1442082792
শিক্ষার্থীদের ভ্যাট ইস্যু নিয়ে জটিলতা কাটছে না। বরং সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে একেকবার একেক রকম বক্তব্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে শিক্ষা। যেখানে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে সরকারের উদ্যোগ রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা উদ্যোগের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। সেখানে ভ্যাট আরোপ করে শিক্ষাকে প্রকারান্তরে ‘ব্যয়বহুল’ করা হচ্ছে। এটা অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক। এমনটিই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ-অভিভাবকেরা।

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ভোক্তা বা সেবা গ্রহিতাকেই ভ্যাট দিতে হয়। সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হচ্ছে ভ্যাট সংগ্রহকারী এবং তা সরকারের কোষাগারে জমা প্রদানকারী। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোত্থেকে ভ্যাট দেবে? প্রকৃতপক্ষে এটি শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই পড়বে। শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, শিক্ষা কোন ভাবে পণ্য বা সেবা হতে পারে না। তাহলে কেন শিক্ষার ওপর ভ্যাট হবে? শিক্ষা মৌলিক অধিকার। তাদের প্রশ্ন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি না হতে পারা শিক্ষার্থীদের জন্য দেশে শিক্ষা লাভের বিকল্প সুযোগ তৈরি হয়েছে। উন্নয়নের শিখরে পৌঁছতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’ যদি হয়— তবে কেন ভ্যাট আরোপের নামে ব্যয় বাড়িয়ে প্রবাহমান শিক্ষায় বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে ?

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপের বিধান অযৌক্তিক। সেই সঙ্গে এটি বৈষম্যমূলকও। কেননা,এখানে সবাই ধনী পরিবারের সন্তান নয়। স্বচ্ছল পরিবারের পাশাপাশি অনেক অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাও লেখাপড়া করছে। শিক্ষা মৌলিক অধিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়ের ওপর কর আরোপ করা যায় না।’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, শিক্ষা কোন পণ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কোনো ‘ইনকাম গ্রুপ’ নয়। তাই তাদের কাছ থেকে কর আদায় না করার সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।

অভিভাবকরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলছেন, সরকার যদি রাজস্ব আদায় বাড়াতেই চায় তবে ফাঁকিগুলো বন্ধ করুক। অনেক খাত রয়ে গেছে যেসব খাত থেকে সরকার শতভাগ ভ্যাটের অর্থ আদায় করতে পারে না। রাজস্ব বিভাগ সেসব খাতে ভ্যাট আদায় বৃদ্ধি করুক। শিক্ষিত জাতি গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এমন সিদ্ধান্ত পরিহার করারও দাবি জানান তারা।

বিভ্রান্তি: সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকে এই ভ্যাট নিয়ে ভিন্ন রকম বক্তব্য আসায় বিভ্রান্তি বাড়ছে। অর্থমন্ত্রী গতকাল বলেছেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর আগে তিনি বলেছেন, আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীদের ভ্যাট দিতে হবে। তারও আগে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই ভ্যাট দিতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না। এ জন্য তাদের ফি বাড়বে না। আবার শুক্রবার অর্থমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বললেন, এক বছরের জন্য শিক্ষার্থীদের ভ্যাট দিতে হবে না। তবে পরের বছর থেকে তাদের ফি’র সঙ্গে তা হিসাবভুক্ত হবে। প্রকারান্তরে তিনি বললেন, এক বছর পর থেকে শিক্ষার্থীদেরই ভ্যাট দিতে হবে।

গতকালও রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক জন ছাত্র দৈনিক এক হাজার টাকা খরচ করে। সেখান থেকে আমি ৭৫ টাকা (সাড়ে ৭ শতাংশ হিসেবে) চেয়েছি। এটি বড় কিছু নয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে এটি পরিস্কার যে চূড়ান্ত বিবেচনায় ভ্যাট দিতে হবে শিক্ষার্থীদেরই। এ পরিস্থিতিতে গতকালও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে। অনেক জায়গায় তারা স্বল্প পরিসরে সড়কও অবরোধ করে।

