91037_f1
রক্তের অন্য নাম জীবন। কিন্তু এই জীবন- লাল রক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কালো ব্যবসা। জীবন বাঁচানোর বদলে হচ্ছে জীবনহানি। রক্ত ব্যবসায়ী ও দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্র লাল রক্তকে পুঁজি করে নেমেছে সর্বনাশা খেলায়। অর্থ হাতিয়ে নিতে রক্ত কেনা-বেচার নামে রোগীদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, রক্তের পরিমাণ বাড়াতে এতে মেশানো হচ্ছে স্যালাইন। সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত ব্লাডব্যাংক রয়েছে রাজধানীতে ৫৯, ঢাকার বাইরে ৩৫টি। সব মিলিয়ে ৯৪টি। কিন্তু বাস্তবে শুধু রাজধানীতেই রয়েছে দেড় শতাধিক ব্লাডব্যাংক। নামে-বেনামে চলছে এসব ব্লাডব্যাংক। রক্ত বিক্রি হচ্ছে সাধারণ পণ্যের মতো। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই চলছে বেশির ভাগ ব্লাডব্যাংকের কার্যক্রম।
সূত্রমতে, দেশে প্রতিবছর গড়ে ৮ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ব্লাডব্যাংক থেকে সংগ্রহ হয় অর্ধেকেরও বেশি রক্ত। রাজধানীর শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, বক্ষব্যাধিসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ব্লাডব্যাংক। এরমধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে অনুমোদন ছাড়াই ব্লাডব্যাংকের কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে। ব্লাডব্যাংকগুলো পরিদর্শন করে দেখা গেছে নানা অনিয়মের চিত্র। নাজিম উদ্দিন রোড, পান্থপথ ও ধানমন্ডিতে সাইনবোর্ড ছাড়াই ব্লাডব্যাংকের কার্যক্রম চালাচ্ছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সকাল ও সন্ধ্যার পর এসব ব্লাডব্যাংকে রক্তাদাতাদের আনা-গোনা বেড়ে যায়। তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত। যাত্রাবাড়ীর লাইফ ব্লাড এন্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারের সামনে কথা হয় রক্তদাতা এক যুবকের সঙ্গে। নিজের নাম শরীফ বলে জানান ওই যুবক। আড়াই মাস আগে লাইফ ব্লাড এন্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারের রক্ত দিয়েছেন তিনি। বিনিময়ে ৩০০ টাকা পেয়েছিলেন। নিয়মানুসারে চার মাস পর ছাড়া আবার রক্ত দিতে পারেন না তিনি। তবু টাকার প্রয়োজনে রক্ত দিয়েছেন। একই অবস্থা পাওয়া গেছে নাজিম উদ্দিন সড়কের ক্রিয়েটিভ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারে। আশ-পাশের লোকজন জানান, সন্ধ্যার পর প্রায়ই মাদকাসক্তরা রক্ত দেন এই সেন্টারে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এই ব্লাডব্যাংকের পরিচালক হামিদুল ইসলাম। এই এলাকায় অনুমোদন না থাকলেও লাল রক্তের কালো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ডোনার ব্লাডব্যাংক। এই ব্লাডব্যাংকের রক্তদাতাদের অধিকাংশই মাদকসেবী। তার মধ্যে নিজাম, রহিম নামে দু’জন স্বীকার করেন যখন টাকা থাকে না তখন মাদকের জন্যই রক্ত বিক্রি করেন তারা। তবে ব্লাডব্যাংকগুলো প্রকাশ্যে এবং বেশি দামে তাদের রক্ত নিতে চায় না। নিজাম জানান, কয়েকদিন আগে ডোনার ব্লাডব্যাংকে রক্ত দিয়েছেন তিনি। বিনিময়ে তাকে মাত্র ১৫০ টাকা দেয়া হয়েছে। অল্প দামে রক্ত ক্রয় করলেও এসব রক্ত বিক্রি হয় ১৪০০ থেকে ৩০০০ টাকায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রক্তদাতা সংগ্রহের জন্য ব্লাডব্যাংকগুলোর নির্দিষ্ট দালাল রয়েছে। প্রতি রক্তদাতা সংগ্রহের জন্য দালালদের দেয়া হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। একই অবস্থা লাইফ সেভ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন, মেডিসিন লাইফ সেভ ডায়াগনস্টিক ও কলাবাগানের ক্রিসেন্ট রোডের গ্রীন ভিউ ক্লিনিকের। ব্লাড স্ক্যানিং ক্রস ম্যাচিং না করা এবং ব্লাড ব্যাগে সোর্স ও ডোনারের প্রয়োজনীয় তথ্য নেই এসব প্রতিষ্ঠানে। এসব কারণে গত ৩১শে জুলাই গ্রীন ভিউ ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করেছিলো ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বৃৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাওয়া যায় কয়েক দালালকে। রঞ্জু নামে এক দালালের কাছে ‘ও নেগেটিভ’ রক্তের প্রয়োজনের কথা বললে সে জানায় রক্ত দেয়া যাবে। তবে দাম একটু বেশি। ২০০০ টাকার বিনিময়ে রক্ত পৌঁছে দেবে হাসপাতালে। রক্তের উৎস গ্রীন রোডের মুক্তি ব্লাডব্যাংক। তার সঙ্গে যেতে চাইলে রঞ্জু জানায়, ওই প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে রক্ত কেনা-বিক্রি করে না। কারণ জানাতে পারেনি সে। পরবর্তীতে মুক্তি ব্লাডব্যাংকে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির শাটার লাগানো। দু’তলার সিঁড়ি দিয়ে উঠার পর দেখা যায় দরজার স্থানটকু খোলা। ভেতরে বসা ছিলেন কয়েক জন। এরমধ্যেই এক যুবক জানতে চান কেন এসেছেন? রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালে পেছনে বসে থাকা এক ব্যক্তির দিকে তাকান তিনি। জানান, রক্ত নেই। লাইসেন্স নবায়নের কাজ চলছে তাই কার্যক্রম বন্ধ। নিজের নাম মিজানুর রহমান বলে জানান তিনি। তবে সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব’র ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের আতঙ্কে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে রক্ত কেনা-বেচা বন্ধ রেখেছে। কারণ রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের বিধি অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল নেই প্রতিষ্ঠানটির।
