delhi_rape_1355724187_540x540_98253
বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে একের পর এক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বিশেষত যৌন নিগ্রহের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় বিব্রত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক পেশার ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রথমবারের মতো এই যৌন হয়রানি বা নিগ্রহের সংজ্ঞা ও ঘটনা-পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে অনুশাসন জারি করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিদেশে সব মিশন ও ঢাকার সদর দফতরে কর্মরত কূটনীতিকদের এই অনুশাসন জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এই অনুশাসনের সুস্পষ্ট ব্যত্যয় কর্তৃপক্ষের কাছে হয়রানি বলে গণ্য হবে। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা ও সর্বশেষ জাপানে বাংলাদেশ মিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর ও হেড অব চ্যান্সারি নুরে আলমের বিরুদ্ধে ওই মিশনেরই ফার্স্ট সেক্রেটারি মঞ্জু মনোয়ারার করা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিগ্রহ ও হয়রানির ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করছেন কর্মরত কূটনীতিকরা। বিশেষত নারী কূটনীতিকরা এই প্রজ্ঞাপনে উচ্ছ্বসিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ইদানীং বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে আস্থা, শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্যরে ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যপূর্ণ পেশাদার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ফলে মিশনগুলোতে ব্যক্তিগত অসন্তোষ এবং নিগ্রহের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যৌন নিগ্রহ সম্পর্কিত কিছু অভিযোগ প্রকাশ হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্জিত সুনাম ও সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া তাদের সততা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব ঘটনা অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি সংরক্ষণে মন্ত্রণালয় ও মিশনগুলোতে কর্মরতদের সার্বিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রজ্ঞাপনে অনুশাসন প্রদান করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কর্মক্ষেত্রে বা প্রত্যক্ষ কর্মক্ষেত্রের বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাদের সহকর্মীদের নৃতাত্ত্বিক উৎস, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বয়স, লিঙ্গ, ধর্মবিশ্বাস, বৈবাহিক ও পারিবারিক অবস্থা, যৌনতাসহ অন্যান্য সংবেদনশীল, একান্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় বা অনাকাক্সিক্ষত আলোচনা, সমালোচনা, তথ্য বিনিময় বা উপদেশ প্রদান থেকে সর্বতোভাবে বিরত থাকবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বিশেষত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি তার সরকারি ক্ষমতা ও অবস্থানের অপব্যবহার করে বিপরীত বা সমলিঙ্গের সহকর্মীকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যৌনতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অংশগ্রহণে প্রলুব্ধ, প্ররোচিত, আসক্ত বা সন্ত্রস্ত করে তোলেন বা তোলার চেষ্টা করেন বা এমন কিছু করার চেষ্টায় নিমগ্ন বা সম্পৃক্ত আছেন বলে কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে হয় তবে সেটি যৌন হয়রানি বা নিগ্রহ হিসেবে গণ্য হবে। যদি যৌন হয়রানি বা নিগ্রহের কাজে সক্রিয় কর্মকর্তা-কর্মচারী তার এই অনাকাক্সিক্ষত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিগৃহীতের কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি, পদায়ন বা চাকরি সংক্রান্ত অন্য কোনো সুবিধার বিষয়গুলো মিলিয়ে ফেলেন বা নিজের ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অপব্যবহার করেন বা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন বা নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে প্রতিফলিত হয় তাহলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অসন্তোষ, নিগ্রহ বা হয়রানির ঘটনা ঘটে গেলে সেক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপের কয়েকটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রথমত, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও অনাকাক্সিক্ষত আচরণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবেন। প্রয়োজনে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি লিখিতভাবে অনাকাক্সিক্ষত আচরণকারী সহকর্মীকে আপত্তির কথা জানাবেন। সরাসরি