এদিকে এনবিআরের ব্যাখ্যাই সঠিক বলে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাখ্যায় এটি সুষ্পষ্ট করা হয়েছে যে ভ্যাটের জন্য টিউশন ফি বাড়ানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে ভ্যাট প্রদান করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে যে বক্তব্য দিয়েছেন এনবিআরের অবস্থানও তা-ই।’ অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, আগামীতে কীভাবে ভ্যাট আদায় হবে সেটি সবার সাথে আলোচনা করে পরে ঠিক করব। এই মুহূর্তে কীভাবে আদায় হবে সেই নির্দেশনা সুষ্পষ্ট করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে তিনি বিদ্যমান ভ্যাট আইনের বিধিমালার ৪৩(৪) ধারার কথা উল্লেখ করেন। এ ধারায় বলা হয়েছে, যে ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পণ্য বা সেবার বিবরণীতে বা চালানপত্রে ভ্যাট এর পরিমাণ আলাদাভাবে দেখানো হবে না সেক্ষেত্রে সর্বমোট প্রাপ্ত অর্থে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

অবশ্য এনবিআরের এমন ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা, এমনকি এনবিআরের সাবেক কোন কোন কর্মকর্তাও। এনবিআরের সাবেক সদস্য ও নতুন ভ্যাট আইন পর্যালোচনার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির প্রধান আলী আহমেদ মনে করেন, এনবিআর ব্যাখ্যা দিতে ভুল করেছে। ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে তিনি বলেন, ভ্যাটের সাধারণ নিয়ম হলো এর বোঝা পড়বে চূড়ান্ত ভোক্তার উপর। কিন্তু এনবিআর বলছে, ভ্যাট শিক্ষার্থীরা দেবে না।

অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, এনবিআরের ব্যাখ্যা ভ্যাটের মূল চেতনার পরিপন্থী। এছাড়া রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদসহ সমাজের বড় অংশই শিক্ষা খাতে ভ্যাট না রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। তারা বলছেন, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগের স্বল্পতায় বেসরকারি খাত গড়ে উঠেছে। এ জন্য সরকারকে কোন ব্যয় করতে হচ্ছে না। এখন ওই শিক্ষা ব্যবস্থার কাছ থেকে উল্টো টাকা (ভ্যাট) চাওয়া যৌক্তিক নয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কি পরিমাণ ভ্যাট প্রাক্কলন করা হয়েছে সে বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুষ্পষ্ট কোন তথ্য দিতে পারেন নি। তবে অসমর্থিত একটি সূত্রে জানা গেছে, এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা আসতে পারে।

ক্ষোভ অভিভাবকদের: শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাটের অর্থ আদায় করেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভািভাবক মহিউদ্দিন আহমেদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার তিনি ভ্যাটসহ টিউশন ফি পরিশোধ করেছেন। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আজিজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার সন্তানের কনভোকেশন ফি ও অন্যান্য ফি পরিশোধ করার সময় তার কাছ থেকে ভ্যাট হিসাবে ২ হাজার ৮শ’ টাকা বাড়তি নেয়া হয়েছে। যার কোন যৌক্তিকতাই নেই।

এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে ভ্যাট আরোপের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান আইনে এ ধরনের কর্তৃপক্ষের উপর ভ্যাট আরোপ করা যায় কি না তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিগত প্রায় ৮ বছর ধরে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায় ভ্যাট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। এতদিন এসব প্রতিষ্ঠান ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিয়ে আসছিল। তবে এবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও মেডিক্যাল কলেজের মত ওইসব ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। অভিভাবকরাও এ নিয়ে ক্ষুব্ধ। ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়ামে ছেলেমেয়েকে পড়ান সালেহউদ্দিন। তার মতে, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে এখন শুধু উচ্চবিত্তদের সন্তানেরাই পড়ে না, বরং মধ্যবিত্তদের সন্তানরাও পড়ছে। ঢাকায় যে হারে শিক্ষাকে ব্যয়বহুল করা হচ্ছে তাতে জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় আমরা যত দ্রুত এগুচ্ছিলাম, ততই পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিনি শিক্ষার ওপর আরোপ করা এই ভ্যাট অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

মিস্টি রহমানপ্রথম পাতা
শিক্ষার্থীদের ভ্যাট ইস্যু নিয়ে জটিলতা কাটছে না। বরং সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে একেকবার একেক রকম বক্তব্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে শিক্ষা। যেখানে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে সরকারের উদ্যোগ রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা উদ্যোগের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিদেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। সেখানে ভ্যাট...