে এসেছে। গত শনিবার রাতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে তার দলের অবস্থান তুলে ধরেন। এসময় তিনি দীর্ঘদিনের দাবি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নাম বাদ দিলেও নির্বাচনে আপত্তি নেই এমনটা জানান। ‘তত্ত্বাবধায়ক নয়, যে কোনো নামে একটি ‘নিরপেক্ষ’ সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মধ্যবর্তী নির্বাচন চান তিনি।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবিতে চলতি বছরের শুরুতে তিন মাস টানা হরতাল অবরোধ কর্মসূচির কোনো ফলাফল ছাড়াই যবনিকা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজতে থাকে বিএনপি। এজন্য পরামর্শ করতে দলের নেতাদের বাইরেও বিএনপিমনা পেশাজীবীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন বেগম জিয়া। সেই পেশাজীবীরাই পরামর্শ দেন যে, যেহেতু সংবিধানের আলোকে নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কড়া অবস্থান নিয়েছে, তাই তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে কিছুটা সরে আসা ছাড়া গত্যন্তর নেই। পেশাজীবীদের দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী সরকারকে নির্বাচনের পথে আনতে এ বিষয়ে যথাসম্ভব ছাড় দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়।

এ প্রসঙ্গে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, বর্তমার প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে বহাল রেখে নির্বাচন হলেও আপত্তি নেই। কোন সমস্যাও দেখছি না। তবে নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই স্বরাষ্ট্র, তথ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতে হবে। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনবেন না এমন গ্রহণযোগ্য কাউকে এই তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।

জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা চাই একটি সংলাপ হোক। এসব ব্যাপারে সংলাপ খুব জরুরি। আমরাতো প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিচ্ছি ,তা হলে কেন সংলাপ হতে পারে না? একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে কিছু ছাড় দিতে হবে। সংলাপে বসলে আশা করি অবশ্যই সমাধান বের হবে। কিন্তু আগেই যদি বলা হয় সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন হবে না তাহলে তো সংলাপের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, আমাদের দলীয় ফোরামে খুব শিগগিরই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

বিএনপির থিঙ্কট্যাঙ্ক খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বর্তমান সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপতি স্বপদে থাকলেও নির্বাচনে বিএনপির আপত্তি নেই। তবে এজন্য বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে। তবে এমন পরিবেশ তৈরির জন্য সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সমঝোতার দরকার। তিনি বলেন,আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক বাতিল হওয়ায় এ নিয়ে কথা বললে আদালত অবমাননার অভিযোগও তোলা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় খালেদা জিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত অবস্থান যথার্থ বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

ড. এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজাতে হবে। নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত আইন-শৃংখলাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হতে হবে নিরপেক্ষ। মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে রেখেই একটি সরকার গঠিত হবে। শর্ত চারটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি থাকবে না ।

প্র্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয় বিএনপি। পরে এই ব্যবস্থায় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। একই ব্যবস্থায় ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি জামায়াত জোট। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের জুন মাসে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেন সুপ্রিম কোর্ট। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে মাঠে নামে বিএনপি। একই দাবিতে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে তারা অবরোধ-হরতালের আন্দোলন চালায়। কিন্তু নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। আওয়ামী লীগ সংবিধানের আলোকে সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়। পরে আবারও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন চেয়ে চলতি বছরের শুরুতে তিন মাস টানা হরতাল অবরোধ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো ফলাফল ছাড়াই কর্মসূচি শেষ হয়ে যায়।

শুভ সমরাটপ্রথম পাতা
নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি থেকে বিএনপি সরে আসার পর এখন দলটির নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে শর্ত সাপেক্ষ নির্বাচনে রাজি তারা। এজন্য নেতারা সরকারের কাছ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ বেশ কিছু দাবি-দাওয়ার পূর্ণ বাস্তবায়ন চান। একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে...