02_272311
লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে গতকাল বুধবার মুখরিত হলো সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দান। মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা, পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে পবিত্র হজ পালন করলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আজ বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্‌যাপিত হচ্ছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আজ পশু কোরবানি করবেন হাজিরা।

গতকাল সূর্যোদয়ের পর লাখ লাখ হাজি মিনা থেকে রওনা হন আরাফাতের ময়দানের দিকে। কেউ ট্রেনে, কেউ বাসে, কেউ বা পায়ে হেঁটে হাজির হন আরাফাতের ময়দানে। লাখো কণ্ঠে ছিল একটিই রব- ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা।’ অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।’

মক্কা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দান। সেখানে গতকাল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেন হজযাত্রীরা। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় তাঁবু টানিয়ে বা খোলা আকাশের নিচে বসে ইবাদত করেন। কেউ কেউ যান জাবালে রহমতের কাছে (হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই পাহাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন)। কেউ কেউ যান মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা শুনতে। এখান থেকে হজের খুতবা দেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শাইখ।

স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার কিছু পরে শুরু হয়ে খুতবা শেষ হয় ১২টা ৪৪ মিনিটে। খুতবায় গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম। এখানে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। ইসলামে শুধু মানবাধিকার নয়, পশুর অধিকার সম্পর্কেও বলা হয়েছে। ইসলাম সাদা-কালো, ধনী-গরিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় সভ্যতাই উৎকৃষ্ট। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করার কথাও বলা হয়েছে ইসলামে।’

গ্র্যান্ড মুফতি বলেন, ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে নিরাপত্তা টিকিয়ে রাখা যায় না। দেশ দখল ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দিয়ে নিরাপত্তা অটুট রাখা সম্ভব নয়। অবরোধ, অনাহার, অধিকার হরণের ফল কখনোই কল্যাণকর নয়। এগুলোর ফলে শত্রুতা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।’

খুতবায় হজের ইমাম বলেন, শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে নৈরাজ্য ও সন্দেহ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এ জন্য সবাইকে নিজ নিজ দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি। বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়েও তিনি কঠিন ভাষায় ঘৃণা প্রকাশ করে সবাইকে শান্তির পথে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাস করে জমিনের অধিবাসীদের কষ্ট দেয়, তারা ইসলাম থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। তাদের মুখে ইসলামের কথা পরোক্ষভাবে ইসলাম অবমাননার শামিল।

খুতবায় ইমাম কোরআন-হাদিসের মূলনীতির ভিত্তিতে বিশ্ব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পরস্পরের ভেদাভেদ ভুলে শান্তির বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

খুতবার শেষ দিকে গ্র্যান্ড মুফতি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আসুন, সবাই মিলে পাঁচটি মৌলিক অধিকার রক্ষা করি। সেগুলো হলো- ধর্ম, সম্পদ, ইজ্জত, জীবন ও বিবেক-বুদ্ধি রক্ষার অধিকার।’

খুতবায় সম্প্রতি মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে হজের ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের জন্য দোয়া করা হয়। মসজিদে নামিরায় সৌদি আরবের বাদশা সালমান, রাজপরিবারের সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বসে হজের খুতবা শুনেছেন।

মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা বিবি হাওয়া দীর্ঘদিন কান্নাকাটি করে পৃথিবীতে পুনর্মিলনের পর এই আরাফাতের ময়দানে এসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। আর চৌদ্দ শ বছরেরও বেশি সময় আগে এখানেই ইসলামের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন।

হজের তিন ফরজের মধ্যে ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আরাফাতে অবস্থান করা ছাড়া হজ পরিপূর্ণ হয় না। তাই হজে এসে যাঁরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাঁদেরও অ্যাম্বুল্যান্সে করে আরাফাতের ময়দানে নিয়ে আসা হয় স্বল্প সময়ের জন্য। খুতবা শেষে হাজিরা গতকাল আরাফাতের ময়দানে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন। বয়ান শুনে সূর্যাস্তের পর তাঁরা মিনার পথে প্রায় আট কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বালু ও কংকরময় মুজদালিফা উপত্যকায় যান। মুজদালিফায় মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার করে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। এখান থেকে তাঁরা পাথর সংগ্রহ করবেন, যা মিনার জামারায় শয়তানকে উদ্দেশ করে ছোড়া হবে।

আজ সকালে ফজরের নামাজ শেষে হাজিরা মিনায় ফিরে জোহরের নামাজ আদায় করবেন। এরপর শয়তানকে (প্রতীকী) পাথর ছুড়বেন। এরপর দেবেন পশু কোরবানি। কোরবানি শেষে হাজিরা মিনা থেকে মক্কায় ফিরে কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন। জমজম কূপের পানি পান করবেন। সাফা-মারওয়া পাহাড় সাতবার প্রদক্ষিণ করে মাথার চুল ছেঁটে বা মাথা মুড়িয়ে হজের অত্যাবশ্যকীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। আবার মিনায় ফিরে পরবর্তী দুই দিন সেখানে তাঁরা তিনটি শয়তানের প্রতীকী প্রতিকৃতিতে পাথর মারবেন। এরপর মক্কায় বিদায়ী তাওয়াফ করার পর হাজিরা যাঁর যাঁর দেশে ফিরে যাবেন। হজের আগে যাঁরা মদিনায় যাননি, তাঁরা মদিনায় যাবেন।

এবার বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৮৮টি দেশের প্রায় ২০ লাখ মুসল্লি হজ পালন করছেন। বাংলাদেশ থেকে হজে গেছেন এক লাখ সাত হাজারের মতো মুসল্লি। বাংলাদেশের ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার থেকে।

অর্ণব ভট্টপ্রথম পাতা
লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনিতে গতকাল বুধবার মুখরিত হলো সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দান। মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা, পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনা নিয়ে পবিত্র হজ পালন করলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। আজ বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্‌যাপিত হচ্ছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আজ পশু...