86889_x8
ডেডলাইন ৮ই আগস্ট, ১৯৭১। দুর্জেয় হয়ে ওঠা ‘রাক্ষুসে সাচনা’ শত্রুমুক্ত করার দায়িত্ব পান ‘ইকোয়ান’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চৌকস ৩৬ জন যোদ্ধা। হালকা অস্ত্রে সজ্জিত কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে এ দলটি দুটি নৌকায় শনির হাওরের দীর্ঘ ২৫ মাইল উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে সাচনাবাজার আক্রমণ করেন। দীর্ঘ সম্মুখযুদ্ধে শত্রুমুক্ত হয় সুরমা নদীর তীরে ঢাকা-সিলেট নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ‘সাচনা’। সাচনা জয়ের পর মুহূর্তে পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের কভারিং ফায়ারে স্বাধীনতার স্লোগানরত সিরাজ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তার লাশ নিয়ে আসা হয় সীমান্তবর্তী টেকেরঘাট নামক স্থানে। সেখানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় শহীদ সিরাজকে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শহীদ সিরাজকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পরই এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে স্থানীয় জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বতঃস্ফূর্ত সভায় সাচনার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সিরাজনগর করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজ কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের কলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার এলংজুরী ইউনিয়নের ছিলনী গ্রামের এক কৃষক পরিবারে ১৯৪৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো. মোক্তুল হোসেন ও মাতার নাম গফুরেন্নেসা। সম্মুখসমরে শহীদ এ অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হওয়ার মাত্র ৮ দিন আগে তার প্রিয় বাবার কাছে শেষ চিঠি লিখে যান। সাবেক অধ্যক্ষ দীপক কুমার নাগের উদ্যোগে সিরাজের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন গুরুদয়াল কলেজ চত্বরে তার একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে খোদাই করে দেয়া আছে সিরাজের শেষ চিঠিটিও।
টেকেরহাট থেকে: ৩০-৭-১৯৭১ইং
প্রিয় আব্বাজান,
আমার সালাম নিবেন। আশা করি খোদার কৃপায় ভালোই আছেন। বাড়ির সকলের কাছে আমার শ্রেণীমত সালাম ও স্নেহ রইল। বর্তমানে যুদ্ধে আছি আলী রাজা, রওশন, সাত্তার, রেনু, ইব্রাহিম ফুল মিয়া সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করেছি। আমাদের জন্য ও দেশ স্বাধীন হবার জন্য দোয়া করবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। কেননা দেশ স্বাধীন না হলে জীবনের কোন মূল্য থাকবে না। তাই যুদ্ধকেই জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদের ক্ষমা করবো না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করতে হবে। চাচা-মামা, বড় ভাইদের নিকট আমার সালাম। বড় ভাইকে চাকুরীতে নিয়োগ দিতে না করবেন। জীবনের চেয়ে চাকুরী বড় নয়। দাদুকে দোয়া করতে বলবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হতে পারে এবং মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত। দোয়া করবেন মৃত্যু হলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ লাখ ছেলে পুত্রহারাদের বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন। আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নাই। আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন তবেই আপনার সকল সাধ মিটে যাবে।
দেশবাসী, স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া করো। মীরজাফরী করো না। কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদের ক্ষমা করবে না এবং বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।
সালাম দেশবাসী সালাম
ইতি
সিরাজুল ইসলাম
তার আত্মত্যাগের স্মৃতি সতীর্থ সহযোদ্ধাদের আজও ভারাক্রান্ত করে। শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রমের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের ইটনা সমিতি শহীদ সিরাজের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে জেলা পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বিকালে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মালেক ভূঁইয়া।

তাহসিনা সুলতানাএক্সক্লুসিভ
ডেডলাইন ৮ই আগস্ট, ১৯৭১। দুর্জেয় হয়ে ওঠা ‘রাক্ষুসে সাচনা’ শত্রুমুক্ত করার দায়িত্ব পান ‘ইকোয়ান’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের চৌকস ৩৬ জন যোদ্ধা। হালকা অস্ত্রে সজ্জিত কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে এ দলটি দুটি নৌকায় শনির হাওরের দীর্ঘ ২৫ মাইল উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে সাচনাবাজার আক্রমণ করেন। দীর্ঘ সম্মুখযুদ্ধে শত্রুমুক্ত হয় সুরমা নদীর তীরে...