সূত্রমতে, এসব প্রতিষ্ঠানে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ করে বিক্রি করা হয়। রক্তের সঙ্গে মেশানো হয় স্যালাইন। দেখা গেছে অধিকাংশ ব্লাডব্যাংকের ব্যাগে রক্তের পরিমাণ কম। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাগের অর্ধেকই খালি থাকে। এমনকি কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মাদকাসক্ত ও পেশাদার দাতাদের রক্ত সংগ্রহ করে এসব প্রতিষ্ঠান। লালমাটিয়ার ধানমন্ডি ব্লাডব্যাংক, শ্যামলী এলাকার ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ও মিরপুর রোডের বাংলাদেশ ব্লাডব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারে রক্তের সঙ্গে স্যালাইন মিশিয়ে বিক্রি করার বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে বিক্রি করছিল ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ও বাংলাদেশ ব্লাডব্যাংক। র‌্যাব’র ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ৮ই জুলাই দুপুরে প্রতিষ্ঠান দুটিতে অভিযান চালিয়ে ভেজাল ও পরীক্ষা করা ছাড়া রক্ত জব্দ করে। পাশাপাশি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে প্রতিষ্ঠান দুটিকে। র‌্যাব-২ উপ-পরিচালক ড. মো. দিদারুল আলম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো অধিক মুনাফার লোভে পরীক্ষা- নিরীক্ষা ছাড়াই রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি করে। এমনকি রক্তের সঙ্গে স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুই ব্যাগ বানিয়ে বিক্রি করে তারা। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তখন জরিমানা করা হয়।
র‌্যাব-২ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, রাজধানীর অধিকাংশ ব্লাডব্যাংকই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। রক্ত সংরক্ষণ করার জন্য ‘ব্লাড প্রিজারভেশন রেফ্রিজারেটর’ ব্যবহার করা আবশ্যক হলেও তারা সাধারণ ফ্রিজ ব্যবহার করে। রক্ত নেয়ার সময় হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস, এইচআইভি, ম্যালেরিয়া জীবাণু পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রক্ত সংগ্রহ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। রক্তের গ্রুপ ও ক্রসম্যাচিং পরীক্ষা করেই রোগীর শরীরে রক্ত দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র বিধিমালা অনুসারে ব্লাডব্যাংকগুলোতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক ও একজন টেকনিশিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে খুব কমই তা পাওয়া যায়। মালিক ও কর্মচারীর সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এজন্য প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন বলে জানান তিনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারণে ব্লাডব্যাংকগুলো কিছুটা নিয়ম-নীতির মধ্যে এসেছে বলে দাবি করেন এই ম্যাজিস্ট্রেট।
পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের ব্লাড ব্যবহারে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক। ব্লাডব্যাংকগুলো নিয়মিত মনিটর করার দাবি জানিয়ে অধ্যাপক ডা, নিলুফার সুলতানা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, রক্ত দিয়ে জীবন রক্ষা করা হয়। বিশুদ্ধ রক্তের নিশ্চয়তা দিতেই ব্লাডব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। সেইসঙ্গে রক্তদানে প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ ব্যক্তিদের উৎসাহিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে যেসব ব্লাডব্যাংক নিয়ম-নীতি মানছে না এবং অবৈধভাবে গড়ে উঠছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল-ক্লিনিক বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. বিধু ভূষণ ভৌমিক। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র বিধিমালা মেনেই রক্ত বিক্রি করতে হবে। যারা রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য স্যালাইন মেশানোসহ নানা অনিয়ম করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

নৃপেন পোদ্দারএক্সক্লুসিভ
রক্তের অন্য নাম জীবন। কিন্তু এই জীবন- লাল রক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কালো ব্যবসা। জীবন বাঁচানোর বদলে হচ্ছে জীবনহানি। রক্ত ব্যবসায়ী ও দালালদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চক্র লাল রক্তকে পুঁজি করে নেমেছে সর্বনাশা খেলায়। অর্থ হাতিয়ে নিতে রক্ত কেনা-বেচার নামে রোগীদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে তারা। শুধু তাই...