আলোচনা সম্ভব না হলে বা দুরূহ বলে মনে হলে নিগ্রহ বা হয়রানির বিষয়টি প্রমাণসহ মিশন প্রধান বা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাবেন। এমনকি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি কোনো সহকর্মীর দ্বারা ভবিষ্যতে নিগৃহীত হতে পারেন এমন যথেষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন তাহলেও ঊর্ধ্বতনকে সঙ্গে সঙ্গে অবহিত করবেন। মিশন প্রধান বা সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো সম্ভব না হলে দ্রুততম সময়ে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের মহাপরিচালককে জানাবেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে, অভিযোগ পাওয়ার পর মিশন প্রধান নিজে উদ্যোগী হয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে প্রমাণিত তদন্ত করবেন। প্রাথমিকভাবে মিশন প্রধান প্রয়োজনীয় পরামর্শ, ভৎসনা, অভয় ও অনুশাসনের মাধ্যমে সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করবেন। সম্ভব না হলে বা বিষয়টি গুরুতর বলে মিশন প্রধানের তদন্তে প্রমাণ হলে কালক্ষেপণ না করে মহাপরিচালক (প্রশাসন) বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবেন। তৃতীয় পর্যায়ে, অনুশাসনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা-১৯৭৯ এর অসদাচরণের দায়ে দোষী হলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা-১৯৮৫ এর অধীনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিদেশে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারীরা সহকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য-শিষ্টাচার ও পরিমিতি বজায় রেখে সম্মানের সঙ্গে কর্তব্য পালন করবেন। তাই শিষ্টাচার, সৌজন্য ও পরিমিতি বোধ বিবর্জিত আচরণ, কাজ, প্রকাশ, বাক্যবিনিময় ও অভিব্যক্তি হতে মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো। প্রজ্ঞাপন জারির প্রতিক্রিয়ায় ঢাকার সদর দফতরে কর্মরত এক সিনিয়র কূটনীতিক গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘এ ধরনের প্রজ্ঞাপনকে স্বাগত জানাই। এর ফলে যারা তাদের কথা বা আচরণ দ্বারা সহকর্মীদের উত্ত্যক্ত বা তাদের প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করেন বা করেছেন তারা সাবধান হয়ে যাবেন। আবার যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিগ্রহের শিকার হন, তারাও নিগ্রহ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় সম্পর্কে জানতে পারলেন। বর্তমানে জাতিসংঘসহ পৃথিবীর প্রায় সব সংস্থায় কর্মক্ষেত্রে পালনীয় আচরণ সম্পর্কে বিধিমালা রয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ে এখন হলো। আশা করা যায়, এখন থেকে শিষ্টাচার সম্পর্কিত এ ধরনের ধারণা ফরেন সার্ভিস একাডেমিতেই দেওয়া হবে।’টোকিও মিশনে নিপীড়নের তদন্ত শুরু : জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর ও হেড অব চ্যান্সারি নুরে আলমের বিরুদ্ধে ওই মিশনেরই ফার্স্ট সেক্রেটারি মঞ্জু মনোয়ারার করা যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তদন্তের জন্য এখনো কাউকে জাপানে পাঠানো না হলেও উভয় পক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। দুই পক্ষই তাদের বক্তব্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত নুরে আলমের শাস্তি দাবি করে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে টোকিও দূতাবাসে। তবে নিপীড়নের শিকার ওই নারী কূটনীতিক এখন আরেক ধরনের হয়রানিতে পড়েছেন। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকলেও তার ছুটি অনুমোদন করা হচ্ছে না। পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার দায়ভারও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তার ওপর। দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিস। রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন গত মঙ্গলবার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগটি দেখছে। এখন আর বিষয়টি দূতাবাসের এখতিয়ারে নেই। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে সেটাই চূড়ান্ত।’

হীরা পান্নাপ্রবাস জীবন
বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে একের পর এক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বিশেষত যৌন নিগ্রহের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ায় বিব্রত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক পেশার ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রথমবারের মতো এই যৌন হয়রানি বা নিগ্রহের সংজ্ঞা ও ঘটনা-পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে অনুশাসন জারি করা হয়েছে। গত...