image_267461.4_4
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে মন্তব্য করে শেষ পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ ও বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন ৮৩ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাও আবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই। সিলেকশন গ্রেড উঠে যাওয়ার পরও শিক্ষকরা যে আগের মতোই সচিবদের গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা বেতন পাবেন, এ তথ্যটা সোমবার মন্ত্রিসভায় বেতন কাঠামো পাসের পরপরই জানালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষ থেকে রাস্তায় নামতে হতো না। একই অবস্থা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর আরোপিত ভ্যাটের ক্ষেত্রেও। গত জুনে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, কিন্তু অর্থমন্ত্রী কিংবা এনবিআর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তা অবরোধ করে পুরো ঢাকা অচল করলেন, তখন ব্যাখ্যা দিল এনবিআর, জরুরি সংবাদ সম্মেলন করলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু ততক্ষণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন অনেক বেফাঁস বক্তব্য কিংবা কোনো সিদ্ধান্তের যথাযোগ্য ব্যাখ্যা না দেওয়ায় সরকারকে প্রায়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। বেতন কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল থাকবে কি না, তা নিয়ে নানা সময়ে নানা রকম কথা বলেছেন তিনি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন জ্বালানি তেলের দাম না কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে, তখনই অর্থমন্ত্রী জানালেন, ২৩ সেপ্টেম্বরের আগেই তেলের দাম কমানো হবে। এর আগে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়ার পর তিনি বলেন, ৪ কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। তার এসব বক্তব্যের প্রকাশ্য কড়া সমালোচনা এসেছে দলের অন্য মন্ত্রী-এমপিদের মুখ থেকেই।

দুটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মাঠে নামার অনেক পরে গতকাল দুটি বিষয়েরই ব্যাখ্যা এলো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এনবিআরের কাছ থেকে। অর্থমন্ত্রী জানালেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভ্যাট দেবে, শিক্ষার্থীরা নয়। পরে এনবিআর থেকে এক বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে একই কথা জানানো হলো। অথচ ৪ জুন বাজেট ঘোষণার পর থেকে শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে আন্দোলন করছিলেন।

পাবলিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের ‘জ্ঞানের অভাব’ সম্পর্কিত মন্তব্যের ব্যাখ্যাও অনেক পরে দিলেন অর্থমন্ত্রী। মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রীর এক মন্তব্যের পর বুধবার তাকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। কিন্তু গতকাল অর্থমন্ত্রী বললেন, সঠিক বাংলা মনে করতে না পারায় তিনি ‘জ্ঞানের অভাব’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করেছিলেন। চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করার পর থেকেই আন্দোলন করছিলেন শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাম্পাসসংলগ্ন রাস্তায় ব্যানার বা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন এ সিদ্ধান্তের। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বলেছেন শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, তাই এ খাতে ভ্যাট বসানো অযৌক্তিক। শেষ পর্যন্ত কিছুটা কমিয়ে চূড়ান্ত বাজেটে রেখে দেওয়া সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের যে ভ্যাট দিতে হবে না, এ ব্যাখ্যা দেয়নি কেউ।

বুধবার তাদের আন্দোলন ক্যাম্পাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাস্তায় নামে। গতকাল দিনের শুরুতে তারা অবরোধ করেন রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক। গতকাল দুপুরে এনবিআর ব্যাখ্যায় বলেছে, এ ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। টিউশন ফির মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীদের আলাদা ভ্যাট দিতে হবে না। সিলেটে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বাড়তি অর্থ আদায় করা উচিত হবে না। তবে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, এনবিআরের ব্যাখ্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। যেখান থেকে এবার আন্দোলনের উৎপত্তি, সেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ গতকাল বিকালেই জানিয়েছে, তারা বাড়তি কোনো টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেবে না। তার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধ তুলে নেননি শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের সংগঠক এক ছাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পৃথিবীর কোনো দেশেই শিক্ষার ওপর ভ্যাট নেই। এ ভ্যাট পুরোপুরি তুলে নিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের ব্যাখ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরাই ভ্যাট পরিশোধ করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আর ভ্যাট নেবে না। শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধও করেন তিনি।

নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন অর্থমন্ত্রী : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সম্পর্কে নিজের করা বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সে বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল বিকালে সিলেটে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানিয়ে বলেন, তিনি আশা করেন তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এখানেই তার সমাপ্তি ঘটবে।

সিলেট সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমি বলতে চেয়েছিলাম শিক্ষকরা যথাযথভাবে বিষয়টি অবহিত না হয়েই (আনইনফরমড) আন্দোলন করছেন। কিন্তু বলার সময় ইংরেজি ‘আনইনফরমড’ শব্দের সঠিক বাংলা মনে করতে না পারায় ‘জ্ঞানের অভাবে’ শব্দটি উচ্চারণ করেছি। অবশ্যই এটি অবমাননাকর। ‘অনবহিতি’ এবং ‘জ্ঞানের অভাব’ শব্দের অর্থ এক নয়।” তবে মন্ত্রী এও বলেন, ‘আমি বিস্মিত যে, তারা সরকারি সিদ্ধান্ত জানার আগেই আন্দোলনে নেমে যান।’

তুনতুন হাসানজাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে মন্তব্য করে শেষ পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ ও বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন ৮৩ বছর বয়সী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তাও আবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই। সিলেকশন গ্রেড উঠে যাওয়ার পরও শিক্ষকরা যে আগের মতোই সচিবদের গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা বেতন পাবেন, এ তথ্যটা সোমবার মন্ত্রিসভায়...